নার্স মানেই নারী। সমাজে এখনও এই ধারণাটাই সবচেয়ে বেশি প্রচলিত। অধিকাংশ মানুষের চোখে ‘নার্স’ বলতে ভেসে ওঠে সাদা পোশাক, মাথায় নার্সিং ক্যাপ, সাদা স্টকিংস ও আনুষ্ঠানিক জুতো পরিহিত এক নারীর ছবি, যিনি হাতে একটি ট্রে নিয়ে হাসপাতালের করিডোরে হেঁটে চলেছেন।
কিন্তু ‘নার্স’ একটি উভয়লিঙ্গবাচক বিশেষ্য। অর্থাৎ নার্স নারীও হতে পারেন, পুরুষও হতে পারেন। যোগ্যতা, দক্ষতা, দায়িত্ব বা পেশাগত পারদর্শিতার দিক থেকে পুরুষ নার্সরা তাঁদের নারী সহকর্মীদের থেকে কোনও অংশে কম নন। তাহলে কেন এখনও এই পেশাকে মূলত নারীদের সঙ্গেই যুক্ত করে দেখা হয়?

ওয়ার্ড বয় ভেবে ভুল করা থেকে চাকরির সুযোগ হারানো—বৈষম্যের নানা অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও কেন এখনও ভালোবাসেন এই পেশাকে?
আন্তর্জাতিক নার্সেস দিবস উপলক্ষে কলকাতার কয়েকজন পুরুষ নার্স জানিয়েছেন, কী তাঁদের এই পেশায় আসতে অনুপ্রাণিত করেছে, কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে এবং কীভাবে সেই বাধা অতিক্রম করে তাঁরা পেশাগত সাফল্য ও আত্মতৃপ্তি অর্জন করেছেন।

বেশিরভাগ পুরুষ নার্সের কাছেই এই পেশার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ মানুষের সেবা করার সুযোগ। চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তাঁরা জীবন বাঁচান, অসুস্থ ও প্রবীণদের সেবা করেন। পাশাপাশি এই পেশা দেয় আত্মতৃপ্তি, স্থিতিশীলতা এবং কর্মনিরাপত্তা।
স্টাফ নার্স মনবেন্দ্র মণ্ডল বলেন—
“প্রথমে শিক্ষক, পরে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতা, চাকরির অভাব এবং নিজের শহরে কাজ করার ইচ্ছা আমাকে নার্সিং বেছে নিতে বাধ্য করে। সবচেয়ে বড় কথা, মানুষের সেবা করা এবং তাঁদের ভালোবাসা ও আশীর্বাদ পাওয়ার ইচ্ছাই আমাকে এই পেশায় এনেছে।”
সল্টলেকের একটি চিকিৎসাকেন্দ্রের এমার্জেন্সি ইন-চার্জ সোহরাব হোসেন বলেন, মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার ইচ্ছাই তাঁকে নার্সিং বেছে নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

টাটা মেডিক্যাল সেন্টারের শিফট ইন-চার্জ সুহেল উদ্দিন বলেন—
“চিকিৎসাক্ষেত্র শুধু চিকিৎসকদের ওপর নির্ভর করে না, এটি একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা। বাবা-মা আমার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছিলেন, কিন্তু আশপাশের মানুষ একজন পুরুষ নার্সকে সহজভাবে নিতে পারেননি।”
ফর্টিস হাসপাতালের নার্সিং এডুকেটর লীলাম্বর মেহের বলেন—
“নার্সিং শুধু চিকিৎসা নয়। এটি সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ, রোগীর নিরাপত্তা এবং জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে মানুষের পাশে থাকার নাম।”
তিনি বর্তমানে নতুন নার্সদের প্রশিক্ষণ দেন এবং হাসপাতালের কর্মীদের জন্য এসওপি, রোগীর নিরাপত্তা, মানসম্পন্ন পরিচর্যা ও ক্লিনিক্যাল প্রোটোকল বিষয়ে প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেন।

নারায়ণা হাসপাতালের নার্স শুভেন্দু অধিকারীর কথায়—
“নার্সিং আমার কাছে শুধু একটি চাকরি নয়। এটি আমার দায়িত্ব এবং আমার আবেগ।”
শুধু পুরুষ হওয়ার জন্যে বহু নার্স বছরের পর বছর বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। প্রচলিত ধারণার সঙ্গে না মেলায় কেউ উপহাসের শিকার হয়েছেন, কেউ চাকরির সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন। তবুও তাঁরা নিজেদের ভালোবাসার পেশা ছাড়েননি।
আশিস মাইতি বলেন—
“নার্সিং যে শুধুই নারীদের পেশা—এই ধারণা এখনও বিশেষ করে কর্মজীবনের শুরুতে বড় বাধা। তবে এখন আমি কর্মক্ষেত্রে সমান সম্মান দাবি করি।”
মনবেন্দ্র মণ্ডল স্মৃতিচারণ করে বলেন—
“একজন পরিচিত ব্যক্তি বলেছিলেন, ‘ছেলে হয়ে নার্সিং পড়ছ কেন? এটা মেয়েদের কাজ।’ তখন খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। পরে সেই কষ্টই আমার অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। আজ বুঝতে পারি, আমার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল।”
লীলাম্বর মেহের জানান, অনেকেই পুরুষ নার্স দেখে অবাক হন। অন্যদিকে সুহেল উদ্দিন বলেন, তাঁকে প্রায়ই ওয়ার্ড বয় ভেবে ভুল করা হয়।
“একই ইউনিফর্ম পরেও অনেক রোগীর চোখে আমরা নার্স নই, শুধু সহকারী কর্মী।”
তিনি আরও জানান, একবার তাঁকে বলা হয়েছিল—
“পুরুষ নার্সরা নাকি যথেষ্ট যত্নশীল নন। তাই তিন মাস বিনা বেতনে কাজ করার পর নিয়োগের কথা ভাবা হবে।”
সোহরাব হোসেন বলেন—
“অনেকে আমাকে চিকিৎসক বলে মনে করেন, আবার কেউ দায়িত্বের বাইরে কাজ করতে বলেন। তবে আত্মবিশ্বাস এবং পেশাদারিত্বের সঙ্গে আমি এসব পরিস্থিতি সামলাই।”

পুরুষ ও নারী নার্সদের দায়িত্ব কি একই?
সংক্ষিপ্ত উত্তর—হ্যাঁ।
নার্সিংয়ের মূল ভিত্তি দক্ষতা, পরিচর্যা ও মানবিকতা—লিঙ্গ নয়।
শুভেন্দু অধিকারীর মতে—
“পুরুষ ও নারী—উভয় নার্সই সমানভাবে প্রশিক্ষিত এবং রোগীর পরিচর্যায় সমানভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিছু শারীরিকভাবে কষ্টসাধ্য কাজ আলাদা হতে পারে, কিন্তু নার্সিংয়ের মূল ভিত্তি হলো জ্ঞান, সহমর্মিতা, যোগাযোগ এবং দলগত কাজ।”
লীলাম্বর মেহেরের মতে, ব্যক্তিত্ব ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দক্ষতায় পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু তা কখনও লিঙ্গভিত্তিক নয়।
তিনি আরও জানান, রোগীর স্বাচ্ছন্দ্য, মর্যাদা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কথা বিবেচনা করে সচেতন নারী রোগীদের ক্ষেত্রে সাধারণত নারী নার্সদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। অন্যদিকে পুরুষ নার্সরা অধিকাংশ সময় পুরুষ রোগীদের দায়িত্ব পালন করেন।
আজকের দিনে নার্সিং একটি উচ্চ দক্ষতা ও পেশাদারিত্বনির্ভর ক্ষেত্র। রোগী পরিচর্যা, শিক্ষা, নেতৃত্ব, ক্রিটিক্যাল কেয়ার এবং হাসপাতাল পরিচালনা—সব ক্ষেত্রেই পুরুষ নার্সরা নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিচ্ছেন। দিনের শেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একজন নার্স রোগীর জন্য কতটা মানসম্পন্ন সেবা, নিষ্ঠা এবং পেশাদারিত্ব নিয়ে কাজ করছেন—তিনি নারী না পুরুষ, তা নয়।


