Friday, August 14, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

বেহালা থেকে মিশেলিনের রান্নাঘর— ফরাসি রন্ধনশৈলীতে বাঙালিয়ানার আত্মা মিশিয়ে বিশ্বজয় শেফ প্রিয়ম চট্টোপাধ্যায়ের

শেফ প্রিয়ম চট্টোপাধ্যায়ের রান্নার অনুপ্রেরণার উৎস একটাই— কলকাতা। ফ্রান্সের মর্যাদাপূর্ণ Ordre du Mérite Agricole সম্মানে ভূষিত হওয়ার বহু আগে কিংবা সিঙ্গাপুরের ‘রোইয়া’-এর মাধ্যমে মিশেলিন গাইড এর স্বীকৃতি পাওয়ারও আগে তিনি ছিলেন বেহালার এক সাধারণ ছেলে।

মায়ের হাতের রান্না খেয়ে বড় হওয়া, ড্রাম বাজানো, ল্যান্ডস্কেপ আঁকা এবং পরিবারের প্রতিটি মিলনমেলায় খাবারই যে ছিল কেন্দ্রবিন্দু— এই পরিবেশেই তাঁর বেড়ে ওঠা। আজ ফ্রান্সের সেরা কয়েকটি রান্নাঘরে বহু বছর কাটানোর পরেও প্রিয়মের বিশ্বাস, তাঁর রন্ধনদর্শনের মূল ভিত্তি এখনও বাংলা। এই সপ্তাহান্তে কলকাতায় তাঁর বিশেষ কুলিনারি শোকেসের আগে মিডিয়া-র সঙ্গে খোলামেলা আড্ডায় সেই গল্পই শোনালেন তিনি।

দক্ষিণ কলকাতার বেহালায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা প্রিয়ম প্রথমে পড়াশোনা করেন সাউথ পয়েন্ট হাই স্কুল-এ। পরে চলে যান কালিম্পংয়ের বোর্ডিং স্কুলে।

জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হন। একদিকে বাড়ির বাঙালি রান্না, অন্যদিকে হস্টেলের খাবার এবং পাহাড়ের টাটকা শাকসবজি ও কৃষিভিত্তিক জীবন। কিশোর বয়সেই তিনি কৃষিকাজ ও বাগান পরিচর্যার শিক্ষাও নেন।

প্রিয়ম বলেন, “আমার মা বাংলাদেশের নোয়াখালির মানুষ, আর বাবার পরিবার কলকাতার। ছোটবেলা থেকেই অসাধারণ সব রান্না আর দক্ষ রাঁধুনিদের মধ্যে বড় হয়েছি। বাঙালি পরিবারে আত্মীয়-বন্ধুদের আপ্যায়ন ছিল জীবনেরই অংশ। আমাদের কাছে খাবার ছিল পবিত্র।”

‘বাঙাল’ ও ‘ঘটি’— দুই ধরনের রান্নাই তাঁর প্রিয় ছিল। তবে রান্নাই তাঁর প্রথম ভালোবাসা ছিল না। স্কুলজীবনে প্রায় দশ বছর ছবি এঁকেছেন, কলেজে ব্যান্ডে ড্রাম বাজিয়েছেন, এমনকি সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার স্বপ্নও দেখেছিলেন। কিন্তু কোনওটাই বাস্তবায়িত না হওয়ায় তাঁর মা-ই তাঁকে কুলিনারি আর্টসকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে উৎসাহ দেন।

ত্রিশের কোঠায় থাকা এই শেফ বলেন, “আমি সবসময় বিশ্বাস করেছি, আমি একজন শিল্পী। শেষ পর্যন্ত খাবারকেই নিজের শিল্প প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে খুঁজে পেয়েছি।”

ফ্রান্সে পৌঁছানোর স্বপ্ন পূরণ হতে লেগেছে প্রায় এক দশক

কলকাতার NIPS স্কুল অফ হোটেল ম্যানেজমেন্ট থেকে আনুষ্ঠানিক কুলিনারি শিক্ষা শেষ করে প্রিয়ম যোগ দেন পার্ক হায়াত হায়দরাবাদ-এর উদ্বোধনী টিমে। সেখানেই প্রথমবার ফরাসি শেফদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান এবং সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর জীবন বদলে দেয়।

তিনি বলেন, “আমি ফরাসি রান্নার প্রেমে পড়ে যাই। আইফেল টাওয়ারের সামনে দাঁড়ানোই তখন আমার স্বপ্ন হয়ে ওঠে।”

সেই স্বপ্ন বাস্তব হতে সময় লেগেছিল প্রায় নয় বছর। এই সময়ে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের জন্য রান্না করেন, গড়ে তোলেন বিস্তৃত যোগাযোগ। ফ্রান্সে প্রথম দিকের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে প্রিয়ম বলেন, “সেখানে প্রতিনিয়ত শেফদের কাছ থেকে শিখেছি। পরে আমিই ফ্রান্সের মর্যাদাপূর্ণ কৃষি নাইটহুড সম্মানপ্রাপ্ত সর্বকনিষ্ঠ এবং একমাত্র ভারতীয় শেফ হই।”

প্রিয়মের কথায়, তিনি ফরাসি রান্নাঘরে প্রবেশ করেছিলেন সম্পূর্ণ বিনয় নিয়ে। নতুন কিছু করার আগে তিনি সেই রান্নাশৈলীকে গভীরভাবে শিখতে চেয়েছিলেন।

“আমি সেখানে গিয়েছিলাম ফরাসি রান্না শিখতে। সেটা না বুঝেই অন্য কিছুর সঙ্গে মিশিয়ে ফেলব কেন? পাঁচ বছর শুধু মাথা নিচু করে নিজের কাজ করেছি।”

আর সেই অধ্যবসায়ই এনে দেয় সাফল্য।

তাঁর জীবনের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত আসে, যখন প্রবীণ ফরাসি শেফরা তাঁকে বলেন, তাঁদের মতো রান্না করার চেষ্টা না করে নিজের পরিচয়কে তুলে ধরতে।

প্রিয়ম স্মৃতিচারণ করে বলেন, “ওঁরা আমাকে বলেছিলেন— ‘তোমার রান্না মিশেলিনের দুই-তারকা মানের। কিন্তু তুমি ফরাসি নও, তুমি ভারতীয়। একদিন তোমাকে নিজের মশলা, নিজের শিকড়কে রান্নায় ফিরিয়ে আনতেই হবে।’ সেই কথোপকথনই আমার জীবন বদলে দেয়।”

এরপর তিনি ফিরে যান মায়ের ও মাসিদের কাছে, খুঁজে বের করেন পারিবারিক রেসিপিগুলো। সেখান থেকেই জন্ম নেয় এমন এক রন্ধনশৈলী, যেখানে ফরাসি কৌশলের সঙ্গে মিশে যায় বাংলার আত্মা।

প্রিয়মের মতে, শুধুমাত্র ভারতীয় মশলা মিশিয়ে দিলেই কোনও ফরাসি পদ ভারতীয় হয়ে যায় না। বরং তিনি খুঁজে দেখেন বাংলা ও ফ্রান্সের দীর্ঘ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক।

তিনি বলেন, “আমি ফরাসি রান্নাকে বেছে নিয়েছি কারণ বাংলা ও ফ্রান্সের প্রায় ৩০০ বছরের ইতিহাস রয়েছে। চন্দননগর এখনও সেই ঐতিহ্যের সাক্ষী। সর্ষে, মাছ এবং বহু স্বাদের মিল— দুই রান্নাকেই স্বাভাবিকভাবে এক সুতোয় বেঁধে দেয়।”

তিনি উদাহরণ হিসেবে জানান, গোবিন্দভোগ চাল দিয়ে তৈরি করেন পারমেজান রিসোতো, প্রচলিত ক্যারামেলের বদলে ব্যবহার করেন নলেন গুড়, আর ফরাসি ডেজার্টেও জায়গা করে নেয় দেশি গুড়।

তাঁর অন্যতম সৃষ্টিশীল পদ ‘ডাব চিংড়ি ক্লাইমেট চেঞ্জ ’। এর পেছনের গল্পও একেবারে বাঙালির ঘরোয়া স্মৃতি।

প্রিয়ম বলেন, “রাতে বাড়ি ফিরে ফ্রিজ খুলে ঠান্ডা ডাব চিংড়ি গরম না করেই খাওয়ার যে অনুভূতি, সেই নস্টালজিয়াটাকেই আমি তুলে ধরতে চেয়েছি।”

নিজের নামে কোনও ‘সিগনেচার ডিশ’ রাখতে নারাজ

বিশ্বখ্যাত অনেক শেফের মতো প্রিয়মও কোনও একটি পদকে নিজের সিগনেচার ডিশ বলতে চান না।

তিনি বলেন, “যদি একটি প্রিয় পদ আঁকড়ে ধরে থাকি, তাহলে অতীতকেই আঁকড়ে থাকব। এতে আমি পক্ষপাতদুষ্ট এবং অনিরাপদ হয়ে পড়ব। আমি সবসময় নতুন কিছু সৃষ্টি করতে চাই।”

তাঁর কাছে পুরনো সাফল্য পুনরাবৃত্তির চেয়ে নতুন ভাবনাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বজুড়ে মিশেলিন-স্বীকৃত রেস্তোরাঁয় রান্না করলেও প্রিয়মের সবচেয়ে প্রিয় খাবার এখনও কলকাতার রাস্তার খাবার।

নিজের প্রিয় কলকাতা ফুড ট্রেইলের তালিকায় তিনি রেখেছেন পুঁটিরাম-এর সকালের নাস্তা, ভীম নাগ-এর মিষ্টি, ব্লু পপি-তে ডোমা ওয়াং-এর তিব্বতি খাবার, হাতারি, সাউদার্ন অ্যাভিনিউর ম্যান্ডারিন, ফ্লুরিজ, কুকি জার-এর মাটন প্যাটি, রাসেল ধাবা-র চিকেন ভর্তা, শর্মা ধাবা-র কাবাব, লেক গার্ডেন্সের নুসরাত-এর বিরিয়ানি এবং অবশ্যই তাওয়ায় তৈরি পরোটার সঙ্গে পুরনো দিনের ডিমের রোল— লাচ্ছা পরোটা নয়।

হেসে তিনি বলেন, “আমি কোনও আধুনিক বা বিলাসবহুল সংস্করণ চাই না। আমি সেই ডিমের রোলটাই চাই, যেখানে ডিমটা ভালো করে ভাজা হয় আর তার গন্ধেই মন ভরে যায়।”

এই মাসে গোরমেই-এর উদ্যোগে গ্লেনবার্ন পেন্ট হাউস-এ আয়োজিত ফ্রেঞ্চ-ইউরোপিয়ান গ্যাস্ট্রোনমি উইকএন্ড – এ অংশ নিতে কলকাতায় ফিরেছেন শেফ প্রিয়ম চট্টোপাধ্যায়। সেখানে তাঁর সঙ্গে রান্না করবেন কলকাতার সঙ্গে যুক্ত আরও দুই শেফ— ঋষভ শীল এবং শন কেনওয়ার্দি।

প্রিয়মের কাছে এই প্রত্যাবর্তন শুধু ফাইন ডাইনিং পরিবেশন নয়, বরং নিজের শিকড়ে ফিরে আসার অনুভূতি।

তিনি বলেন, “আমি বিশ্বের সেরা ফরাসি খাবার রান্না করতে পারি, কিন্তু আমার পরিচয় ভারতীয়। সেটা নিয়ে আমার গর্ব আছে। মানুষ যদি আমার রান্নার সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক খুঁজে না পান, তাহলে আমি ব্যর্থ।”