দক্ষিণ কলকাতার ব্যস্ত গড়িয়াহাটের কোলাহলের মাঝেই কবিতায় খুঁজে পান শান্তি এক মধ্য-পঞ্চাশের হকার। তিনি গল্পকার, লেখক—এবং এমন এক মানুষ, যিনি প্রথম প্রেম সাহিত্যের পার্থিব স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করতেও প্রস্তুত।
“হয়তো আমি আরামদায়ক জীবনকে দূরে সরিয়ে দিয়েছি। কিন্তু যতদিন বই আর কবিতা আমার পাশে আছে, ততদিন আমি এগিয়ে যেতে পারব বলেই মনে করি,” বললেন ৫৪ বছরের মোহন দাস।
গত ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে গোলপার্ক ও গড়িয়াহাট মার্কেটের ব্যস্ত সংযোগস্থলে ফুটপাতের একটি স্টল থেকে পুরানো বই বিক্রি করে আসছেন মোহন। তাঁর ছোট্ট অস্থায়ী দোকানেই হাতের নাগালে সাজানো থাকে কবিতার খাতা-ডায়েরি।
ক্রেতাদের সামলানো বা নিজে বইয়ের পাতা ওল্টানো ছাড়া বাকি সময়ে তাঁকে প্রায়শই দেখা যায় কলম হাতে চিন্তায় ডুবে থাকতে। যদি কখনও তাঁর দোকানে যান, মোহন দাসের সঙ্গে কথা বলতে ভুলবেন না। তিনি আনন্দের সঙ্গেই শোনাবেন তাঁর কবিতা, বলবেন বাংলা সাহিত্য, সমাজ ও জীবন নিয়ে নানা কথা।
১৯৯৬ সালের অপারেশন সানশাইন-এর উচ্ছেদের হুমকি থেকে শুরু করে এই শহরে নিজের ছোট্ট জায়গা করে নেওয়া—অদম্য মানসিক শক্তি ও জ্ঞানপিপাসাকে ভরসা করে ইটের পর ইট গেঁথে নিজের জীবন গড়ে তুলেছেন মোহনবাবু।
“আমি ৩১ বছর বয়সে কবিতা লেখা শুরু করি। সারাজীবন সংগ্রামই ছিল আমার সঙ্গী। ছোটবেলাতেও কষ্ট দেখেছি। বাবা ছিলেন ময়রা, সেই মিষ্টি প্রস্তুতকারক বাবার সামান্য আয়ে আমাদের সংসার চলত অত্যন্ত কষ্টে।”
মাত্র ১২ বছর বয়স থেকে বাবাকে সাহায্য করতে ঠোঙা বিক্রি শুরু করেন তিনি। পরে প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে কমার্সে স্নাতক পড়ার সময় একটি পাবলিক ক্যান্টিনে সার্ভিস বয় হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি।
“তখন আমাদের সাপ্তাহিক ন্যূনতম রেশন জোগাড় করাও সম্ভব হত না। পরে আশির দশকের শেষের দিকে এই ফুটপাতেই পুরনো বইয়ের দোকান খোলার সিদ্ধান্ত নিই,” বললেন তিনি। কবিতার সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয় ছিল নিছকই আকস্মিক।
“এই দোকানের বই পড়েই আমি অনেক কিছু শিখেছি। রবীন্দ্রনাথের চেয়ে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে বেশি পছন্দ করি। ইংরেজি বইও পড়েছি—যেমন The Tale of Two Cities এবং War & Peace,” বললেন তিনি। “আমি প্রথম কবিতা লিখি ২০০৫ সালে। তখন মূলত নিজের জীবন আর আশপাশের মানুষদের নিয়েই লিখতাম।
আমার স্ত্রী চম্পা দাস সবসময় আমার শক্তির উৎস ছিলেন। উনিই আরও কবিতা লিখতে উৎসাহ দিতেন। আমার ছদ্মনাম ‘মানীমোহন দাস’, যা তাঁকেই উৎসর্গ করা,” উল্লেখ করেন দাস। ২০০৯ সালে একটি স্থানীয় পত্রিকায় তাঁর কবিতা প্রথমবার প্রকাশিত হয়—যা তাঁর লেখার সংকল্পকে আরও দৃঢ় করে।

তারপর থেকে যা কিছু তাঁর কৌতূহল জাগায়, সবই জায়গা পায় তাঁর জীর্ণ ডায়েরির পাতায়। আধ্যাত্মিক ভাবনা থেকে শিশুদের উপযোগী উপকথা—তাঁর কলমের প্রবাহ থামে না কখনও। এমন একটি দিনও নাকি তাঁর মনে পড়ে না, যেদিন তিনি কবিতা লেখেননি। তবে খ্যাতির প্রতি কখনও আগ্রহ ছিল না তাঁর। “আমি কখনও কাউকে বলিনি যে আমি কবিতা লিখি। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে মানুষ আমার এই শখের কথা জানতে পেরেছে।”
বহু বছর কবিতা লেখার পর এখন গান লেখাতেও আগ্রহী হয়েছেন দাস। “আমার কয়েকজন বন্ধু আছে, যারা আমার লেখা গানে সুর দেয়।” রাজনীতি নিয়ে কখনও লিখেছেন কি না, জানতে চাইলে দাস বললেন, “সাধারণত ওই বিষয়টা এড়িয়ে চলি। তবে ২০০৭ সালের নন্দীগ্রামের জমি অধিগ্রহণ বিতর্ক নিয়ে না লিখে পারিনি। কবিতার নাম দিয়েছিলাম—‘নন্দীগ্রাম ভালো আছো?’”
বর্তমানে রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়-এ স্নাতকোত্তর পাঠরত তাঁর মেয়ে পৌলমী দাস বাবার অন্যতম বড় অনুপ্রেরণা। “আমার কবিতার প্ল্যাকার্ড দিয়ে এই দোকান সাজিয়েছে আমার মেয়ে। ওর হাতের লেখা ভালো, তাই ও-ই প্ল্যাকার্ডগুলো ডিজাইন করে,” হাসতে হাসতে বললেন দাস। তবে বই-এর ব্যবসা এখন মন্দার মুখে। ডিজিটাল যুগে পুরনো বই কিনতে অনীহা বাড়ছে মানুষের মধ্যে, আক্ষেপ তাঁর। “যে-ই আমার দোকানে আসে, তাকে বলি—পিডিএফ নয়, কাগজের বই পড়ুন। ডিজিটালের ফাঁদে আটকে পড়া উচিত নয়।”


