রাজা রবি বর্মা-প্রভাবিত লেবেল থেকে পুরনো ট্রামের ছবি— ৬২ বছরের সৌভিক রায়ের সংগ্রহে ধরা পড়েছে ইতিহাসের বহু বিস্মৃত অধ্যায়
১০০ নয়, ১,০০০ নয়, এমনকি ১০,০০০-ও নয়; সোনারপুরের বাসিন্দা সৌভিক রায়ের সংগ্রহে রয়েছে ৩০ হাজারেরও বেশি দেশলাই বাক্স। এর মধ্যে কিছু নমুনার ইতিহাস পৌঁছে দেয় উনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিক পর্যন্ত।

সাধারণ মানুষ ব্যবহারের পর দেশলাই বাক্সকে আবর্জনা হিসেবেই ফেলে দেন। কিন্তু ৬২ বছর বয়সী সৌভিক গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সংগ্রহ করে চলেছেন যেগুলোকে তিনি বলেন “দুর্লভ রত্ন”। পুরনো ছবি, বিজ্ঞাপন এবং নকশায় ভরপুর এই ক্ষুদ্র বাক্সগুলো যেন কলকাতার ইতিহাসের বিচ্ছিন্ন টুকরোগুলোকে আজও বাঁচিয়ে রেখেছে।

এক সময় কর্পোরেট সংস্থায় কর্মরত ছিলেন সৌভিক। অবসরজীবনে তিনি এই স্মৃতিচিহ্নগুলিকে যত্নের সঙ্গে সংরক্ষণ করছেন এবং গড়ে তুলেছেন এক ক্রমবর্ধমান আর্কাইভ।
সংগ্রাহক হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল বহু আগেই, তখন তিনি বুঝতেও পারেননি যে সামনে অপেক্ষা করছে এক বিশাল সংগ্রহজগত।

“সেই সময় আমরা শুধু ডাকটিকিট আর মুদ্রা সংগ্রহের কথাই জানতাম। এর বাইরে যে সংগ্রহের এত বিশাল এক জগৎ রয়েছে, তা আমাদের জানা ছিল না,” স্মৃতিচারণ করেন তিনি।
শৈশবের সেই নীরব আগ্রহ দীর্ঘদিন ধরে টিকে ছিল। ২০০৯ সালের দিকে তিনি পরিচিত হন বৃহত্তর সংগ্রাহক সমাজ এবং বিরল স্মারক সংগ্রহের জগতের সঙ্গে। সেই পরিচয়ই ধীরে ধীরে তাঁকে টেনে আনে দেশলাই বাক্সের বিস্মৃত অথচ আকর্ষণীয় দুনিয়ায়।

সৌভিকের চোখে এগুলি ছিল ক্ষুদ্র ‘টাইম ক্যাপসুল’, যার ভেতরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জমা রয়েছে শিল্প, বাণিজ্য, রাজনীতি এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা গল্প। বর্তমানে তাঁর বাড়ি অতীতের অগণিত স্মারকে ভরে উঠেছে, যা এক হারিয়ে যাওয়া যুগের সাক্ষ্য বহন করছে।
প্রায় ১৫ বছর সময় লেগেছে এই ঐতিহাসিক দেশলাই বাক্সের আর্কাইভ তৈরি করতে। এর অধিকাংশই আজ টিকে আছে কেবল তাদের লেবেলের মাধ্যমে। একের পর এক ফাইল খুলে তিনি গর্বের সঙ্গে দেখান তাঁর বিশাল সংগ্রহ— শুধু স্বচ্ছ প্লাস্টিকের খাপে রাখা পুরনো বাক্স নয়, বরং সুচারুভাবে নথিভুক্ত ইতিহাসের দলিল।

“আজ যেগুলোকে আমরা দেশলাই বাক্স বলি, সেগুলোর প্রকৃত নাম আসলে ‘স্কিলেট’,” বলেন তিনি।
তাঁর আর্কাইভের প্রতিটি দেশলাই বাক্সের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে তার উৎপত্তি, প্রস্তুতকারক এবং নকশার বিবর্তন সংক্রান্ত গবেষণালব্ধ তথ্য।
সৌভিক বলেন, “বাংলার ইতিহাসের একটি সংক্ষিপ্ত পাঠ যদি কেউ নিতে চান, তাহলে ধারাবাহিকভাবে এই দেশলাই বাক্সগুলো দেখলেই অনেকটা ধারণা পাওয়া যাবে।”
তাঁর বক্তব্য, ভারতে দেশলাই বাক্সের আগমন ঘটে ১৮৭০-এর দশকে ইংল্যান্ড থেকে আমদানির মাধ্যমে এবং প্রথম দিকের নমুনাগুলি কাঠ দিয়ে তৈরি হতো।

তিনি জানান, একসময় তিনি প্রায় ৬,০০০ থেকে ৭,০০০ লেবেল-সমৃদ্ধ একটি পুরনো দেশলাই সংগ্রহ কিনেছিলেন।
“ওই সংগ্রহের অবস্থা ছিল ভয়াবহ। ভারতে কেউ সেটি কিনতে চাইছিল না। কিন্তু কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করে আমি সেটি কিনি। তারপর ছয় মাস ধরে সেটি নিয়ে গবেষণা করি। তখনই বুঝতে পারি এই জগৎ আসলে কত বিশাল।”
তাঁর সংগ্রাহক জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মুহূর্ত ছিল সেটিই।
বারবার তিনি জোর দিয়ে বলেন, দেশলাই বাক্স কোনও “ছোটখাটো ফেলে দেওয়ার জিনিস” নয়; বরং এগুলি সমাজ-ইতিহাসের নথি।
“প্রতিটি দেশলাই বাক্সই একটি গল্প বলে। এই ক্ষুদ্র লেবেলগুলির মধ্যে সংরক্ষিত রয়েছে সামাজিক পরিবর্তন ও ইতিহাসের নানা খণ্ডচিত্র। আমার সংগ্রহে রয়েছে জাপান, সুইডেন এবং রাশিয়া থেকে আমদানি হওয়া বহু পুরনো দেশলাই বাক্সের নমুনা,” বলেন তিনি।
তাঁর মতে, বিদেশি প্রস্তুতকারকেরা দক্ষিণ এশিয়ার বাজারের জন্য বিশেষভাবে নকশা পরিবর্তন করতেন। উদাহরণস্বরূপ, জাপানের মতো দেশে হাতি সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ না হলেও ভারতীয় বাজারকে আকৃষ্ট করতে দেশলাই বাক্সে হাতির ছবি ব্যবহার করা হতো।
তিনি আরও জানান, উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে জাপান ও সুইডেন ছিল ভারতে দেশলাই বাক্স রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র। ভারতীয় বাজারে জনপ্রিয়তা অর্জন এবং স্থানীয় প্রতিযোগিতাকে টেক্কা দিতে জাপানি প্রস্তুতকারকেরা দেশলাই বাক্সে ভারতীয় মুখাবয়ব, দেবদেবী এবং সাংস্কৃতিক প্রতীক ছাপাতেন।

সৌভিকের সংগ্রহে রয়েছে প্রাথমিক যুগের কাঠের ড্রয়ার-ধাঁচের দেশলাই বাক্স, কাগজের দেশলাই, ম্যাচবুক, প্রচারমূলক ও ক্যাসিনো-সংক্রান্ত দেশলাই, বিলাসবহুল অলঙ্করণধর্মী নকশা, আমদানি করা নমুনা এবং পুরনো আবগারি শুল্কের স্ট্যাম্পযুক্ত দেশলাই বাক্স।
অধিকাংশ ঐতিহাসিক নথিতে দাবি করা হয় যে কলকাতায় কখনও দেশলাই বাক্স উৎপাদন হতো না। কিন্তু দীর্ঘ গবেষণার মাধ্যমে সৌভিক জানতে পেরেছেন, ১৮৯২ এবং ১৮৯৩ সালের দিকে এখানে অন্তত দুটি দেশলাই প্রস্তুতকারী সংস্থা ছিল।
“সেই সংস্থাগুলির সঙ্গে সম্পর্কিত লেবেল এবং নথি আমার কাছে রয়েছে। আমি তা প্রমাণ করতে পারি।”
তাঁর গবেষণা অনুযায়ী, একসময় কলকাতায় প্রায় ১৩৬টি দেশলাই কারখানা ছিল, যদিও সময়ের সঙ্গে অধিকাংশই হারিয়ে যায়।
“একটি কারখানা নাকি ১৯৬০-এর দশকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় ধ্বংস হয়ে যায়। একসময় সেখানে প্রায় ৪০০ জন শ্রমিক কাজ করতেন। আজও সেইসব কারখানার কিছু বিজ্ঞাপন খুঁজে পাওয়া যায়,” বলেন তিনি।
সৌভিকের মতে, শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ এই শিল্প হারায় তামিলনাড়ুর শিবকাশীর কাছে।
“সেখানে শ্রম অনেক সস্তা ছিল, মুদ্রণ পরিকাঠামো দ্রুত উন্নত হয়েছিল এবং বিতরণ ব্যবস্থা ছিল অনেক বেশি শক্তিশালী। বাংলার সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু শক্তিশালী বিপণন ও বিতরণ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারেনি।”
তিনি আরও বলেন, “শোনা যায়, ১৯২০-এর দশকে শিবকাশীর উদ্যোক্তারা এই ব্যবসার কৌশল শিখতে কলকাতায় এসেছিলেন। পরে নিজেদের এলাকায় কারখানা, মুদ্রণ ইউনিট এবং বিতরণ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। অত্যন্ত কম শ্রমব্যয় এবং ব্যবসাকেন্দ্রিক শক্তিশালী বিতরণ ব্যবস্থার ফলে ধীরে ধীরে শিবকাশী বাজার দখল করে নেয়। এর ফলেই বাংলার একসময়কার সমৃদ্ধ দেশলাই শিল্পের পতন ঘটে।”
সৌভিকের মতে, পুরনো দেশলাই বাক্সের ছবিগুলি সময়ের সঙ্গে ক্ষুদ্র ক্যানভাসে পরিণত হয়েছিল, যেখানে প্রতিফলিত হয়েছে ভারতের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং শিল্প-সংস্কৃতির বিবর্তন।
রাজা রবি বর্মার চিত্রকর্মের অনুকরণ থেকে শুরু করে জাতীয়তাবাদী প্রতীক, অশোক চক্র, ‘বন্দে মাতরম’ স্লোগান, কলকাতার ট্রাম, ঐতিহাসিক স্থাপত্য কিংবা গুরুত্বপূর্ণ স্থান— সবই জায়গা করে নিয়েছিল দেশলাই বাক্সের ক্ষুদ্র পরিসরে।
তবে সংখ্যার প্রতি তাঁর কোনও মোহ নেই।
“আমার কাছে ৩০ হাজার দেশলাই বাক্স আছে না ১ লক্ষ আছে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হল সংগ্রহের মান এবং সঠিক সংরক্ষণ। সরকারি সহায়তায় যদি এগুলিকে যথাযথভাবে আর্কাইভ করা যায়, তাহলে আমরা একটি সম্পূর্ণ সামাজিক ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করতে পারব।”


