Thursday, October 1, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

কলেজের গণ্ডি, প্রতিযোগিতার বাইরে: কলকাতার সেই কমিউনিটি, যেখানে তরুণরা খুঁজে পাচ্ছেন সমমনস্কদের

ওপেন মাইক, কবিতার আসর থেকে গেম নাইট, খেলাধুলা ও সামাজিক উদ্যোগ—কলকাতার ‘আফটার কলেজ’ তরুণদের একসঙ্গে যুক্ত হওয়া, সৃষ্টিশীলতা ও সহযোগিতার জন্য তৈরি করছে এক নতুন পরিসর

আপনি যদি একজন ছাত্রছাত্রী হয়ে সারাক্ষণ সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং নিজের প্রতিভা তুলে ধরার পাশাপাশি নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতে ও একসঙ্গে কাজ করতে চান, তাহলে কলকাতাভিত্তিক কমিউনিটি ‘আফটার কলেজ’ আপনার নজরে আসতেই পারে।

একটি নিরুত্তাপ কলেজ-ছুটির সময়ে আমিরাহ রহমানের হাত ধরে এই কমিউনিটির পথচলা শুরু। প্রথমে ছিল একটি সাধারণ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিচিত হওয়া মানুষজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে রহমান তাঁদের একত্রিত করেন ‘আফটার কলেজ’ নামে। প্রাথমিক ভাবনাটি ছিল অনলাইন ওপেন মাইকের আয়োজন করা—যেখানে ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের প্রতিভা প্রদর্শন করবেন, ভাবনা বিনিময় করবেন এবং নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হবেন।

কেউ গান বা কবিতা পরিবেশন করতে আসুন, ফুটবল খেলতে আসুন, বই বিনিময় করতে আসুন কিংবা শুধুই এক কাপ কফির সঙ্গে নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতে আসুন—‘আফটার কলেজ’ তৈরি করেছে অবিরাম স্ক্রলিং এবং প্রচলিত নেটওয়ার্কিংয়ের এক বিকল্প পরিসর।

রহমানের মনে হয়েছিল, কলকাতার কলেজ-সংস্কৃতিতে সুযোগ অনেক সময় ক্যাম্পাসের অনুষ্ঠান এবং আন্তঃকলেজ উৎসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। সেখানে প্রতিযোগিতার কারণে অনেক সময় প্রতিভাই হয়ে পড়ে গৌণ।

রহমানের কথায়, “প্রতিযোগিতা এবং অন্যায্য নিয়মের বাইরেও একটি জায়গা তৈরি করার লক্ষ্যেই আফটার কলেজের জন্ম। কলকাতার যে তরুণরা প্রায়ই সুযোগের অভাব নিয়ে অভিযোগ করেন, তাঁদের জন্য আমরা একটি সমতাভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে চেয়েছিলাম। এটি সকলের জন্য উন্মুক্ত—কলেজের পড়াশোনা শেষ করা তরুণদের জন্যও। এমন একটি জায়গা তৈরি করাই এর উদ্দেশ্য, যেখানে কলেজের পর মানুষ একে অপরের সঙ্গে মিশতে পারবেন, কিছু সৃষ্টি করতে পারবেন এবং নিছক সময় কাটাতেও পারবেন।”

খুব দ্রুতই সাড়া বাড়তে থাকে। সদস্যরা এরপর অনলাইন আয়োজনের পাশাপাশি অফলাইন অনুষ্ঠানেরও দাবি জানাতে শুরু করেন।

কমিউনিটির প্রথম অফলাইন মিলনমেলা আয়োজিত হয় ২০২৪ সালের জুলাই মাসে, ভবানীপুর কলেজের কাছে একটি ক্যাফেতে। টেলর সুইফটের ‘দ্য টর্চার্ড পোয়েটস ডিপার্টমেন্ট’ থেকে অনুপ্রাণিত এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের কালো ও সাদা পোশাকে এসে গান ও কবিতা পরিবেশন করার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

ওপেন মাইক ও কবিতার আসর থেকে শুরু করে গেম নাইট, ক্রীড়া অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ—‘আফটার কলেজ’ ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতার বদলে অংশগ্রহণকেই সামনে নিয়ে আসছে।

কোনও নির্দিষ্ট ছকে নিজেদের আটকে না রেখে ‘আফটার কলেজ’ পপ কালচারের নানা বিষয়কে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন শুরু করে। ২০২৪ সালের আগস্টে ‘রকস্টার’-অনুপ্রাণিত একটি ওপেন মাইকে উদ্‌যাপন করা হয় শিল্পীসত্তার স্বাধীনতা। একই বছরের সেপ্টেম্বরে আয়োজিত ‘আর্টিস্ট ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’ অনুষ্ঠানে একসঙ্গে হাজির হয়েছিলেন স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান, সঙ্গীতশিল্পী এবং কবিরা।

বই, খেলা, কবিতা—বাড়তে থাকে আয়োজনের পরিধি

এরপর ‘আফটার কলেজ’-এর অনুষ্ঠান তালিকা আর শুধু ওপেন মাইকে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বলিউড, F.R.I.E.N.D.S., হ্যালোউইন, নিউ ইয়ার্স ইভ এমনকি Bridgerton-এর মতো জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজ থেকেও অনুপ্রেরণা নিয়ে আয়োজন করা হয়েছে থিমভিত্তিক গেম নাইট।

অক্সফোর্ড বুকস্টোরে আয়োজিত হয়েছে কবিতার আসর। ছিল সিক্রেট সান্তা—যেখানে অংশগ্রহণকারীরা গোপনে অন্য পারফর্মারদের উদ্দেশে নোট লিখেছিলেন। ভালোবাসা দিবসে আয়োজন করা হয়েছিল সিঙ্গলস মিক্সারও।

‘আফটার কলেজ’-এর উদ্যোগে হয়েছে বই বিনিময়ের অনুষ্ঠান, লেখকদের সঙ্গে সরাসরি আলাপচারিতা, সম্মিলিত শিল্পচর্চার সেশন, ছাত্রছাত্রীদের তৈরি স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র প্রদর্শন এবং থিয়েটার রিডিং। বেশিরভাগ অনুষ্ঠানই রাখা হয়েছে বিনামূল্যে, যাতে ছাত্রছাত্রী এবং সদ্য কলেজ শেষ করা তরুণদের কাছে এগুলি সহজে পৌঁছে যায়।

কমিউনিটির কার্যক্রম শুধু বিনোদন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ‘আফটার কলেজ’ সামাজিক উদ্যোগের ক্ষেত্রেও পা রেখেছে। প্রচলিত দান সংগ্রহের কর্মসূচির বদলে তাদের সোশ্যাল সেল সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য মাসব্যাপী আর্ট ওয়ার্কশপের আয়োজন করে। সেখানে শিশুদের গল্প বলা, থিয়েটার, সঙ্গীত, কবিতা এবং স্ট্যান্ড-আপ কমেডির সঙ্গে পরিচিত করা হয়।

তাদের অন্যতম বড় উদ্যোগ ‘অল ইন্ডিয়া পারফরম্যান্স আর্টস লিগ’ (AIPAL)। এর মাধ্যমে কলকাতার গণ্ডি পেরিয়ে দেশজুড়ে কমিউনিটির পরিসর বিস্তৃত হয়। এটি ছিল একটি অনলাইন প্রতিযোগিতা, যেখানে কবিতা, নৃত্য, থিয়েটার এবং গল্প বলার বিভিন্ন বিভাগে পেশাদাররা বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন।

 

কলকাতা শহরেও ‘আফটার কলেজ’ নিয়মিত আয়োজন করে চলেছে ওপেন মাইক, মিট-আপ, ক্রীড়া অনুষ্ঠান, পিকনিক এবং পোষ্য প্রাণী দত্তক নেওয়ার উদ্যোগ। ছাত্র উদ্যোক্তা এবং ছোট ব্যবসাগুলিকেও কমিউনিটির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পপ-আপ স্টল বসানোর সুযোগ দেওয়া হয়। পাশাপাশি, তরুণ পডকাস্টারদেরও স্বাগত জানায় ‘আফটার কলেজ’।

তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে একাকিত্ব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা নিয়ে যখন আলোচনা ক্রমেই বাড়ছে, তখন ‘আফটার কলেজ’ হয়ে উঠেছে অবিরাম স্ক্রলিং এবং প্রচলিত নেটওয়ার্কিংয়ের একটি বিকল্প।

কেউ নিজের প্রতিভা নিয়ে মঞ্চে আসুন, ফুটবল খেলুন, বই বিনিময় করুন কিংবা শুধুই এক কাপ কফির সঙ্গে নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হন—‘আফটার কলেজ’-এর আসল আকর্ষণ প্রতিযোগিতার বদলে অংশগ্রহণে।

সম্ভবত এমনই একটি জায়গার খোঁজেই ছিলেন কলকাতার বহু তরুণ—যেখানে প্রতিযোগিতার চাপ নয়, বরং যোগাযোগ, সৃষ্টিশীলতা, সহযোগিতা এবং নিজের মতো মানুষের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার সুযোগই হয়ে ওঠে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।