Wednesday, September 30, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

হর্ন ছাড়া কলকাতা: ২৫ বছর আগে হর্ন বাজানো ছেড়ে দেওয়া চালক দীপক দাসের গল্প

জীবনানন্দ দাশের একটি কবিতা বদলে দিয়েছিল স্টিয়ারিংয়ের সঙ্গে দীপক দাসের সম্পর্ক। ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে কলকাতার ব্যস্ততম রাস্তাগুলিতে এই অবসরপ্রাপ্ত ট্যাক্সিচালক গাড়ির হর্ন ব্যবহার না করেই গাড়ী চালাচ্ছেন।

“আমরা যাইনি মরে আজও—তবুও কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়”

— জীবনানন্দ দাশ

একবার ভাবুন তো—কলকাতার রাস্তায় গাড়ি চালাচ্ছেন, অথচ নিজের গাড়ির হর্নের শব্দ একবারও কানে আসছে না। ট্রাফিক সিগন্যালে অধৈর্য হর্ন নয়, যানজটে আটকে পড়ে মরিয়া হয়ে হর্ন বাজানো নয়, এমনকি স্টিয়ারিংয়ে হাত পড়তেই অভ্যাসবশত হর্ন চাপাও নয়।
দীপক দাসের কাছে এটাই গত ২৫ বছরেরও বেশি সময়ের জীবনযাপন।

অবসরপ্রাপ্ত ক্যাবচালক দীপক দাসের সঙ্গে কলকাতার কয়েকটি ব্যস্ততম রাস্তা ঘুরে দেখা গেছে, বাগুইআটির ভিআইপি রোড, বিধাননগরের হাডকো মোড় থেকে লেনিন সরণি এবং ক্যামাক স্ট্রিট—একের পর এক ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়েছেন তিনি। কিন্তু পুরো যাত্রাপথে একবারের জন্যও হর্নের দিকে হাত বাড়াননি দীপক।

১৯৯০ সাল থেকে গাড়ি চালাচ্ছেন দীপক। জীবিকার তাগিদে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী হলুদ ট্যাক্সি থেকে শুরু করে সাদা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ক্যাব—বিভিন্ন ধরনের গাড়ি চালিয়েছেন তিনি। বহু বছর ধরে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময়ের শিফটেও কাজ করেছেন। বর্তমানে অবসর নিয়েছেন। এখন শুধুমাত্র আনন্দের জন্য গাড়ি চালান।

“১৯৯০ সাল থেকে আমি চালক। জীবিকা নির্বাহের জন্য ট্যাক্সি চালিয়েছি, ভাড়ার গাড়ি চালিয়েছি, সব ধরনের ক্যাবই চালিয়েছি।”

কিন্তু হর্ন বাজানো বন্ধ করার সিদ্ধান্ত কোনও ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ বা ট্রাফিক সচেতনতা অভিযান থেকে আসেনি। এর পেছনে ছিল সাহিত্য।

জীবনানন্দের কবিতা থেকেই বদলের শুরু

দীপক দাস বই পড়তে ভালোবাসেন। গাড়িতে সবসময় একটি বই রাখতেন এবং সময় পেলেই পড়তেন। একদিন দুপুরে একটি বটগাছের নিচে বসে জীবনানন্দ দাশের কবিতার বই পড়ছিলেন তিনি। কবিতায় গাছ, পাখি এবং প্রকৃতির নানা স্বাভাবিক শব্দের বর্ণনা পড়ার সময়ই পাশের একটি স্কুলের সামনে থেকে ভেসে আসা একটানা গাড়ির হর্ন তাঁর মনোযোগে ছেদ ফেলে।
“আমি একটি বটগাছের নিচে বসে জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়ছিলাম। গাছ, পাখি আর প্রকৃতির স্বাভাবিক শব্দ নিয়ে পড়ছিলাম। ঠিক তখনই গাড়ির হর্নের শব্দ আমাকে অত্যন্ত বিরক্ত করে বাধা দিল। পাশের একটি স্কুল সেদিন ছুটি হয়েছিল। সন্তানদের নিতে আসা অভিভাবকেরা একের পর এক হর্ন বাজাচ্ছিলেন। তখনই আমি ঠিক করি, সম্পূর্ণভাবে হর্ন ব্যবহার করা বন্ধ করে দেব।”

সেদিনই দীপক তাঁর গাড়ি থেকে হর্নের ব্যবস্থা খুলে ফেলেন। এরপর দেখতে চেয়েছিলেন, হর্ন ছাড়া গাড়ি চালালে রাস্তায় তাঁর চলাফেরা কতটা কঠিন হয়ে ওঠে।

তাঁর বক্তব্য, আদৌ কঠিন হয়নি।

“রাস্তায় চলাচলের অধিকাংশ নিয়মই সাধারণ মানুষের অজানা”

দীপক দাসের মতে, সমস্যা শুধু হর্ন বাজানোর অভ্যাসে নয়; বরং রাস্তার প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতেও।

“ট্রাফিকের অধিকাংশ আইনই সাধারণ মানুষের অজানা। মোটর ট্রেনিং স্কুলগুলিতেও সত্যিকারের রাস্তার নিরাপত্তা সম্পর্কে খুব একটা শেখানো হয় না। রাস্তায় কীভাবে আরও সহানুভূতিশীল হওয়া যায়, সে বিষয়ে একটি পাঠও নেই। প্রত্যেককেই কোথাও না কোথাও পৌঁছতে হয়। আজকের সমাজে প্রত্যেকেই অযৌক্তিকভাবে তাড়াহুড়োর মধ্যে থাকে। কিন্তু অবিরাম হর্ন বাজানোর ফলে চালক ও পথচারীদের ওপর তার সম্পূর্ণ বিপরীত প্রভাব পড়েছে। আমরা এই শব্দের প্রতি সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলেছি।”

দীপক যে গাড়িটি চালান, তাতে লেখা রয়েছে—“Honking is not solution, it’s pollution” অর্থাৎ “হর্ন বাজানো কোনও সমাধান নয়, এটি দূষণ।”

শুধু বিরক্তি নয়, অতিরিক্ত শব্দে বাড়তে পারে স্বাস্থ্যঝুঁকিও

দীপকের উদ্বেগের সঙ্গে চিকিৎসাবিজ্ঞানও অনেকাংশে সহমত। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ (NIH)-এর তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে ৮৫ ডেসিবেলের বেশি মাত্রার ট্রাফিক শব্দের সংস্পর্শে থাকলে অন্তঃকর্ণের শ্রবণ কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পরবর্তী সময়ে এর ফলে স্থায়ীভাবে উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সির শ্রবণশক্তি হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

দীর্ঘস্থায়ী শব্দদূষণের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ এবং শরীরে অতিরিক্ত শারীরিক চাপ বা স্ট্রেসেরও সম্পর্ক রয়েছে।

দীপক দাস মনে করেন, এর সমাধান অনেক আগে থেকেই শুরু করা দরকার—শিশুদের রাস্তার নিয়ম শেখানোর পাশাপাশি রাস্তার প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ এবং সৌজন্যবোধও শেখাতে হবে।

“আমি শহরের বড় বড় স্কুলগুলিকে ‘নো হর্ন ডে’ পালন করতে দেখেছি। স্কুলগুলি তাদের পাঠ্যক্রমকে আরও সমৃদ্ধ করার জন্য এই ধরনের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু যে শিশুরা হাতে ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে ‘নো হর্ন’-এর বার্তা দেয়, তারাই আবার হর্ন বাজাতে বাজাতে বাড়ি ফেরে।”
তাই রাস্তা বদল নয়, বদল দরকার মানসিকতায়

দীপক দাসের কাছে শব্দদূষণ কমানোর লড়াই শুধুমাত্র রাস্তার কাঠামো বা ট্রাফিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের বিষয় নয়। এর জন্য প্রয়োজন মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন।

“এটা আসলে মানবিকতার বিষয়,” বলেন দাস। “সহযাত্রীর পরিস্থিতিটা বোঝার মতো খুব সাধারণ একটা বিষয়। হয়তো আমরা তাড়াহুড়োর মধ্যে আছি, কিন্তু হর্ন বাজালে সেই সমস্যার সমাধান হবে না। স্টিয়ারিংয়ের হর্নের চিহ্নে বারবার চাপ দিলেই রাস্তা হঠাৎ চওড়া হয়ে যাবে না।”

কলকাতার চিরচেনা হলুদ ট্যাক্সির স্টিয়ারিংয়ে বসে বছরের পর বছর জীবিকা অর্জন করেছেন দীপক দাস। অথচ ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি প্রমাণ করে চলেছেন—হর্ন না বাজিয়েও কলকাতার ব্যস্ত রাস্তায় গাড়ি চালানো সম্ভব। আর সেই নীরব পথচলার শুরু হয়েছিল একটি কবিতা থেকে—জীবনানন্দ দাশের কবিতা।