কলকাতার চিকিৎসকদের মতে, CPR-ই হয়ে উঠতে পারে জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য
কোনও চিকিৎসাজনিত জরুরি পরিস্থিতিতে প্রথম কয়েকটি মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ভিড়ভাট্টার গণপরিবহণে, যেখানে সঙ্গে সঙ্গে পেশাদার চিকিৎসা সহায়তা পাওয়া সবসময় সম্ভব হয় না, সেখানে এই কয়েকটি মিনিটই হয়ে উঠতে পারে জীবন বাঁচানোর নির্ণায়ক সময়। হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেলে প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন (CPR) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এমনই একটি জরুরি পরিস্থিতির সাক্ষী থাকল শিয়ালদহ থেকে জয়নগর গামী লক্ষ্মীকান্তপুর লোকাল। বারুইপুর স্টেশন ছাড়ার কিছুক্ষণ পরেই ট্রেনের একটি কামরার ভিতর আচমকাই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান প্রায় ৫০ বছর বয়সি এক যাত্রী, নাম মাধবী। তিনি অচেতন হয়ে পড়েছিলেন, তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং তাঁর পালসও অনুভূত হচ্ছিল না বলে জানা যায়। ঘটনায় কামরার অন্যান্য যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে এগিয়ে আসেন মঞ্জু। CINI (Child in Need Institute)-এর একটি কমিউনিটি-ভিত্তিক, (ডুবে যাওয়া প্রতিরোধ) কর্মসূচির আওতায় তিনি CPR-এর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।
প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যেও মঞ্জু রোগীর জন্য কিছুটা জায়গা তৈরি করতে সক্ষম হন। সহযাত্রীদের মধ্যে কিছুটা দ্বিধা থাকলেও তিনি আর সময় নষ্ট না করে ঠাসাঠাসি কামরার মধ্যেই CPR শুরু করেন। ৩০ বার বুকের উপর চাপ প্রয়োগের পর দু’বার শ্বাস দেওয়ার (30:2 অনুপাত) পদ্ধতিতে তিনি CPR চালিয়ে যেতে থাকেন।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই ওই মহিলার মধ্যে প্রাণ ফিরে আসার লক্ষণ দেখা যায়। তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস ফিরতে শুরু করে এবং তিনি জ্ঞান ফিরে পান। এরপর পরবর্তী স্টেশনে ট্রেন পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে দ্রুত কাছের একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

“সঠিক সময়ে কী করতে হবে, তা যদি আমরা জানি, তাহলে কাউকেই এভাবে মারা যেতে হবে না। এই কারণেই আমি CINI-এর অধীনে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম। সেই মুহূর্তে সেখানে উপস্থিত থাকতে পেরে আমি খুশি,” বলেন মঞ্জু।
এই ধরনের ঘটনা সাধারণ মানুষের CPR এবং জরুরি পরিস্থিতিতে প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে সচেতনতা ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ে চিকিৎসকদের পরামর্শ নেওয়া হয়েছে।
প্রথম কয়েকটি মিনিট কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
“হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর প্রথম কয়েকটি মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হৃদ্যন্ত্র থেমে গেলে অক্সিজেনের অভাবে কয়েক মিনিটের মধ্যেই মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। CPR রক্তসঞ্চালন সচল রাখতে সাহায্য করে এবং চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছনোর আগ পর্যন্ত মূল্যবান সময় এনে দেয়,” বলেন ডাঃ পুরুষোত্তম চক্রবর্তী, সি কে বিড়লা হসপিটালস, CMRI-এর Emergency & Triage বিভাগের প্রধান।
ভারতের মতো দেশে, যেখানে জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছতে কতটা সময় লাগবে তা পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে, সেখানে ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাধারণ মানুষের তাৎক্ষণিক CPR আক্রান্ত ব্যক্তির বেঁচে থাকার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে, বলে জানান ডাঃ চক্রবর্তী।
নারায়ানা আর এন টেগোর হসপিটাল, মুকুন্দপুর-এর Emergency Medicine-এর কনসালট্যান্ট ডাঃ গৌর প্রসাদ পাল মনে করেন, CPR-এর প্রশিক্ষণ শুধুমাত্র স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়।
তিনি বলেন, “আমি সত্যিই প্রত্যেক মানুষের কথা বলছি, শুধু চিকিৎসা পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের নয়। ঘটনাস্থলে থাকা কোনও সাধারণ মানুষ, চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত নন এমন ব্যক্তি, কোনও IT পেশাদার—আক্ষরিক অর্থেই যে কেউ CPR করতে পারেন।”
তিনি আরও বলেন, “আমার মতে, প্রত্যেক ব্যক্তির অন্তত Basic Life Support (BLS)-এর প্রশিক্ষণ নেওয়া উচিত। তাহলে প্রয়োজনের মুহূর্তে সময়মতো CPR দেওয়া সম্ভব হবে এবং এর মাধ্যমে বহু মানুষের জীবন বাঁচানো যেতে পারে।”
কলকাতার বিভিন্ন হাসপাতাল এবং NGO-তে সাধারণ মানুষের জন্য CPR শেখার প্রাথমিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি রয়েছে। ফলে পরবর্তী কোনও জরুরি পরিস্থিতিতে আপনার সামনেই যদি কারও জীবন সংকটে পড়ে, সঠিক প্রশিক্ষণ থাকলে আপনিও হয়ে উঠতে পারেন একজন জীবনরক্ষাকারী।


