Friday, August 14, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

পিতৃতন্ত্রের বিপরীত এ দাঁড়িয়ে আশার আলো ছড়াচ্ছে ‘ঘোষাল এন্ড ডটার’

কলকাতা দূরদর্শনের প্রাক্তন ঘোষিকা সুতপা ঘোষালের উদ্যোগে গড়ে ওঠা আট বছরের একটি মিষ্টির দোকান নীরবে ভাঙছে লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক ধারণা।
কখনও প্রচারের আলোয় না এসেও তৈরি করছে নতুন দৃষ্টান্ত

প্রথম দেখায় দোকানটিকে একেবারেই সাধারণ একটি পাড়ার মিষ্টির দোকান বলেই মনে হয়। সাদা রঙ করা দেওয়াল, কড়কড় শব্দ করা সিলিং ফ্যান, ক্রেতাদের বসার জন্য কাঠের বেঞ্চ, নীরবে কাজ করে চলা মিষ্টি প্রস্তুতকারীরা এবং কাচের শোকেসে সাজানো নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি।

তবে যে বিষয়টি চোখে পড়তেই থমকে যেতে হয় সেটা হল— দোকানের সাইনবোর্ড, যাতে লেখা ‘ঘোষাল এন্ড ডটার’।

প্রথম দেখাতে মনে হতেই পারে, বোধহয় কোনও ‘ঘোষাল’ পরিবারের কর্তা তাঁর অতি প্রিয় কন্যাসন্তানকে সাথে নিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছেন, আর একদিন সেই মেয়েই এই ব্যবসার উত্তরাধিকারী হবে।

কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে ‘ঘোষাল’ কোনও পরিবারের কর্তা নন। ২০১৮ সালে এই দোকান প্রতিষ্ঠা করেন সুতপা ঘোষাল নিজেই। আর ভবিষ্যতে তিনি এই ব্যবসার দায়িত্ব তুলে দিতে চান তাঁর মেয়ে মোমইরো মুখোপাধ্যায়-এর হাতে।
মিষ্টির দোকান শুরু করার সময় অতশত ভাবেন নি তিনি।
হাওড়ার নেতাজি সুভাষ রোডের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই ছোট্ট মিষ্টির দোকানটি শুরু করার পিছনে ছিল একটাই সহজ উদ্দেশ্য— মানুষকে টাটকা, সদ্য তৈরি মিষ্টি খাওয়ানো।

একসময় দূরদর্শনের ঘোষিকা এবং টেলিভিশন সঞ্চালিকা হিসেবে পরিচিত ছিলেন সুতপা ঘোষাল। আজ তিনি একজন সফল মিষ্টি ব্যবসায়ী। তাঁর কথায়, সমাজে নিজের জায়গা তৈরি করলেও প্রচলিত সামাজিক মানসিকতা এখনও তাঁকে ভাবায়।

তিনি সংবাদ মাধ্যমে বলেন, “সমাজ যতই দাবি করুক যে তারা প্রথাগত ধ্যানধারণা থেকে বেরিয়ে এসেছে, বাস্তবে আজও নারীদের নীরবে পিতৃতন্ত্রের দৃষ্টির মুখোমুখি হতে হয়। তাই সেই মানসিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো আমার কাছে বাড়তি এক চ্যালেঞ্জ।”

রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নাটক বিষয়ে পিএইচডি করার পর সুতপা ঘোষাল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফুড প্রসেসিং বা খাদ্যপ্রযুক্তিতে ডিগ্রি অর্জন করেন, শুধুমাত্র নিজের ব্যবসা শুরু করার লক্ষ্যেই।

তিনি বলেন, “মিষ্টির ব্যবসায় আমার কোনও পারিবারিক ঐতিহ্য ছিল না। তাই একক উদ্যোক্তা হিসেবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দক্ষ মিষ্টি প্রস্তুতকারীদের খুঁজে পাওয়া। নতুন ব্যবসায়ীদের বাস্তব পরিস্থিতি খুব কঠিন। সাধারণত নদিয়া এবং হাওড়া থেকে কর্মী নিয়োগ করি। কিন্তু সবসময় একই মানের মিষ্টি তৈরি করা সত্যিই সহজ নয়।”

সুতপা ঘোষালের কাছে এই পথ কখনওই সহজ ছিল না। তবে তিনি আনন্দিত যে তাঁর তৈরি কালাকন্দ এবং মিল্ক কেক-এর স্বাদে মুগ্ধ হয়ে বহু ক্রেতা বারবার তাঁর দোকানে ফিরে আসেন।

তিনি আরও জানান, হাওড়ার প্রাণকেন্দ্রে মিষ্টির দোকান খোলার অনুপ্রেরণাও এসেছে তাঁর মেয়ের কাছ থেকেই।

সুতপা বলেন, “আমার পুরো যাত্রাপথে আমার মেয়েই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি এবং সমর্থন।”

যে দেশে পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গে বরাবরই বাবাদের, ভাইদের কিংবা ছেলেদের নাম জড়িয়ে এসেছে, সেখানে ‘ঘোষাল এন্ড ডটার’ এক ভিন্ন গল্প তুলে ধরে।
মায়ের থেকে মেয়ের হাতে উত্তরাধিকার যাওয়ার — এক নীরব গল্প।

সুতপা ঘোষালের কাছে এই সাইনবোর্ড শুধুমাত্র তাঁর মিষ্টির দোকানের নাম নয়। এটি এক নীরব অথচ দৃঢ় ঘোষণা— ব্যবসা, উত্তরাধিকার এবং স্বপ্ন যেমন বাবার থেকে ছেলের হাতে যেতে পারে, তেমনই স্বাভাবিকভাবে এক মায়ের কাছ থেকেও তাঁর মেয়ের হাতে পৌঁছে যেতে পারে।