Monday, June 29, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

রাস্তার লাইব্রেরিতেই পাঠবিপ্লবের স্বপ্ন: শিশুদের হাতে বিনামূল্যে বই তুলে দিয়ে নজির গড়ছেন কলকাতার শিক্ষক

ভাঙা ফ্রিজ থেকে শুরু, মাত্র পাঁচ বছরে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে ১৯টি স্ট্রিট লাইব্রেরি স্থাপন, কালিদাস হালদারের।

কলকাতার পাটুলির একটি রাস্তায়, একটি অকেজো ফ্রিজ আর নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কেনা কয়েকটি শিশুদের বইকে সঙ্গী করেই শুরু হয়েছিল এক স্কুলশিক্ষকের ‘সবার জন্য শিক্ষা’ আন্দোলন।

তখন হয়তো ৫১ বছর বয়সি ইংরেজির শিক্ষক কালিদাস হালদার নিজেও ভাবতে পারেননি, মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে তাঁর উদ্যোগ পশ্চিমবঙ্গজুড়ে ১৯টি জনসাধারণের লাইব্রেরিতে রূপ নেবে। এই লাইব্রেরিগুলির মধ্যে সুন্দরবনের চারটিও রয়েছে, যেখানে ছাত্রছাত্রীরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বই পড়ার সুযোগ পায়।

শুরুটা মোটেই সহজ ছিল না। তবে ধীরে ধীরে একের পর এক সুযোগ এসেছে, আর তাঁর প্রচেষ্টাও ফল দিতে শুরু করেছে। বইয়ের নথিপত্র রাখা রেজিস্টারের পাতা ওল্টাতে ও চশমা ঠিক করতে করতে সেই দিনের কথা স্মরণ করলেন কালিদাস হালদার।

তিনি প্রতিবেদক-কে বলেন, “আমার কাছে ছিল শুধু একটি ভাঙা ফ্রিজ আর বৈষ্ণবঘাটা পাটুলি টাউনশিপের ফুটপাথে একটি মুদি দোকানের পাশে কয়েক সেন্টিমিটার জায়গা। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ওই ফ্রিজে ৫০০টি বই সাজিয়ে পাটুলির প্রথম স্ট্রিট লাইব্রেরির সূচনা করি।”

‘লাইব্রেরি শুধু শিক্ষিত ও অভিজাতদের জন্য’— এই ধারণা ভাঙতেই পথচলা,

কালিদাসের কথায়, “বিষয়টি অনেকের কাছে অদ্ভুত মনে হতে পারে। কিন্তু আমি সেই পূর্বধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চেয়েছিলাম যে, ‘লাইব্রেরি শুধু শিক্ষিত ও অভিজাতদের জন্য।’ আমার বিশ্বাস, সাধারণ মানুষের মধ্যে শিক্ষার প্রসারে স্ট্রিট লাইব্রেরির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন (বউবাজার শাখা)-এ টানা ২৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষকতা করছেন কালিদাস। তাঁর চোখের সামনেই ধীরে ধীরে কমে যেতে থাকে বই পড়ার অভ্যাস, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে।

করোনাকালেই তাঁর মাথায় জন্ম নেয় এই নতুন ভাবনা।
২০২১ সালে করোনা মহামারির সময়, যখন রাস্তাঘাট জনশূন্য আর মোবাইল-কম্পিউটারই বাইরের জগতের একমাত্র জানালা হয়ে উঠেছিল, তখন তাঁর ছেলে কিংশুক বাবাকে বইপ্রেমীদের জন্য কিছু করার অনুপ্রেরণা দেন।

সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় নতুন অধ্যায়।

ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার পর কালিদাস ফুটপাথে একটি ছোট জায়গা ভাড়া নিয়ে টিনের ছাউনি দেওয়া একটি লাইব্রেরি কক্ষ তৈরি করেন। বর্তমানে সেখানে ৬,০০০ থেকে ৭,০০০ বইয়ের বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। বইগুলির কিছু এসেছে তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে, আর অনেক বই এসেছে বিভিন্ন মানুষের দানে।

বাংলা চলচ্চিত্রের অভিনেতা সব্যসাচী চক্রবর্তীও নিয়মিত এই লাইব্রেরিগুলিতে বই দান করেন বলে জানান কালিদাস।

এই উদ্যোগের মূল ভাবনা ছিল খুবই সহজ— বই মানুষের নাগালে পৌঁছে দাও, গল্প নিজেই তার পাঠক খুঁজে নেবে।

বর্তমানে কলকাতা ও সুন্দরবনের পাশাপাশি দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং নদিয়া জেলাতেও চলছে কালিদাস হালদারের স্ট্রিট লাইব্রেরি।

তিনি বলেন, “খুব শীঘ্রই বারুইপুরের জুলপিয়ায় আমাদের ২০তম লাইব্রেরি চালু হবে। মালদাতেও একটি লাইব্রেরি তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।”

শুধু বিনামূল্যে বই দিলেই সচেতনতা তৈরি হয় না। মানুষকে জানাতেও হবে কোথায় এই বই পাওয়া যাবে।

কালিদাস বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে পাটুলি স্ট্রিট লাইব্রেরির জনপ্রিয়তা অনেক বেড়েছে। বিভিন্ন সংগঠন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, যাতে তাদের এলাকাতেও একই ধরনের লাইব্রেরি তৈরি করা যায়। যদি কোনও সংগঠনের নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবক দল থাকে এবং তারা নিজেদের এলাকায় স্ট্রিট লাইব্রেরি গড়তে চায়, তাহলে আমরা অবশ্যই সাহায্য করব।”

সমাজের প্রান্তিক পরিবারের শিশুদের বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করতে কালিদাস চালু করেছেন মোবাইল লাইব্রেরি পরিষেবাও।

তিনি বলেন, “প্রতি সপ্তাহে আমার এক প্রতিবেশীর গাড়িতে করে গড়িয়ার কাছাকাছি বস্তি এলাকায় যাই। শিশুদের হাতে বই তুলে দিই। তারা বই পড়ে শেষ হলে ফেরত দেয়। এই উদ্যোগে অসাধারণ সাড়া মিলেছে।”

কালিদাসের উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করেছে রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের কাছে চালু হওয়া ‘লাইব্রেরি অন হুইলস’। বইয়ে বোঝাই একটি সাইকেল ঘুরে বেড়ায় এলাকায়, আর মানুষের হাতে পৌঁছে দেয় বই।

পাটুলি স্ট্রিট লাইব্রেরির সদস্যরা শিশুদের স্ক্রিনের বাইরে সৃজনশীলতার জগতে ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত নানা কর্মসূচির আয়োজন করেন। জনপ্রিয় নাট্যদল ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে পথনাটক, পাঠচক্র, যৌথ পড়াশোনার আসর এবং চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার মতো অনুষ্ঠান নিয়মিত হয়, যাতে শিশুদের আগ্রহ অটুট থাকে।

‘জীবদ্দশায় ১০০টি লাইব্রেরি গড়াই আমার স্বপ্ন’- কালিদাস হালদার বলেন, “আমার জীবদ্দশায় এই ১০০টি লাইব্রেরি গড়ে তোলা, একা আমার পক্ষে তা সম্ভব নয়। কিন্তু এই লক্ষ্য আমাকে অর্জন করতেই হবে।”

কালিদাস হালদারের কাছে প্রতিটি নতুন পাঠক মানেই একটি বদলে যাওয়া ভবিষ্যৎ। আর প্রতিটি উল্টানো বইয়ের পাতা যেন সেই পৃথিবীর জন্য এক একটি ছোট্ট জয়, যে পৃথিবী এখনও নতুন করে বই পড়া শিখতে পারে।