মৈত্রী মজুমদার:
“জাঙ্ক স্টেশন শুরু হয়েছিল ২০১৭ সালে, আমার জীবনের এক সন্ধিক্ষণে—যখন আমি কর্পোরেট জগৎ থেকে সরে এসে এমন কিছুর সন্ধানে ছিলাম যা আমি গভীরভাবে মিস করছিলাম: সৃজনশীলতা।
কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ বা পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই, আমার কাছে যা কিছু ছিল তা দিয়েই আমি শুরু করেছিলাম—”জাঙ্ক” কে “জুয়েলারি” তে রূপান্তরিত করার কাজ। যা একটি সাধারণ পরীক্ষা হিসেবে শুরু হয়েছিল, তা অচিরেই আমার ব্র্যান্ডের প্রাণ হয়ে ওঠে।”, বলছিলেন দেবমিতা ঘোষ।

দক্ষিণ কলকাতায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা দেবমিতার। শৈশব ছিল আশির দশকের বাচ্চাদের মতোই। পরিবারের মা মাসিদের মাঝে, পড়াশোনা, খেলাধূলার দৈনন্দিনতায় মোড়া। ভালবাসতেন আঁকাআঁকি আর সাজগোজ। কিছুটা বড় হওয়ার পর চোখ টেনেছিল সাজ- পোষাকের জগৎ। ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল ম্যাগাজিনের আকর্ষণে ঘন ঘন পৌঁছে যেতেন মাসির বাড়িতে। সেই থেকেই পরিচয় “বুটিক”, “ডিজাইনার”-এসব শব্দের সাথে। মনে জেগেছিল ফ্যাশন ডিজাইনিং শিখে নিজের “বুটিক” খোলার স্বপ্ন। কিন্তু সমসাময়িক মধ্যবিত্ত পরিবারের পকেট আর শহরে ডিজাইন নিয়ে পড়াশোনার পরিস্থিতি একে অন্যের পরিপূরক না হওয়ায় অনার্স সহ কমার্স শাখায় গ্রাজুয়েশন করেন তিনি।
তারপর কিছুদিনের গতানুগতিক জীবন। চাকরি, বিয়ে, সন্তান ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে বাদ সাধে মনের খিদে। আর শুরু হয় তাঁর গয়নার ব্র্যান্ড “জাঙ্ক-স্টেশন”।
প্রথমে বাজার থেকে কাঁচামাল কিনে নিজের হাতে গয়না বানিয়ে শুরু। যা চেনা মহলে সমাদর পায়। পরিচিত, বন্ধুবান্ধব, পুরানো কলিগ এদের মাধ্যমে বিভিন্ন যোগাযোগ আর ফেসবুক পেজ এ ছবি পোস্ট করার মাধ্যমে ২০১৮-১৯ থেকেই ব্যবসার পরিধি বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিভিন্ন এক্সিবিশন এ ভাগ নেওয়া ও লোকাল বুটিক এর মাধ্যমে গয়না বিক্রিও চলছিল ভালই। বাদ সাধল অসুখ। সেই অসুখের মাঝেই বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, বাজার কর্তৃক প্রতারণা এসবের সম্মুখীন হন দেবমিতা। এরপর আসে কোভিড-এর সময়। বিদেশে চাকরীরত স্বামীর জন্য দুশ্চিন্তা, ঘরে ছোট ছেলের দেখাশোনা আর অতিমারির অভিঘাতে বন্ধ রাখতে বাধ্য হন ব্যবসার কাজ।

২০২১ এ পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। শুরু হয় অনলাইন ব্যবসার রমরমা, সেই সময় বাজারে ফিরে বোঝেন যে শুধুমাত্র নিজের হাতে বানানো গয়না দিয়ে বেশীদিন চলবে না। শুরু করেন বিভিন্ন ধরণের গয়নার রি-সেলিং এর কাজ। কিন্তু সেক্ষেত্রে ও বজায় ছিল ইউনিক ডিজাইন এর খোঁজ। যা তাঁর ব্র্যান্ডের পরিচয়। এভাবেই ২০২২ এ তাঁর কালেকশন-এর একটি “হাঁসুলি হার”-এর ডিজাইন প্রায় ভাইরালের পর্যায় পৌঁছে যায়। এই গয়না তাঁকে প্রভূত পরিচিতি এনে দেয়। নেট দুনিয়ায় তাঁর পরিচিতি হয় “হাঁসলি-কুইন” হিসেবে। একলাফে অনেকটাই বৃদ্ধি পায় ব্যবসার পরিসর। এক্সিবিশনের গন্ডিও শহর পেরিয়ে পৌঁছে যায় ব্যাঙ্গালোর, দিল্লির মত শহর গুলোতে।
সেখানে গিয়েই তিনি বোঝেন বাজারে টিকে থাকতে গেলে নিজের সৃজনশীলতাকে আরও বেশী করে এক্সপ্লোর করা দরকার। তখন থেকেই শুরু সেমি প্রেসিয়াস স্টোন আর ফ্রেস-ওয়াটার পার্ল নিয়ে কাজ। সেটা ২০২৩ এর মাঝামাঝি।

দেবমিতা বলেন- “সময়ের সাথে সাথে, অবিরাম অনুসন্ধান এবং পরীক্ষার মাধ্যমে, আমি আবিষ্কার করেছি কিসে আমার সৃষ্টির প্রকৃত পরিচয় নিহিত, তা হল— চিরন্তন সৌন্দর্য।
আমি উপলব্ধি করলাম যে, যদি আমার গয়না চিরন্তন সৌন্দর্যকে প্রতিফলিত করতে পারে, তবে এর চেয়ে বেশি তৃপ্তিদায়ক আর কিছুই হতে পারে না। তাই এমন উপাদান বেছে নিয়েছি যা সৌন্দর্য এবং গভীরতা উভয়কেই ধারণ করে। আমি এগুলো সম্পর্কে রিসার্চ করে চলেছি, কারণ আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে জ্ঞান ছাড়া কেউ নিজের সেরাটা দিতে পারে না। প্রতিটি গয়না আমার নিজস্ব চিন্তাভাবনা আর যত্নের পরিচয়।”
তিনি আরও যোগ করেন :
“জাঙ্ক স্টেশনে আমি পরিমাণের চেয়ে গুণমানকে বেশী মর্যাদা দিয়ে থাকি আর ধীরলয়ের যাপন শৈলীকে মাথায় রেখে এমন গয়না তৈরি করি যা শুধু শোভা বাড়ায় না—বরং নিজস্ব একটা প্রকাশভঙ্গী গড়ে তোলে।”

বাজার সম্বন্ধে সম্যক ধারণা আর সমসাময়িক চাহিদা থেকে চটজলদি শিখে নেওয়ার প্রতিভা, এই দুই এর মেলবন্ধন এর ফল দেবমিতার ব্যবসায়িক সাফল্য।
দু-হাজার টাকার কাঁচামাল থেকে শুরু হওয়া ব্যবসা এখন সেল্ফ-সাস্টেনিং-ই শুধু নয়, পাশাপাশি বছরে লক্ষাধিক টাকার বিজ্ঞাপন খরচও বহনে সক্ষম। প্রতিনিয়ত নিজের কাজের প্রতি নিষ্ঠা দিয়েই একার প্রচেষ্টায় দেবমিতা নিজের হোম গ্রোণ ব্র্যান্ডেকে মাত্র নয় বছরে এতটা উচ্চতা দিতে পেরেছেন ।
তিনি পাশাপাশি শুরু করেছেন জামদানি শাড়ি নিয়ে কাজ। অদূর ভবিষ্যতে ওয়েবসাইট ও লঞ্চ হতে চলেছে তাঁর। স্বপ্ন দেখেন নিজস্ব একটি স্টুডিও গড়ে তোলার ও। এর পাশাপাশি বছরভরের এক্সিবিশন ক্যালেন্ডার ও ভর্তি “জাঙ্ক ষ্টেশন”-এর।

এই যাত্রায় তাঁর মূলমন্ত্র মাটির কাছাকাছি থাকা। তাই এখনও নিজের হাতেই সামলান ব্যবসার প্রতিটি খুঁটিনাটি। তাঁর কথায়:
“জাঙ্ক স্টেশন শুধু একটি ব্র্যান্ড নয়, এটি আমার কাছে সবকিছু।
প্রতিটি পণ্যের পেছনের ডিজাইনার আমি,
প্রতিটি পোস্টের পেছনের কন্টেন্ট ক্রিয়েটর আমি,
প্রতিটি শুটের পেছনের মডেল আমি,
আমিই সে, যে মধ্যরাত পর্যন্ত আপনাদের অর্ডারগুলো প্যাক করে,
এবং সে, যে একাই শত শত মেসেজ-এর উত্তর দেয়।
প্রতিটি ডিজাইনে আমার হৃদয়ের একটি অংশ জড়িয়ে আছে, প্রতিটি অর্ডারের সাথে আমার নিষ্ঠা জড়িত, এবং প্রতিটি ক্লায়েন্ট এই সুন্দর যাত্রার একটি অংশ ।
একটি ছোট ব্যবসা গড়ে তোলা সহজ নয়, কিন্তু যখন তা জীবনের উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে, তখন প্রতিটি বিনিদ্র রাত সার্থক মনে হয়।
শুধু আমার ব্র্যান্ডকে নয়, আমার স্বপ্নকে সমর্থন করার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ।”


