Saturday, August 15, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

একাধারে মনের চিকিৎসক আবার মঞ্চের ঝলমলে তারকা: কলকাতার ‘ড. কুইয়ার’-এর অনন্য দ্বৈত জীবন

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ভাস্কর দাস দিনের বেলা সাদা অ্যাপ্রন পরেন, আর সন্ধ্যা নামলেই উইগ, মুক্তো আর গ্ল্যামারাস মেকআপে ‘ড. কুইয়ার’ রূপে ভেঙে দেন সমাজের প্রচলিত ধ্যানধারণা। ড্র্যাগ পারফরম্যান্সকে তিনি ব্যবহার করছেন লিঙ্গ-পরিচয়ের গণ্ডি ভাঙতে এবং প্রকৃত প্রতিনিধিত্বের বার্তা ছড়িয়ে দিতে।

বেশিরভাগ চিকিৎসকের পরিচয় সাদা অ্যাপ্রন। কিন্তু ড. ভাস্কর দাস কখনও কখনও সেই সাদা অ্যাপ্রনের বদলে পরেন করসেট, গগনচুম্বী উইগ এবং চোখধাঁধানো মেকআপ।
দিনের বেলায় তিনি একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, সাইকোথেরাপিস্ট, সেক্সোলজিস্ট এবং নেশামুক্তি বিশেষজ্ঞ। আর সন্ধ্যা নামলেই তিনি রূপ নেন ঝলমলে ড্র্যাগ শিল্পী ‘ড. কুইয়ার’-এ।

এই অপ্রচলিত পরিচয় অনেককেই বিস্মিত করে, আবার সমাজের বহু প্রচলিত ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ জানায়। তবে ভাস্কর দাসের কাছে চিকিৎসা এবং ড্র্যাগ—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জগত নয়। তাঁর মতে, দুটোরই মূল ভিত্তি মানুষের মনকে বোঝা এবং মানুষের গল্প তুলে ধরা।

২০২০ সালের কোভিড-১৯ লকডাউনের সময় মার্কিন রিয়্যালিটি শো ‘রুপলস্ ড্র্যাগ রেস’ দেখতে দেখতেই তাঁর ড্র্যাগ-জগতের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়।

তিনি বলেন, “প্রথমে এটি ছিল শুধুই মানসিক স্বস্তি এবং বিনোদনের একটি মাধ্যম। কিন্তু ধীরে ধীরে এই অনুষ্ঠান আমাকে বহু বিষয় নতুনভাবে ভাবতে এবং প্রশ্ন করতে শেখায়।”

ড্র্যাগ সম্পর্কে যত গভীরে জানতে শুরু করেন, ততই উপলব্ধি করেন—ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে এর অনেক মিল রয়েছে।

মেদিনীপুরের পৈতৃক বাড়িতে বড় হওয়ার সময় নিয়মিত লোকনাট্য এবং পৌরাণিক যাত্রাপালা দেখতেন ভাস্কর দাস। সেখানে ‘যাত্রার রানী’ নামে পরিচিত পুরুষ অভিনেতারা মহিলাদের চরিত্রে অভিনয় করতেন এবং দর্শকরাও তাঁদের সহজভাবেই গ্রহণ করতেন।

তিনি বলেন, “তাঁদের নারীত্বের উপস্থাপন ছিল অসাধারণ আকর্ষণীয়। তখন কখনও ভাবিনি, একদিন এই শিল্পরূপই আমার জীবনের এত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে।”

তবে এই যাত্রা মোটেই সহজ ছিল না।

মেকআপ শেখা থেকে শুরু করে হাই হিল, করসেট এবং প্রসাধনী কিনতে দোকানে যাওয়া—সব ক্ষেত্রেই তাঁকে অস্বস্তি, সামাজিক জাজমেন্ট এবং নিজের অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হয়েছে।

তিনি বলেন, “নিজের নারীত্বকে গ্রহণ করা এবং সেটিকে নিজের পরিচয়ের অংশ হিসেবে মেনে নেওয়াই ছিল সবচেয়ে কঠিন কাজ। প্রথমদিকে অনেকেই ভাবতেন ড্র্যাগ মানেই শুধু নারীর পোশাক পরা। কিন্তু আজ ড্র্যাগ তার থেকেও অনেক বিস্তৃত। একজন ড্র্যাগ শিল্পী যে কোনও চরিত্রে, এমনকি সম্পূর্ণ কল্পনার কোনও সত্তাতেও রূপ নিতে পারেন।”

নিজস্ব ড্র্যাগ পরিচয় তৈরি করতে যেমন সময় লেগেছে, তেমনই চিকিৎসক সমাজের সমালোচনার মুখোমুখিও হতে হয়েছে তাঁকে।

চিকিৎসকদের একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে দেখতেই অভ্যস্ত সমাজ। ফলে তাঁর এই শিল্পচর্চা অনেক সহকর্মীর প্রত্যাশার সঙ্গে মেলেনি। কেউ কেউ তাঁকে সতর্কও করেছিলেন—রোগীরা যদি জানতে পারেন তিনি ড্র্যাগ পারফর্ম করেন, তাহলে তাঁরা তাঁর উপর আস্থা হারাতে পারেন।
কিন্তু সেই পরামর্শ তিনি শোনেননি।

ছয় বছর পরও তিনি সমান উৎসাহে ড্র্যাগ পারফর্ম করছেন, নতুন নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন এবং প্রতিনিয়ত নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করে চলেছেন।

ভাস্কর দাস বলেন, “মানুষকে তাদের স্বস্তির গণ্ডি থেকে বের করে আনতে আমার ভালো লাগে।”

তাঁর মতে, মনোরোগ চিকিৎসা এবং ড্র্যাগ একে অপরের পরিপূরক। একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি বিচারহীনভাবে মানুষের কথা শুনতে এবং তাঁদের জীবনের অভিজ্ঞতা বুঝতে প্রশিক্ষিত। একইভাবে ড্র্যাগও মানুষের ব্যক্তিগত গল্প এবং অভিজ্ঞতার প্রকাশের একটি শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম।

তিনি বলেন, “ড্র্যাগ এমন এক শিল্প, যার ভিত্তিই হলো রূপান্তর। এখানে প্রতিটি খুঁটিনাটি গুরুত্বপূর্ণ। একজন ড্র্যাগ কুইনকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে মেকআপ নিখুঁত করতে, উইগ সাজাতে, পোশাক তৈরি করতে এবং এক নিখুঁত বিভ্রম সৃষ্টি করতে হয়। এই গ্ল্যামারের আড়ালে থাকে অসীম পরিশ্রম, দক্ষতা এবং ধৈর্য।”

তিনি জানান, তাঁর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় একটি ঘটনা, যখন এক রোগী একটি ড্র্যাগ শো-তে তাঁকে চিনে ফেলেছিলেন।

প্রথমে পরিস্থিতি কিছুটা অস্বস্তিকর হলেও পরে সেটি এক আন্তরিক এবং আবেগঘন অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।সেই রোগী আজও তাঁর পাশে রয়েছেন এবং প্রতিটি পারফরম্যান্সের পর তাঁকে উৎসাহব্যঞ্জক বার্তা পাঠান।ভাস্কর দাস অনুপ্রেরণা পান বার্লেস্ক শিল্পধারা এবং ড্রিমগার্লস ও বার্লেস্ক ছবিগুলি থেকে।

গায়িকা-অভিনেত্রী ক্রিস্টিনা অ্যাগুইলেরা-র গ্ল্যামারে মুগ্ধ হয়ে একবার তিনি বিশাল উটপাখির পালকের হেডপিস এবং হাতে সেলাই করা ৫০০-রও বেশি মুক্তো দিয়ে সাজানো করসেট পরেছিলেন।

তবে সেই পরিবেশনার অর্থ ছিল আরও গভীর।

তিনি বলেন, “এটি ছিল স্কুলজীবনের সেই ছোট্ট সমকামী ছেলেটির উদ্দেশ্যে আমার ভালোবাসার চিঠি—যে নারীত্বের প্রতি আকৃষ্ট ছিল এবং আলাদা হওয়ার জন্য নিয়মিত নিগ্রহের শিকার হতো।”

ভাস্কর দাসের মতে, ড্র্যাগ সম্পর্কে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো—অনেকে মনে করেন, মহিলাদের মতো পোশাক পরলেই সেই ব্যক্তি লিঙ্গ পরিবর্তন করতে চান।

তিনি বলেন, “পুরুষতান্ত্রিক এবং হেটেরোনরমেটিভ সমাজে এমন সব শিল্পরূপ, যা দ্বৈত লিঙ্গ-ধারণাকে প্রশ্ন করে, সেগুলিকে প্রায়ই প্রান্তিক করে দেওয়া হয়।”

তিনি আরও বলেন, কুইয়ার সমাজের মধ্যেও ফেমফোবিয়া বা নারীত্বের প্রতি বিদ্বেষের প্রবণতা এখনও বিদ্যমান।

তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, “একজন সমকামী ব্যক্তি আমাকে একবার বলেছিলেন—’মেয়েদের মতো আচরণ কোরো না। পুরুষ হও। জিমে যাও, খেলাধুলা করো, পুরুষালি গড়ন বজায় রাখো।'”

ভাস্কর দাসের মতে, কুইয়ার পরিচয় নিয়ে আলোচনাকে শুধুমাত্র দৃশ্যমানতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না।

তিনি বলেন, “কুইয়ার মানুষ শুধু শহরের সুবিধাপ্রাপ্ত সমাজেই বাস করেন না। তাঁরা গ্রামেও আছেন, ছোট শহরেও আছেন, সমাজের প্রান্তিক সম্প্রদায়ের মধ্যেও আছেন। তাই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দৃশ্যমানতা নয়, প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।”