Friday, October 2, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

ইকুয়েস্ট্রিয়ানদের মেলবন্ধন: কলকাতার ময়দানে এই বিনামূল্যের ঘোড়সওয়ারি সম্প্রদায় ছুটছে ট্রট থেকে গ্যালপের পথে

প্রতি শনিবার সকাল ৬টা বাজলেই কলকাতার ময়দানের একটি কোণ বদলে যায় ঘোড়াপ্রেমী, ঘোড়সওয়ারি শিখতে আগ্রহী নবাগত এবং অন্যরকম কিছু করার খোঁজে থাকা ভোরের পথিকদের মিলনস্থলে।

মাত্র চার বছরের শিশু থেকে কলেজ পড়ুয়া, কর্মজীবী মানুষ থেকে পঞ্চাশের কোঠার মহিলারা—সকলেই জড়ো হন ‘কলকাতা হর্স রাইডার্স’-এর ব্যানারে। ঘোড়ার প্রতি ভালোবাসাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই বিনামূল্যের কমিউনিটি গ্রুপের সদস্যদের একসূত্রে বেঁধেছে ঘোড়ার প্রতি তাঁদের অভিন্ন টান।
এই উদ্যোগের সূচনা হয়েছিল একটি সাধারণ ইনস্টাগ্রাম রিল থেকে।

২১ বছর বয়সি ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটর পুনীত সিং একটি ভিডিও পোস্ট করে জানতে চেয়েছিলেন, মানুষ ঘোড়ায় চড়া শিখতে এবং এই প্রাণীগুলিকে আরও ভালোভাবে বুঝতে আগ্রহী কি না। কিন্তু ভিডিওটি প্রকাশের পর যে সাড়া মিলল, তা তাঁকেই অবাক করে দেয়।

“চার দিনের মধ্যেই প্রায় ২,০০০ জন এই অনুষ্ঠান সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চেয়েছিলেন। কীভাবে এই গ্রুপে যোগ দেওয়া যায়, তা জানতে আমাদের ইনবক্সে একের পর এক মেসেজ আসতে শুরু করে,” বললেন সিং।

দু’বছর আগে পঞ্জাব থেকে কলকাতায় চলে আসেন পুনীত। বর্তমানে তিনি নিউ টাউনে তাঁর বোন তানবীর কৌরের সঙ্গে থাকেন।

“ঘোড়ার প্রতি আমার ভালোবাসা বরাবরের”

“আমি বরাবরই ঘোড়ার প্রেমে পড়ে আছি। আমার মোবাইলের কভার, আমার ট্যাটু—সবকিছুর মধ্যেই ঘোড়া রয়েছে। ঘোড়ায় চড়া আমি নিজেই শিখেছি। আর অনুশীলনের জন্য ভোরবেলা ময়দানে চলে আসি,” জানালেন পুনীত।

কলকাতায় ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি ঘোড়সওয়ারি ক্লাব রয়েছে। কিন্তু পুনীতের মনে হয়েছিল, অধিকাংশ মানুষের পক্ষেই সেই ক্লাবগুলির খরচ বহন করা সম্ভব নয়। সেই ভাবনা থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় ‘কলকাতা হর্স রাইডার্স’।

“এই ক্লাবটি আমি বিনামূল্যেই শুরু করেছি”

“আমি এই ক্লাবটি বিনামূল্যেই শুরু করেছি। ধীরে ধীরে আমরা আমাদের কমিউনিটি গড়ে তুলছি। এখনও পর্যন্ত ৬,০০০-এরও বেশি মানুষ আমাদের কাছে জানতে চেয়েছেন। ২,০০০ জন আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ কমিউনিটিতে যোগ দিয়েছেন। সেখানে প্রতি শনিবারের সেশনের জন্য ফর্ম পোস্ট করা হয়। এটি কোনও আনুষ্ঠানিক ক্লাব নয়। ঘোড়ায় চড়ার প্রতি ভালোবাসা থেকেই আমরা এই কাজ করছি,” বললেন কৌর।

তিনি আরও জানান, প্রতি শনিবারের সেশন সকাল ৬টা থেকে শুরু হয় এবং তিনটি ব্যাচে ভাগ করা থাকে। প্রতি শনিবার প্রায় ৭৫ জনের উপস্থিতি আশা করা হয় এবং প্রতিটি সেশন এক ঘণ্টা করে চলে।

এই উদ্যোগের মুখ হয়ে উঠেছেন পুনীত। আর নেপথ্যে থেকে পুরো ব্যবস্থাটি সচল রাখছেন তাঁর বোন তানবীর কৌর। ৩২ বছর বয়সি এই তথ্যপ্রযুক্তি পেশাদার রেজিস্ট্রেশন সামলান, ব্যাচগুলির সমন্বয় করেন এবং হাতে ছাপানো উপস্থিতির তালিকা ও হাইলাইটার নিয়ে অংশগ্রহণকারীদের স্বাগত জানান।

“আমরা এখানে সবাই শিখছি। এখন আমাকে অনেকেই পুনীতের বোন হিসেবেই বেশি চেনেন। কিন্তু তাতে আমার কোনও সমস্যা নেই। এখানে প্রত্যেকে যা করছেন, তা আরও বৃহত্তর এক কমিউনিটি-চেতনার পরিচয় দেয়,” বললেন কৌর।

পুলিশের বিধিনিষেধের কারণে বর্তমানে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ৭৫-এ সীমাবদ্ধ রাখতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।

কৌর আরও বলেন, “প্রশাসনের সঙ্গে কোনও সমস্যা হয়নি। কিন্তু একই জায়গায় ১৫০ জন মানুষের জমায়েত বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে। তাই আপাতত স্লটের সংখ্যা সীমিত রাখা হয়েছে। প্রতি শুক্রবার আমরা ফর্ম দিই এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই ১৫০টি স্লট পূর্ণ হয়ে যায়। সেই তালিকা থেকে আনুমানিক ৭৫ জন এসে সেশনে অংশ নেন।”

বারবার অনুরোধ আসা সত্ত্বেও প্রতি সপ্তাহে ঘোড়সওয়ারির মিলনমেলার সংখ্যা বাড়ানোর কোনও পরিকল্পনা নেই এই কমিউনিটির।

“রবিবার ময়দান এমনিতেই মানুষের ভিড়ে ঠাসা থাকে। আমরা সেই স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে চাই না। আর সপ্তাহের অন্যান্য দিনেও সম্ভব নয়, কারণ আমাদের চাকরি রয়েছে,” বললেন কৌর।

বিশেষ দিনে ময়দানে গেলে দেখা যাবে, সেদিনের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে হাওড়া, বিরাটি এবং বাগুইআটির মতো দূরবর্তী এলাকা থেকেও মানুষ এসেছেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার, উদ্যোক্তা, পড়ুয়া এবং ছোট ছোট শিশুরা। নতুন কিছু করার উত্তেজনাই তাঁদের সবাইকে এক জায়গায় মিলিয়েছিল।

এই কমিউনিটির বন্ধন শুধু ঘোড়ায় চড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ময়দানের এক কোণে রয়েছে দিশা নারুলার আর্ট স্টেশন। সেখানে আগতরা ফুলের টব রং করতে পারেন, স্কেচ করতে পারেন অথবা কিছুক্ষণের জন্য ধীর হয়ে নিজের সঙ্গে সময় কাটাতে পারেন।

“মানসিক সুস্থতার কথা মাথায় রেখেই আমি এই জায়গাটি তৈরি করেছি। যে কেউ যে কোনও সময় এখানে এসে নিজের ইচ্ছেমতো মনের ভাব প্রকাশ করতে পারেন। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতার ইতিবাচক বৃদ্ধি হচ্ছে এবং আমি সেই সচেতনতাকে আরও লালন করতে চাই,” বললেন নারুলা।

তাঁর কথায়, “আমি মনে করি, শিল্পচর্চার মাধ্যমে মানুষ নিজের অবচেতন মনকে অন্বেষণ করতে পারে। তাই প্রত্যেকের নিজের সত্তাকে খুঁজে দেখার জন্য এটি একটি নিরাপদ পরিসর।”

একটি ইনস্টাগ্রাম পোস্ট থেকে শুরু হওয়া উদ্যোগটি এখন বহু কলকাতাবাসীর শনিবার সকালের নিয়মিত কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে। শহরের হৃদয়ে ঘোড়া, শিল্প এবং মানুষের পারস্পরিক সংযোগকে একসূত্রে বেঁধে ‘কলকাতা হর্স রাইডার্স’ এখন এগিয়ে চলেছে এক ক্রমবর্ধমান কমিউনিটির গল্প হয়ে—ট্রট থেকে গ্যালপের পথে।