যেকোনো পারফিউম বা আতরের মধ্যে কি যেন এক অদ্ভুত জাদু লুকিয়ে থাকে। একফোঁটা সুগন্ধই মুহূর্তে মন ভালো করে দিতে পারে, জাগিয়ে তুলতে পারে পুরনো স্মৃতি কিংবা ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে ভুলে যাওয়া কোনো সময়ে।
বড়বাজারের সরু গলির মধ্যে সেই অনুভূতিই আজও ভেসে বেড়ায় দুই শতাধিক বছরের পুরনো, কলকাতার প্রাচীনতম আতরের দোকান হাজি খুদা বক্স নবী বক্স-এ।
এখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শুধু সুগন্ধ নয়, বোতলবন্দি হয়েছে স্মৃতিও।
সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে অনেক ঐতিহাসিক আর আইকনিক ব্যক্তিত্ব যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে সত্যজিৎ রায় পর্যন্ত — অসংখ্য মানুষ এই দোকানে এসেছেন, আর সঙ্গে করে নিয়ে গেছেন এমন সব সুগন্ধ, যা এখনও তাঁদের সময় ও ব্যক্তিত্বের প্রতিধ্বনি বহন করে।
বর্তমানে পারিবারিক এই ব্যবসার অষ্টম প্রজন্মের কর্ণধার নেয়াজুদ্দিন আল্লাহ বক্স, তাঁর ভাইপো মুশাউদ্দিন আল্লাহ বক্সের সঙ্গে মিলে দোকানটি চালান। তিনি এই ব্যবসার শিকড় খুঁজে পান ১৮০০-এর দশকের শুরুতে এবং জানান কলকাতায় আসার ইতিহাস।
“আমরা ১৮০০ সালে আমার প্রপিতামহ হাজি শেখ জান মোহাম্মদ সাহেবের সঙ্গে কলকাতায় আসি। হাজি খুদা বক্স এবং হাজি নবি বক্স ছিলেন তাঁর পুত্র। আমাদের মূল বাড়ি ছিল লখনউতে, কিন্তু সেখানে ব্রিটিশদের সঙ্গে লাগাতার যুদ্ধ, বিদ্রোহ এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের কারণে ব্যবসা কঠিন হয়ে উঠেছিল। তাই আমরা তখনকার ভারতের রাজধানী কলকাতায় চলে আসি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান বন্দর হওয়ায় কলকাতা ছিল স্বাভাবিক পছন্দ,” তিনি জানান।
প্রথমে লেবুতলার বৈঠকখানা রোডে দোকানটি ছিল, পরে তা বড়বাজারে স্থানান্তরিত হয়—এবং গত ২০০ বছর ধরে এখানেই রয়েছে।
সেই সময় কলকাতার জমিদার ও বাবু সমাজের মধ্যে বিলাসিতার প্রতি আকর্ষণ ছিল প্রবল, আর আতরের প্রতি ছিল বিশেষ অনুরাগ। এই সাংস্কৃতিক পরিবেশেই কলকাতায় সুগন্ধ ব্যবসায়ী হিসেবে এই পরিবারের যাত্রা শুরু হয় এবং গড়ে ওঠে তাদের ঐতিহ্য।
‘আতর’ শব্দটি এসেছে ফারসি শব্দ ‘ইত্তর’ থেকে, যার অর্থ সুগন্ধি। ফুল, ভেষজ, মসলা বা অন্যান্য প্রাকৃতিক উৎস থেকে সংগৃহীত একধরনের এসেনশিয়াল অয়েলই হল আতর।
চেহারায় খুব জাঁকজমকপূর্ণ না হলেও, এই দোকানে একসময় নিয়মিত আসতেন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা—যেমন সুভাষ চন্দ্র বোস, লিয়াকৎ আলি খান, কাজি নজরুল ইসলাম, শেখ মুজিবর রহমান, মতিলাল নেহেরু এবং আবুল কালাম আজাদ প্রমুখেরা।
এই সব ব্যক্তিত্বদের প্রিয় সুগন্ধ সম্পর্কে জানতে চাইলে নেয়াজুদ্দিন বলেন, “আমি সত্যজিৎ রায়-কে খুবই ছোটবেলায় দেখেছি, তাই বেশি কিছু মনে নেই। তবে শুনেছি সুভাষচন্দ্র বোস পছন্দ করতেন গোলাপ, রজনীগন্ধা এবং শামামার গন্ধ, আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পছন্দ করতেন রূহ খাস।”
গত এক দশকে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আতরের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে বলেও জানান তিনি। ঐতিহ্যবাহী সুগন্ধ এখনও জনপ্রিয়, আর এর অন্যতম কারণ এর সাশ্রয়ী মূল্য—১২ মিলিলিটার বোতল মাত্র ১০০ টাকা থেকে শুরু।
“আমি কোনো পারফিউমকে ৬-৭ ঘণ্টার বেশি স্থায়ী হতে দেখিনি, কিন্তু আতর ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এই কারণেই তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও এর জনপ্রিয়তা রয়েছে। তরুণদের মধ্যে মাস্ক, শাবা এবং হাইয়াতির সুগন্ধ বেশ জনপ্রিয়,” তিনি বলেন।
যদিও আতরই এই ব্যবসার মূল ভিত্তি, তবুও নতুনত্বের সন্ধান চলছে। পরিবারটি এখন প্রাকৃতিক আতরের প্রেরণায় তৈরি পারফিউম নিয়ে কাজ করছেন, যা সাধারণ সুগন্ধির তুলনায় বেশি সময় ধরে থাকে—এটি দোকানের বিবর্তিত পরিচয়ের নতুন সংযোজন।
নেয়াজুদ্দিন জানান, তাঁর তিন মেয়েই তাঁর কাছ থেকে এই কাজ শিখেছে। তাঁর বড় মেয়ে নুসরাত জাহান ইতিমধ্যেই পারিবারিক ব্র্যান্ডের অধীনে ‘বক্স পারফিউমস’ চালু করেছে।শরীরের জন্য মৃদু/নরম এবং কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া না থাকায় এই আতরগুলির চাহিদা দেশজুড়ে। কলকাতা এবং উত্তরপ্রদেশের কানৌজে নিজেদের ওয়ার্কশপ ও কারখানা থেকে সারা ভারতে আতর সরবরাহ করে এই প্রতিষ্ঠান।
ব্যস্ত রাস্তার কোলাহল আর ভিড়ের মাঝেও হাজি খুদা বক্স নবি বক্স-এ ইতিহাস শুধু সংরক্ষিত নয়—এখানের বাতাসে আজও মিশে থাকে সেই ইতিহাসের সুবাস ।


