ভবানীপুরের সরু গলিতে ছোট্ট দোকান, আর সেখানেই নতুন জীবন পায় লাখ টাকার ফাউন্টেন পেন।
মঁ ব্লাঁ থেকে পার্কার—ভাঙা কলমে ফের প্রাণ ফেরান ‘ম্যাজিশিয়ান’ দিলীপ, যাঁর হাতে ভরসা রেখেছেন সত্যজিৎ রায় থেকে জ্যোতি বসুও।
কলকাতার দিলীপ বসাক সাবধানে ডিটারজেন্ট, জল এবং একটি গোপন উপাদানের মিশ্রণ থেকে একটি কলমের নিব তুলে আনেন। টানা আট ঘণ্টারও বেশি সময় ভিজিয়ে রাখার পর সেই নিবটি আবার ফাউন্টেন পেনের গায়ে বসিয়ে তিনি সেটিকে নীল কালির দোয়াতে ডুবিয়ে দেন। তারপরই যেন কাগজে শব্দের স্রোত বয়ে যেতে শুরু করে।
“এখন এটি গরম তাওয়ার ওপর মাখনের মতোই মসৃণ,” স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলেন তিনি। প্রতিবেদককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দিলীপ জানান, এই কলমটির দাম ১ লক্ষ টাকারও বেশি। গত ১৫ দিন ধরে তিনি যে কলমটির ওপর কাজ করছিলেন, সেটি হল প্রিমিয়াম মন্ট ব্ল্যাঙ্ক মাইস্টারস্টুক সলিটেয়ার ক্যালিগ্রাফি গোল্ড লিফ।
কলকাতার ভবানীপুরের দেবেন্দ্র ঘোষ স্ট্রিটের সরু গলির মধ্যে তাঁর ছোট্ট আয়তাকার দোকান—‘ইলেক্ট্রোমেক ভিন্টেজ ফাউন্টেন পেন রিপেয়ার’। ভারতের হাতে গোনা কয়েকটি দোকানের মধ্যে এটি অন্যতম, যেখানে আজও পুরনো ফাউন্টেন পেনে নতুন জীবন ফিরে আসে।
একসময় ফাউন্টেন পেন ছিল অত্যন্ত মূল্যবান ও সম্মানীয় একটি জিনিস। গুরুত্বপূর্ণ আইনি নথি, স্কুলের হোমওয়ার্ক, কবিতা, ব্যক্তিগত গোপন কথা—সবই লেখা হত এই কলমে। আজকের নতুন প্রজন্মের কাছে যা সংগ্রহের বস্তু, একসময় তা ছিল প্রতিদিনের সঙ্গী।
এই দোকানের শুরু করেছিলেন দিলীপের বাবা ভোলানাথ প্রসাদ, ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার ঠিক আগে। পাশের দোকানের মালিক তাঁর চাকরির আবেদন ফিরিয়ে দেওয়ার পরই তিনি নিজের কিছু শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন।
দিলীপ, যিনি এখন পঞ্চাশের কোঠায়, বলেন, “আমার বাবা কখনও স্কুলে পড়াশোনা করেননি। চার সন্তানকে মানুষ করতে তিনি নানা ছোটখাটো কাজ করতেন। বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়ে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তখনই নিজের কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন এবং ভাঙা কলম সারানোর কাজ শুরু করেন। সেই সময় এই ধরনের কলমের ব্যবহার ও চাহিদা ছিল অনেক বেশি।
তিনি কখনও ভাবেননি, যে কলম একদিন সংসার চালিয়েছে, তা একসময় প্লাস্টিকের কলমে বদলে যাবে, আর পরে কম্পিউটার ও ল্যাপটপের যুগে কাগজে লেখার শিল্পই প্রায় অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে।” ভোলানাথ যেখানে সংসারের দায়ে এই কাজ শুরু করেছিলেন, সেখানে দিলীপ এই পেশায় আসেন কলমের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে।
অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তাঁর পড়াশোনা মাঝপথে থেমে যায়। স্কুল ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। কয়েক সপ্তাহ বাবার পাশে থেকে কলম মেরামতের প্রতিটি খুঁটিনাটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। পরে যখন বাবা কোনওভাবে তাঁর স্কুলের ফি জোগাড় করতে সক্ষম হন, তখন দিলীপ পড়াশোনায় ফিরে না গিয়ে মাত্র ১৩ বছর বয়সে কলমের গঠন ও মেরামতির জগতে নিজেকে পুরোপুরি ডুবিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
কলেজ পাস করা চাকরিজীবীর মতো আয়ের সুযোগ না থাকা একটি কাজের জন্য স্কুল ছাড়ার সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না। বিশেষ করে যখন ভোলানাথ দিনরাত পরিশ্রম করছিলেন সন্তানের ভালো ভবিষ্যতের জন্য। দিলীপ বলেন, “স্কুল ছাড়ার পর কাজের প্রথম দিনে বাবার কথা আজও স্পষ্ট মনে আছে।
তিনি বলেছিলেন, তিনি শুধু আমাকে রেললাইনের কাছে এনে দাঁড় করাতে পারেন, কিন্তু ট্রেনটাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্পূর্ণ আমার দায়িত্ব। তিনি বলেছিলেন, যদি ভালোভাবে বাঁচতে চাই, তাহলে আমাকে শহরের সেরা রিপেয়ারমিস্ত্রি হতে হবে। আর প্রতিটি কলমকে সম্মানের সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে, কারণ সেই কলম একদিন ইতিহাসও লিখতে পারে।”
দিলীপ প্রথম যে কলমটি সারিয়েছিলেন, সেটি ছিল একটি পার্কার। দাম ছিল প্রায় ৪ টাকা, আর তিনি মেরামতির জন্য নিয়েছিলেন ১ টাকা যা দামের এক চতুর্থাংশ। এরপর তিনি কাজ করেছেন পাইলট, ওয়াটারম্যান, সুইস মিলিটারি-সহ বহু নামী ব্র্যান্ডের কলম নিয়ে। তিনি জানান, নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত ফাউন্টেন পেন মেরামত খুব কঠিন ছিল না। “তখন ফাউন্টেন পেন তৈরির কারখানা অনেক ছিল। ফলে হারিয়ে যাওয়া বা ভেঙে যাওয়া অংশ সহজেই পাওয়া যেত। আমাদের দোকানও সবসময় ভিড়ে ঠাসা থাকত। শহরের নামি-দামি মানুষের কলমে ভর্তি থাকত দোকান।
আমি সত্যজিৎ রায়, জ্যোতি বসু, হাইকোর্টের বিচারপতি, এমনকি রাজভবনের কিছু সদস্যের কলমও সারিয়েছি। তাঁদের কর্মীরাই বেশিরভাগ সময় কলম নিয়ে আসতেন, তবে কখনও কখনও তাঁরা নিজেরাও দোকানে আসতেন। আমার সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি হল প্রাক্তন লোকসভা স্পিকার সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে চা খেতে খেতে রাজনীতি নিয়ে আলোচনা।”
দিলীপ বলেন, কোনও গ্রাহকের কলম যখন আবার ঠিকভাবে লিখতে শুরু করে—তখন সেই মুখে আনন্দের হাসি দেখা- সেটাই তাঁর সবচেয়ে বড় তৃপ্তি। গত কয়েক বছরে তিনি লক্ষ্য করেছেন, ফাউন্টেন পেন সংরক্ষণ ও সংগ্রহের প্রবণতা অনেক বেড়েছে। তাঁর মতে, প্রতিটি কলমেরই নিজস্ব একটি গল্প আছে।
তিনি বলেন, “অনেকেই তাঁদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে কলম উত্তরাধিকারসূত্রে পান। তাই তার সঙ্গে গভীর আবেগ জড়িয়ে থাকে। তাঁদের একটাই আশা—কলমটি যেন আবার অসুবিধা ছাড়া মসৃণভাবে চলে। কেউ কেউ নিলাম বা অনলাইনে অনেক দাম দিয়ে কেনেন। আবার কেউ শুধু লেখার নস্টালজিয়া ফিরিয়ে আনতে চান। তাই আমার পুরনো লেদ মেশিন ব্যবহার করার সময় আমি অত্যন্ত সতর্ক থাকি। যেন আমার জীবনটাই এর ওপর নির্ভর করছে।”
‘তিনি সত্যিই একজন জাদুকর’
দিলীপের এক গ্রাহক মধুমিতা চৌধুরী বলেন, “আমার মাতামহ কয়েক বছর আগে জন্মদিনে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ফাউন্টেন পেনটি আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। কিন্তু সেটি হঠাৎ কাজ করা বন্ধ করে দেয়। ফেসবুকের মাধ্যমে দিলীপবাবুর কাজ সম্পর্কে জানতে পারি। কোনও আশা ছাড়াই কলমটি তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলাম। কয়েকদিন পর সেটি একেবারে ঠিক হয়ে ফিরে আসে। তিনি সত্যিই একজন জাদুকরের মতো কাজ করেছেন।”
চার দশকের দীর্ঘ কর্মজীবনে ঠিক কতগুলি কলম তিনি সারিয়েছেন, তার হিসাব দিলীপের নিজের কাছেও নেই। তবে গড়ে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচটি কলম তিনি মেরামত করেন। সংগ্রাহক, কলমপ্রেমী এবং পুরনো দিনের লেখকদের মহলে তিনি অত্যন্ত পরিচিত নাম হলেও, তাঁর আয় বড় বড় সংস্থায় চাকরি করা সহপাঠীদের মতো নয়। তবু তিনি সন্তুষ্ট। কারণ এই আয়েই সংসার চলে, আর তাঁর মেয়ের পড়াশোনার খরচও উঠে আসে। তাঁর মেয়ে বর্তমানে কেমিস্ট্রিতে অনার্স পড়ছেন।
মৈত্রী মজুমদার


