মৈত্রী মজুমদার: বড় কোনও পরিবর্তনের জন্য সবসময় বড় কোনও উদ্যোগের প্রয়োজন হয় না। প্রতিদিনের জীবনে একজন মানুষের নেওয়া ছোট্ট, সচেতন পদক্ষেপও যে সমাজ ও পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে—এই গুরুত্বপূর্ণ বার্তাই উঠে এল কলকাতার দ্যা ফিউচার ফাউন্ডেশন স্কুল-এ আয়োজিত ‘সীডস অফ হোপ অ্যান্ড অ্যাকশন: মেকিং দ্যা SDGs এ রিয়্যালিটি’ (SOHA) প্রদর্শনীতে।
শান্তি, সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং স্থায়িত্বের মূল্যবোধ প্রসারে নিবেদিত সংগঠন ভারত সোকা গাক্কাই (BSG)-এর উদ্যোগে ৩০ জুলাই ২০২৬ আয়োজিত হয় এই বিশেষ প্রদর্শনী। Earth Charter International এবং Soka Gakkai International (SGI)-এর যৌথ উদ্যোগে তৈরি SOHA প্রদর্শনীটি বিদ্যালয়ে আয়োজনের ক্ষেত্রে অধ্যক্ষ, শিক্ষক-শিক্ষিকা, পড়ুয়া এবং আর্থ লাভার্স ’ ক্লাব-এর সদস্যদের পূর্ণ সহযোগিতা ছিল।

পরিবেশ ও সমাজের প্রতি দায়িত্বশীলতার বার্তা ছড়িয়ে দিতে আয়োজিত এই উদ্যোগে অংশ নেন ৭৫০-রও বেশি পড়ুয়া ও অভিভাবক। পড়ুয়াদের শ্লোক পাঠের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এরপর অংশগ্রহণকারীদের সামনে তুলে ধরা হয় রাষ্ট্রসংঘের Sustainable Development Goals (SDGs) বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এগিয়ে নিয়ে যেতে BSG-এর বিভিন্ন উদ্যোগের কথা।
বিশ্বজুড়ে পরিবেশগত ও সামাজিক যে নানা চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, সেগুলি নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দেয় এই প্রদর্শনী। একই সঙ্গে তুলে ধরা হয় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—একজন সাধারণ মানুষ কি তাঁর নিজের দৈনন্দিন কাজের মাধ্যমে ভবিষ্যৎকে আরও টেকসই করে তুলতে পারেন?
SOHA-র বার্তা ছিল স্পষ্ট—পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা নয়, পরিবর্তনের অংশ হয়ে ওঠাই আসল।
প্রদর্শনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ ছিল এর ২৭টি প্যানেল। তবে এই প্রদর্শনীর বিশেষত্ব শুধু প্যানেলগুলির বিষয়বস্তুতে নয়; বরং তা দর্শকদের সামনে তুলে ধরার দায়িত্বও ছিল বিদ্যালয়ের ছাত্র-স্বেচ্ছাসেবকদের হাতে।
এর জন্য ছাত্র-স্বেচ্ছাসেবকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতি দেওয়া হয়েছিল। তাঁরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দর্শকদের একের পর এক প্যানেল ঘুরিয়ে দেখায় এবং প্রতিটি প্যানেলে উঠে আসা বিষয় ও বার্তা ব্যাখ্যা করে।

কিন্তু তাঁদের ভূমিকা শুধু তথ্য ব্যাখ্যা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। নিজেদের উপলব্ধিও তাঁরা দর্শকদের সঙ্গে ভাগ করে নেয়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ মানুষ কীভাবে প্রতিদিনের জীবনের সহজ ও ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে নিজেদের সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছেন, সেই উদাহরণও তুলে ধরে তারা।
ফলে প্রদর্শনীর বার্তা আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে—অর্থবহ পরিবর্তনের শুরু কোনও দূরের জায়গা থেকে নয়, শুরু হতে পারে আমাদের প্রত্যেকের নিজের জীবন থেকেই।
SOHA প্রদর্শনী পড়ুয়াদের কাছে শুধু একটি প্রদর্শনী হয়ে থাকেনি। বহু পড়ুয়া জানিয়েছে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে sustainability বা স্থায়িত্বশীলতা সম্পর্কে তাদের ধারণা আরও বিস্তৃত হয়েছে।
পরিবেশের প্রতি আরও দায়িত্বশীল আচরণ এবং দৈনন্দিন জীবনে পরিবেশবান্ধব অভ্যাস গ্রহণের ক্ষেত্রেও তারা উৎসাহ পেয়েছে। অর্থাৎ পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি শুধু বই বা শ্রেণিকক্ষের আলোচনায় সীমাবদ্ধ না রেখে নিজেদের জীবনযাত্রার অংশ করে তোলার প্রেরণা পেয়েছে তারা।

অভিভাবকরাও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, এমন কর্মসূচি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে শুধু পরিবেশ সচেতনতা নয়, দায়িত্ববোধ এবং বিশ্বনাগরিকত্বের মানসিকতা গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আগামীর উদ্যোগে BSG-এর সঙ্গে সহযোগিতায় আগ্রহী স্কুল
প্রদর্শনীটি বিদ্যালয়ে আয়োজন করার জন্য BSG-এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন The Future Foundation School-এর অধ্যক্ষ ও শিক্ষক-শিক্ষিকারা। শান্তি, সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং স্থায়িত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে ভবিষ্যতেও BSG-এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার বিষয়ে তাঁরা গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন।
তাঁদের মতে, এই ধরনের উদ্যোগ পড়ুয়াদের শুধু সচেতন করে তোলে না, বরং তাঁদের এমন সক্রিয় নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে, যারা ভবিষ্যতে আরও টেকসই ও সহমর্মী সমাজ নির্মাণে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে।

একটি স্থিতিশীল পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যতের লক্ষ্যে BSG
ভারত সেকা গাক্কাই (BSG) সকলের সুখ ও শান্তির মূল্যবোধ প্রসারে নিবেদিত একটি সংগঠন। শান্তি, সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং স্থায়িত্ব—এই চারটি ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে সংগঠনটি বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করে।
BSG-এর অন্যতম লক্ষ্য হল ‘empowering individuals’ বা ‘ব্যক্তিকে ক্ষমতায়িত করা’ এবং ভারতে এমন একটি ‘New Age’ বা ‘নতুন যুগ’ গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি জীবনের মর্যাদাকে সম্মান করা হবে।
সংগঠনটির ২,৭৫,০০০-এরও বেশি স্বেচ্ছাসেবী সদস্য রয়েছেন। তাঁরা ভারতের ৬০০টি শহর ও নগরে ছড়িয়ে রয়েছেন এবং বিভিন্ন বয়সের মানুষ এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত।

২০৩০ সালের মধ্যে একটি স্থিতিশীল পরিবেশবান্ধব যুগ গড়ে তোলার লক্ষ্যে BSG ২০২১ সালে চালু করে ‘BSG for SDG’ উদ্যোগ। এর মূলমন্ত্র—‘Towards 2030: Achieving SDGs through Sustainable Human Behaviour’, অর্থাৎ ‘২০৩০-এর পথে: দীর্ঘস্হায়ী পরিবেশবান্ধব মানব আচরণের মাধ্যমে SDG অর্জন।’
এই উদ্যোগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ কীভাবে একটি পরিবেশবান্ধব সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারেন, সেই বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে একাধিক কর্মসূচি পরিচালনা করছে BSG। লক্ষ্য একটাই—মানুষকে বোঝানো যে সমাজ ও পরিবেশের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার ক্ষমতা শুধু প্রতিষ্ঠান বা সরকারের হাতে নয়; সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন আচরণ ও সিদ্ধান্তও সেই পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি।
আর সেই পথেই তৈরি করতে হবে এমন একটি বিশ্ব, যেখানে কোনও প্রাণই পিছিয়ে থাকবে না।


