বাংলায় প্রকাশিত পশ্চিমবঙ্গের শিল্পীর গ্রাফিক নভেল ‘দ্য ওয়ার্ল্ড অফ লুবলু’ আন্তর্জাতিক কমিক্সের দুই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে মনোনীত—ভারতীয় কমিক্সের জন্য খুলে যাচ্ছে নতুন সম্ভাবনার দরজা
পশ্চিমবঙ্গের কার্টুনিস্ট ও গ্রাফিক ঔপন্যাসিক চার্বাক দীপ্ত ২০২৬ সালের উইল ‘আইজেনার কমিক ইন্ডাস্ট্রি অ্যাওয়ার্ডস’ -এর ‘বেস্ট ডিজিটাল কমিক’ বিভাগে মনোনীত হয়েছেন তাঁর ‘দ্য ওয়ার্ল্ড অফ লুবল’ গ্রাফিক নভেলের জন্য। বুক ফার্ম থেকে বাংলায় প্রকাশিত বইটির নাম ‘লুবলুর পৃথিবী’।

পথিকৃৎ কমিক্স-স্রষ্টা উইল আইজেনার-এর নামে আয়োজিত আইজেনার অ্যাওয়ার্ডস-কে কমিক্স দুনিয়ার ‘অস্কার’ বলা হয়। ২৪ জুলাই সান দিয়েগো কমিক-কন ইন্টারন্যাশনাল-এ পুরস্কারের বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়।
তবে দীপ্তর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির গল্প এখানেই শেষ নয়। দ্য ওয়ার্ল্ড অফ লুবলু চলতি বছরের ‘হার্ভে অ্যাওয়ার্ডস’-এর ডিজিটাল বুক অফ দ্যা ইয়ার বিভাগেও মনোনীত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পথিকৃৎ কার্টুনিস্ট হার্ভে কার্টজম্যান-এর নামে এই পুরস্কার। ভারতীয় উপমহাদেশের কোনও দীর্ঘ-আকারের, স্রষ্টার নিজস্ব মালিকানাধীন কাজ এর আগে এই দুই পুরস্কারের কোনও একটির জন্যই মনোনীত হয়নি—দুটিতে একসঙ্গে মনোনয়ন পাওয়া তো আরও বিরল ঘটনা।

দীপ্তর শিকড় বনগাঁয়, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি পশ্চিমবঙ্গের এই শহরটি কলকাতা থেকে প্রায় দুই ঘণ্টার দূরত্বে।
গবেষক ও প্রচ্ছদ-শিল্পী পিনাকী দে মনে করেন, দীপ্তর মনোনয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর কাজের উৎস ও পদ্ধতিতে। তাঁর মতে, দীপ্ত প্রথম ভারতীয় নন যিনি আইজেনার-এর জন্য মনোনীত হয়েছেন; কিন্তু তাঁর কাজ সম্পূর্ণভাবে ভারতে তৈরি এবং প্রথমে আঞ্চলিক বাজারের জন্য বাংলায় প্রকাশিত—এটাই তাঁকে বিশেষ করে তুলেছে।

পিনাকীর বক্তব্য, বিস্তৃত ‘বিদেশি’ যোগাযোগ ছাড়াই ভারত থেকে আন্তর্জাতিক মানের কমিক্স তৈরি করা সম্ভব—দীপ্তর সাফল্য তারই প্রমাণ। সেই অর্থে তিনি ভারতীয় কমিক্সের ভবিষ্যতের একজন পথিকৃৎ।
দীপ্তর এই স্বীকৃতি আরও একটি সাম্প্রতিক মাইলফলের সঙ্গে যুক্ত—আনন্দ আর কে-এর ‘পুলিৎজার প্রাইজ ফর ইলাস্ট্রেটেড রিপোর্টিং অ্যান্ড কমেন্টারি’ জয়। তাঁর অনলাইন কমিক্সও আইজেনার অ্যাওয়ার্ড-এর জন্য মনোনীত হয়েছে।

একের পর এক এমন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ভারতীয় কমিক্সে নতুন ‘মুহূর্ত’-এর ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে দীপ্তর গল্প শুধু সাফল্যের গল্প নয়; এটি প্রশ্ন তোলে—‘ভারতীয় কমিক্স’ বলতে আমরা কী বুঝি, কারা তা তৈরি করার সুযোগ পান এবং কোন অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে সেই কাজ সম্ভব হয়?
চার্বাক দীপ্তর নামও তাঁর শিল্পীসত্তার মতোই ব্যতিক্রমী। তাঁর বাবা ছিলেন প্রাচীন ভারতীয় বস্তুবাদী চার্বাক দর্শন-এর একনিষ্ঠ অনুসারী। সেই দর্শনের নামেই ছেলের নামকরণ। ‘দীপ্ত’ কোনও জাতিগত পদবি নয়; এটি তাঁর বাবার প্রথম নামের একটি অংশ।

দীপ্ত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেন। তাঁর সৃষ্ট চরিত্র লুবলু তাঁর শিল্পীসত্তার alter ego। রুশ শব্দ, অর্থ, ‘আমি ভালোবাসি’—থেকে এই নামের উৎস। তাঁর মা রাজ কাপুরের ‘মেরা নাম জোকার’ (1970) ছবিতে শব্দটি শুনে নামটি পছন্দ করেছিলেন।
চার বছর আগে ৩৬০ ডিগ্রি VR ওয়েবকমিক্সে প্রথম লুবলুর আবির্ভাব। পরে সেই চরিত্রকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয় The World of Lublu—বাস্তবতা, উপলব্ধি ও আত্মসত্তার প্রকৃতি নিয়ে এক রঙিন অথচ দার্শনিক অনুসন্ধান।
বইটির পাতায় ছড়িয়ে রয়েছে দেকার্ত, ভ্যান গঘ থেকে শুরু করে ভারতীয় জাদুকর পি. সি. সরকার-এর মতো নানা সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক রেফারেন্স। দীপ্ত এমনকি তাঁর ‘Easter eggs’-গুলিকেও ফুটনোটে চিহ্নিত করেন। যেন বইটি পাঠককে জানিয়ে দিতে চায়—তার স্রষ্টা জানেন তিনি কী করছেন এবং কী জানেন।
কলকাতায় দ্যা টাইমস অফ ইন্ডিয়া-এর কার্টুনিস্ট হিসেবে দীপ্তর কর্মজীবনের শুরু। পরে তিনি ট্যাবলয়েড, ম্যাগাজিন এবং Scholastic-এর মতো প্রকাশকের জন্য বাণিজ্যিক ইলাস্ট্রেটর হিসেবে কাজ করেন।
বইয়ের প্রচ্ছদ, কার্টুন, শিশুদের ছবির বই এবং বিভিন্ন ‘work-for-hire’ প্রকল্পে তাঁর কাজের বিস্তৃত পরিসর তৈরি হয়। নর্ডিক পুরাণ থেকে ‘মালগুডি ডে’জ’ -ধাঁচের গল্প, এমনকি গ্যাংস্টার-কেন্দ্রিক আখ্যানও তাঁর কাজের অংশ।
দীপ্ত বড় হয়েছেন ইন্দ্রজাল কমিকস , চাচা চৌধরী এবং বাংলার কমিক্সের দুই দিকপাল নারায়ণ দেবনাথ ও ময়ূখ চৌধুরী-র কাজ পড়ে। এই ধারাই পরবর্তীকালে দেবাশিস দেব, ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য ও উদয় দেব-এর মতো শিল্পীদের কাজে বহমান থেকেছে।
কিন্তু বর্তমান কমিক্স বাজার আগের মতো নেই। একসময় একটি কমিক্সের একক সংখ্যাই মাসে কয়েক লক্ষ কপি বিক্রি করতে পারত। সেই গণবাজার এখন অনেকটাই খণ্ডিত। ফলে একজন কার্টুনিস্টকে একইসঙ্গে ইলাস্ট্রেটর, কালারিস্ট, লেটারার, প্রচ্ছদ-শিল্পী, এমনকি নিজের কাজের প্রকাশক ও অনুবাদকও হতে হয়।
দীপ্তের যাত্রায় Mad Bongs-এর মতো কলকাতাভিত্তিক শিল্পী-সমষ্টিরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এই গোষ্ঠী ক্যালেন্ডার, অ্যান্থলজি ও স্ব-প্রকাশিত কমিক্স তৈরি করে এবং একটি অনিশ্চিত শিল্প-পরিবেশে পারস্পরিক সহযোগিতার জায়গা তৈরি করেছে।
‘লুবলুর পৃথিবী’-তে তরুণ ও কল্পনাপ্রবণ লুবলু তার যুক্তিবাদী বন্ধু কিম-কে সঙ্গে নিয়ে এক surreal যাত্রায় বেরিয়ে পড়ে। বাস্তবতার প্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে গল্পে হাজির হয় নানা রঙিন চরিত্র।
দীপ্তর স্বাক্ষরধর্মী ভিজ্যুয়াল ভাষায় , খেলাচ্ছলে বিভিন্ন আঁকার শৈলীর প্রভাব থাকলেও এর চূড়ান্ত রূপ একান্তই দীপ্তর নিজস্ব।
দীপ্তর লক্ষ্য বহু-প্রজন্মের পাঠক। তাঁর কাজ এমনভাবে আঁকা যাতে শিশুরা প্রথমে এর রঙিন ভিজ্যুয়াল জগৎ উপভোগ করতে পারে, পরে বড় হয়ে একই বইয়ে খুঁজে পায় বাস্তবতা ও অস্তিত্ব নিয়ে গভীর দার্শনিক প্রশ্ন।
এই দ্বৈততাই তাঁর শিল্পচর্চার শক্তি—শিশু ও দার্শনিক, সহজবোধ্য ও গভীর।
তাঁর আসন্ন বক্সসেটে শিশুদের জন্য রবীন্দ্রনাথের বীরপুরুষ -এর প্রাণবন্ত রূপান্তরের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য জীবনানন্দ দাশের কবিতা অবলম্বনে বনলতা সেন থাকবে। একই শিল্পী, একই প্রকাশক—কিন্তু দুই ভিন্ন পাঠকগোষ্ঠী।
দীপ্ত প্রথমে The World of Lublu ইংরেজিতে লিখেছিলেন। প্রকাশকদের প্রত্যাখ্যানের পর তিনি বাংলায় বইটি প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন। বুক ফার্ম-এর প্রকাশিত লুবলুর পৃথিবী বাণিজ্যিক ও সমালোচনামূলক—দুই দিক থেকেই সফল হয়।
বইটি নারায়ণ দেবনাথ পুরস্কার পায় এবং কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় পাঠকদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য সাড়া পায়।
দীপ্ত মনে করেন, সমকালীন বাংলা প্রকাশনা জগৎ পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য আগের তুলনায় অনেক বেশি উন্মুক্ত। তাঁর আক্ষেপ, অনেক প্রকাশক নিজেদের সৃজনশীল বিচারবুদ্ধির উপর আস্থা না রেখে আন্তর্জাতিক পুরস্কারের স্বীকৃতির অপেক্ষা করেন। তবে এখন ইংরেজি সংস্করণের মুদ্রিত সংস্করণের জন্যও প্রস্তাব আসতে শুরু করেছে।
দীপ্তর কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল সাহিত্যনির্ভরতা। সুকুমার রায়ের হ জ ব র ল, হেঁসোরাম , হুঁশিয়ারের ডায়েরি এবং এমনকি মৌলিক লুবলু-তেও নানা সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক রেফারেন্স রয়েছে। ‘নায়ক’ (1966)-এর স্বপ্নদৃশ্যের সঙ্গেও তাঁর একটি দৃশ্যের মিল রয়েছে।
গ্রাফিক নভেলের ক্ষেত্রে এটি নতুন কৌশল নয়—প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যের মর্যাদা ধার করে নিজের কাজকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলা।
এই গল্পের সবচেয়ে প্রতীকী অধ্যায় সম্ভবত উইল আইজেনার-এর A Contract with God বাংলায় অনুবাদ করা। নিজের আইজেনার মনোনয়নের প্রায় একই সময়ে দীপ্ত এই কাজটি সম্পূর্ণ করেন।
আইজেনারের Dropsie Avenue-এর সঙ্গে উত্তর কলকাতার মিল খুঁজে পেয়েছিলেন দীপ্ত। তাঁর মতে, ইহুদি অভিবাসীদের যন্ত্রণা, সংগ্রাম ও ঘিঞ্জি বসতি-জীবনের সঙ্গে দেশভাগের পর পশ্চিমবঙ্গে বসতি গড়া পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তুদের অভিজ্ঞতার গভীর সাদৃশ্য রয়েছে।
দীপ্তর কাজের দর্শন যেন তাঁর নামের মধ্যেই নিহিত চার্বাক ভাবনার সঙ্গে মিলে যায়। চার্বাকরা মনে করতেন, উপলব্ধিই জ্ঞানের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস—যা দেখা যায়, সেটিই বাস্তব।
দীপ্তর কর্মজীবন ভারতীয় শিল্পীদের জন্য একটি স্বাধীন পথের সম্ভাবনা দেখায়—নিজের কাজ তৈরি করা, প্রয়োজন হলে অনুবাদ করা, অনলাইনে নিজেই প্রকাশ করা এবং নিজের যোগ্যতার স্বীকৃতির জন্য নিজেই আন্তর্জাতিক পুরস্কারে কাজ জমা দেওয়া।
তিনি ইতিমধ্যেই motion comics-এর জন্য YouTube channel চালু করেছেন, যেখানে বিনামূল্যে মাসে একটি করে পর্বে বিস্তারিতভাবে রামায়ণ পুনর্কথিত করছেন। লুবলু-এর sequel-এর কাজও চলছে। তাঁর কথায়, দ্রুত অর্থ উপার্জনের জন্য তিনি কাজের মানের সঙ্গে আপস করতে চান না।
শেষ পর্যন্ত তাই চার্বাক দীপ্তর গল্প শুধুই Eisner বা Harvey Awards-এ মনোনয়নের গল্প নয়। এটি আঞ্চলিক ভাষা, প্রযুক্তি, স্বাধীন প্রকাশনা, স্রষ্টার নিজস্ব মালিকানা এবং বিশ্বমঞ্চে পৌঁছনোর নতুন পথের গল্প।
বাংলা থেকে শুরু করে বিশ্ব কমিক্সের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে পৌঁছে দীপ্ত হয়তো প্রমাণ করছেন—আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য সবসময় বিদেশে গিয়ে শুরু করতে হয় না। কখনও কখনও নিজের ভাষা, নিজের শহর এবং নিজের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বিশ্বকে নতুন গল্প শোনানো যায়।


