Friday, October 2, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

প্রান্তিকতার অন্ধকারে আলোর দিশা: কলকাতার পথশিশুদের ভবিষ্যৎ বদলে দিচ্ছে ‘পথচলা’

মৈত্রী মজুমদার – প্রায় তিন দশক ধরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানসিক সহায়তা, সৃজনশীলতা ও দক্ষতা বিকাশের মাধ্যমে কলকাতার প্রান্তিক শিশুদের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে এই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা

কলকাতার ঐতিহ্যবাহী কালিঘাটের ব্যস্ত অলিগলিতে প্রায় তিন দশক ধরে নীরবে ঘটে চলেছে এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পরিবর্তন। ১৯৯৭ সালে শ্রীমতী ইন্দ্রাণী গঙ্গোপাধ্যায় এবং কলকাতার কয়েকজন উদার মনস্ক নাগরিকের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত পথচলা, আজ প্রান্তিক শিশুদের শিক্ষা, নিরাপত্তা, মানসিক বিকাশ ও আত্মনির্ভরতার অন্যতম সহায়ক কেন্দ্র।

মূলত রাস্তায় বেড়ে ওঠা শিশু এবং কালিঘাটের মতো রেড-লাইট এলাকার প্রান্তিক পরিবারের শিশুদের নিয়ে কাজ করে এই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। তবে পথচলার কাজ কেবল পড়াশোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে দৈনিক সহায়ক পাঠদান, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পুষ্টি, মানসিক সহায়তা, সৃজনশীল কর্মকাণ্ড, বৃত্তিমূলক দক্ষতা এবং পরিবারকে ক্ষমতায়নের মতো বিষয়কে একসঙ্গে যুক্ত করে একটি সামগ্রিক উন্নয়নমূলক মডেল গড়ে তুলেছে সংস্থাটি।

বর্তমানে পথচলার ঠিকানা , দক্ষিণ কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু রোড-এ। সংস্থাটির নেতৃত্বে রয়েছেন সভাপতি রুক্মিণী গঙ্গোপাধ্যায়, সম্পাদক ইন্দ্রাণী চট্টোপাধ্যায় এবং কোষাধ্যক্ষ দেবাশিস লাহিড়ী।

বর্তমানে কালিঘাট অঞ্চলের শিশুদের একটি নিরাপদ আশ্রয় ‘পথচলা’

কালিঘাট অঞ্চলের বহু শিশুর বেড়ে ওঠার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা, সামাজিক কলঙ্ক ও নানা ধরনের ঝুঁকি। পথচলা তাদের জন্য শুধু একটি শিক্ষাকেন্দ্র নয়, বরং একটি নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ।

বর্তমানে সংস্থাটি ৪ থেকে ১৮ বছর বয়সি প্রায় ৬০ জন শিশুর পাশে রয়েছে। স্থানীয় সরকারি স্কুলগুলির সঙ্গে সমন্বয় করে শিশুদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থায় যুক্ত করা হয়। পাশাপাশি প্রতিদিনের রেমিডিয়াল টিউশনের মাধ্যমে স্কুলের পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়া শিশুদের বিশেষ সহায়তা দেওয়া হয়, যাতে তারা শ্রেণিকক্ষে টিকে থাকতে পারে এবং স্কুলছুট না হয়।

পাশাপাশি পথচলার বিশেষত্ব হল—শিক্ষাকে শুধুমাত্র বই ও পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিশুদের ব্যক্তিত্ব, আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া।

এর অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ পথনাটিকা। শিশুরাই নিজেদের অভিজ্ঞতা ও পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা থেকে নাটকের বিষয় তৈরি করে এবং অভিনয় করে। পারিবারিক নির্যাতন, আর্থিক দুরবস্থা ও সামাজিক সচেতনতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে এই নাটকগুলিতে।

কলকাতার বিশিষ্ট রেস্তোরাঁ আউধ 1590-এর মতো স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় জনসমাগমপূর্ণ স্থানে এই নাটক পরিবেশিত হয়। ফলে এগুলি একই সঙ্গে জনসচেতনতার মাধ্যম এবং শিশুদের আত্মবিশ্বাস, প্রকাশক্ষমতা ও নেতৃত্বের দক্ষতা বাড়ানোর কার্যকর অনুশীলন হয়ে ওঠে।

নাচ, গান, হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মশালায় নিয়মিত অংশ নেয় শিশুরা। দীপাবলির মতো উৎসবের সময় তারা হাতে তৈরি করে মোমবাতি, দিয়া এবং কর্পোরেট উপহার সামগ্রী। পাশাপাশি তা বিলি করার জন্য বিশেষ খাম,প্যাকেজিং, কাগজের ব্যাগও তারাই তৈরি করে।
পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে সরাসরি ক্রেতাদের সামনেও নিজেদের তৈরী সামগ্রীর প্রদর্শন ও বিক্রয় করে।

এই কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য দ্বিমুখী—একদিকে শিশুদের মানসিক চাপ ও অতীতের আঘাত থেকে বের করে, স্বস্তি দেওয়া, অন্যদিকে আর্থিক লেনদেন সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা, উদ্যোগী মানসিকতা এবং আত্মনির্ভরতার আত্মবিশ্বাস তৈরি করা।

পথচলার দর্শন স্পষ্ট—সুস্বাস্থ্য ও স্থিতিশীলতা ছাড়া শিক্ষার ভিত শক্ত হতে পারে না। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্বাস্থ্য-সচেতনতা কর্মসূচির পাশাপাশি পুষ্টির দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হয়।

সৎসঙ্গ সেবা মিশন কলকাতা-এর মতো সহযোগী জনকল্যাণমূলক সংগঠনের সহায়তায় শিশুদের পুষ্টিকর খাদ্য, পরিচ্ছন্নতা সামগ্রী এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী সরবরাহ করা হয়।

প্রতিষ্ঠাতা শ্রীমতী ইন্দ্রাণী গঙ্গোপাধ্যায়ের লক্ষ্য ছিল শিক্ষা ও যত্নের মাধ্যমে কালিঘাটের প্রান্তিক শিশুদের সামাজিক মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনা। ২০০৪ সালে তাঁর স্বামী আশিস গঙ্গোপাধ্যায় এবং শ্রীমতী কৃষ্ণা গুপ্ত এগিয়ে এসে সংস্থার কাজকে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।

তাঁদের নেতৃত্বে পথচলার কাজ কলকাতাজুড়ে পরিচিতি লাভ করে। ২০০৯ সালে সংস্থাটি সম্মানজনক ‘The Telegraph School Award’ অর্জন করে। পাশাপাশি আরও একাধিক প্রাতিষ্ঠানিক সম্মানও পায় পথচলা।

বর্তমানে প্রতিষ্ঠাতার ভাবনাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন একটি নিবেদিতপ্রাণ নারী-নেতৃত্বাধীন কার্যনির্বাহী কমিটি।

সভাপতি রুক্মিণী গঙ্গোপাধ্যায়, প্রতিষ্ঠাতা ইন্দ্রাণী গঙ্গোপাধ্যায়ের কন্যা। মায়ের মূল ভাবনাকে ধরে রেখে আধুনিক সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সংগঠনকে মানিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। স্বপ্ন দেখেন অদূর ভবিষ্যতে এই এলাকার প্রান্তিক মহিলাদের জন্যও একটি ‘সেফ-হোম’ তৈরী করার।

সম্পাদক ও ক্রিয়েটিভ হেড ইন্দ্রাণী চট্টোপাধ্যায় দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি সৃজনশীল কর্মসূচিগুলির পরিকল্পনা ও কাঠামো পরিচালনা করেন।

কোষাধ্যক্ষ দেবাশিস লাহিড়ীর অবদান এই সংস্থায় বিশেষ উল্লেখযোগ্য। পেশাগত ভাবে সরকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত থাকার সুবাদে, নিজের পূর্ব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে, সংস্থার জনসংযোগের দিকটিও অনেক খানি সামলাচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি অন্যান্য কার্যনির্বাহী সদস্যদের সহযোগিতায় আর্থিক নিয়মনীতি ও সংগঠনের নিবন্ধন-সংক্রান্ত বিষয়গুলির দেখভালও করেন তিনি।
এছাড়াও আছেন স্মিতা চ্যাটার্জী এবং রীনা চ্যাটার্জী যাঁরা দুহাত দিয়ে পথচলা স্কুলকে আগলে রেখেছেন এবং প্রতিদিনের কাজকর্মকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
এই নিবেদিত প্রাণ কর্মীবাহিনীর অক্লান্ত পরিশ্রম-এর ফলে পথচলা আনুষ্ঠানিকভাবে কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা CSR উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে এবং ভবিষ্যতে তার আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিসর আরও বাড়ানোর পথ খুলেছে।

বর্তমান সময়ে ডিজিটাল বিভাজনও শিক্ষাক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। সেই বাস্তবতা মাথায় রেখে পথচলার দৈনন্দিন শিক্ষাক্রমে নিয়মিত কম্পিউটার ক্লাস যুক্ত হয়েছে।

আধুনিক ডেস্কটপ কম্পিউটারের মাধ্যমে শিশুদের সফটওয়্যার ব্যবহারের প্রাথমিক ধারণা, তথ্য নথিভুক্ত করা এবং শিক্ষামূলক উপস্থাপনার দক্ষতা শেখানো হয়। এর ফলে তারা স্কুলের কম্পিউটার পরীক্ষায় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতের উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত দক্ষতাও অর্জন করছে।

সামাজিক বিভাজন ও দীর্ঘদিনের হীনমন্যতা কাটাতে ‘পথচলা’ আন্তঃবিদ্যালয় বিনিময় কর্মসূচি শুরু করেছে।
সাউথ পয়েন্ট স্কুল, মহাদেবী বিড়লা ওয়ার্ল্ড অ্যাকাডেমি এবং মহাদেবী বিড়লা শিশু বিহার-এর মতো কলকাতার বিশিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতায় এই কর্মসূচি পরিচালিত হয়েছে।

এর মাধ্যমে প্রান্তিক পরিবারের শিশুরা মূলধারার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একসঙ্গে শেখা, সৃজনশীল কাজ ও জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগ পাচ্ছে। একই সঙ্গে তাদের সামাজিক আত্মবিশ্বাসও বাড়ছে।

স্কুলের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা শেষ করে যারা উচ্চশিক্ষার দিকে এগিয়ে যায়, তাদের জন্য পথচলা চালু করেছে স্কলারশিপ প্রোগ্রাম।

রোটারি ক্লাব-এর মতো সংগঠনের সহযোগিতায় শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের বইয়ের খরচে সহায়তা করা হয়। সম্প্রতি সৌরভ পাসওয়ান ও রোহন শাহ-এর মতো শিক্ষার্থীদেরও এই সহায়তা দেওয়া হয়েছে, যাতে পারিবারিক আর্থিক সমস্যার কারণে তাঁদের উচ্চশিক্ষা থেমে না যায়।

শিশুদের সামগ্রিক কল্যাণে ‘পথচলা’ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে নিয়মিত বিতরণ শিবির আয়োজন করে।
সৎ সঙ্গ সেবা মিশন, ইনার হুইল ক্লাব এবং রোটারি ক্লাব-এর মতো সেচ্ছ্বাসেবী সংগঠনের পাশাপাশি কলকাতার বেশ কিছু নামকরা কর্পোরেট সংস্থার সহযোগিতায় শিশুদের পুষ্টিকর খাবার, শিক্ষাসামগ্রী, পোশাক এবং স্বাস্থ্যসামগ্রী সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে স্যানিটারি ন্যাপকিনের মতো প্রয়োজনীয় সামগ্রীও রয়েছে।

১৯৯৭ সালে একটি ছোট স্থানীয় উদ্যোগ হিসেবে শুরু হওয়া পথচলা আজ একটি ডিজিটাল, আইনগতভাবে সুসংগঠিত এবং বিস্তৃত সহযোগিতার নেটওয়ার্কে যুক্ত সামাজিক সহায়তা কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

প্রতিষ্ঠাতাদের স্বপ্নকে সামনে রেখে রুক্মিণী গঙ্গোপাধ্যায় ও তাঁর দল প্রমাণ করে চলেছেন—দীর্ঘস্হায়ী সামাজিক পরিবর্তনের জন্য শুধু বইয়ের শিক্ষা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রযুক্তিগত দক্ষতা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা, মানসিক স্থিতিশীলতা, সৃজনশীল বিকাশ, পরিবারের ক্ষমতায়ন এবং ভবিষ্যতে আত্মনির্ভর হয়ে ওঠার সুযোগ।

কালিঘাটের প্রান্তিক শিশুদের কাছে তাই পথচলা শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি নিরাপত্তা, মর্যাদা, আত্মবিশ্বাস এবং একটি নতুন ভবিষ্যতের সম্ভাবনার নাম।