হিমালয়ের ‘উদ্দাম উচ্চতা’ কীভাবে বাঙালির মনে নেশা ধরায়, তারই জীবন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছে কলকাতার এক পরিবার। পয়লা বৈশাখের(১৪ এপ্রিল) ঠিক একদিন আগে, কলকাতার সন্তোষপুরের দুই ভাইবোন — ৭ বছরের দেবাংশী চক্রবর্তী এবং তার ১৪ বছরের দাদা দীপায়ন চক্রবর্তী — নেপালের অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্পে(সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৩,৫০০ ফুট উচ্চতায়) ট্রেক করে পৌঁছায়। এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল, পাহাড়ের টান বাঙালিকে কীভাবে পাগল করে তোলে।
বাবা-মায়ের সঙ্গে এই অভিযানে তারা কোনো পোর্টার ছাড়াই হাঁটেন। বাবা সুদীপ চক্রবর্তী, পেশায় ফাইন্যান্স সেক্টরের কর্মী, অফিস থেকে দু’সপ্তাহের ছুটি নেন। মা সানন্দা দেবী ছেলেমেয়েদের স্কুল সাউথ পয়েন্ট থেকে বিশেষ অনুমতি নেন।
গোরখপুর হয়ে সীমান্ত পার করে চার সদস্যের এই পরিবার পৌঁছায় নেপালের পোখরায়। খারাপ আবহাওয়া এবং অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্পে তুষারপাতের খবর পেয়ে প্রথমে তারা আশঙ্কা করেছিলেন, হয়তো গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। তাই প্রথমে তারা তাদাপানি-ঘোরেপানি ট্রেক বেছে নেন, যাতে বোঝা যায় শিশুরা এই কঠিন যাত্রা সহ্য করতে পারবে কি না। পরবর্তীতে চামলাং, ঝিনু ডান্ডা এবং দোবান হয়ে কয়েকদিনের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে তারা পৌঁছে যায় মাউন্ট অন্নপূর্ণার বেস ক্যাম্পে।
“পুরো যাত্রাটাই ছিল একেবারে জাদুর মত, চারপাশের দৃশ্য ছিল অপার্থিব। আমাদের বাচ্চারা অন্য ট্রেকারদের কাছ থেকেও অনেক প্রশংসা পেয়েছে, আর তাদের অফুরাণ প্রাণশক্তি আমাদের পুরো দলকে অনুপ্রাণিত করেছে,” বলেন সুদীপ চক্রবর্তী।
১৯৫৩ সালের ২৯ মে, তেনজিং নোরগে এবং এডমন্ড হিলারি যখন মাউন্ট এভারেস্টের শীর্ষে পা রাখেন, তখন থেকেই বাংলায় তার একটি সুস্পষ্ট প্রভাব পড়ে। নোরগের বাড়ি ছিল দার্জিলিং জেলায়। ১৯২০-এর দশক থেকেই, ভ্রমণকাহিনির প্রভাবে এবং ব্রিটিশদের গরম থেকে বাঁচতে পাহাড়ে পালিয়ে যাওয়ার ঐতিহ্যের সাক্ষী হতে হতে, বাঙালি মধ্যবিত্তের কাছেও পাহাড়ভ্রমণ ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আর এখন এর জনপ্রিয়তা এমনই যে শুধুমাত্র ২০২৪ সালেই বাংলায় অন্তত ১১১টি মাউন্টেনিয়ারিং ক্লাব নিবন্ধিত হয়েছে।
“পুরো সংস্কৃতিটাই ইউরোপ থেকে এসেছে,” বলেন ট্রেকিং বুদ্ধার প্রতিষ্ঠাতা জ্যোতিষ্ক বিশ্বাস। “ওরা সারা বছর সঞ্চয় করত এবং ট্রেকিং অভিযানে যেত। আমরাও সেই পথ অনুসরণ করেছি।” মাঙ্কি ক্যাপ ও মাফলার পরে—যা মাইনাস তাপমাত্রায় প্রায় অকার্যকর—বাঙালিদের সেইসময় থেকে এখনও হিমালয়ের সর্বত্র দেখা যায়।
তবে জ্যোতিষ্ক বিশ্বাস সতর্ক করে বলেন, “সমস্যা শুরু হয় যখন মানুষ পাহাড়েও সাধারণ পর্যটকের মতো সুযোগ সুবিধার আশা করে। যখন নেপালের তথা অন্যান্য পাহাড়ী মানুষ উচ্চস্বরে, দাবি-দাওয়া করা লোকদের বাঙালি বা ভারতীয় হিসেবে চিহ্নিত করে। সেটা আমাদের জন্য গর্বের বিষয় নয়।”
তবে সন্তোষপুরের এই পরিবারের ক্ষেত্রে এমন কোনো সমস্যা দেখা যায়নি। চক্রবর্তীদের এই অভিযান দেখিয়ে দেয়, ট্রেকিং এখন বাঙালি পরিবারের এক সাধারণ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। “ওষুধ থেকে অক্সিজেন ক্যান—সব রকম সতর্কতা নিয়েছিলাম। কিন্তু সেগুলোর প্রয়োজন পড়েনি। আমাদের বাচ্চারা পুরো ট্রেক জুড়ে অসাধারণ ধৈর্য ও সাহস দেখিয়েছে,” বলেন সুদীপ চক্রবর্তী।
২০১৬ সালে মাউন্ট এভারেস্ট জয় করা দেবরাজ দত্ত বলেন, “শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই ভালো আরোহী। তাদের ফুসফুস বেশি সুস্থ থাকে। তাই বড়দের তুলনায় তাদের পক্ষে চড়াই ওঠা সহজ হয়।” তবে সঠিকভাবে উচ্চতায় মানিয়ে নেওয়ার(অ্যাক্লাইমাটাইজেশন) অভাব থাকলে শিশুদের সমস্যায় পড়তে হয়। সম্প্রতি সিকিমের গুরুডংমার লেকের কাছে(প্রায় ১৭,৮০০ ফুট) সদ্য এক ৯ বছরের মেয়ের অসুস্থ হয়ে পড়া এবং এক ভারতীয় সেনার দ্বারা তার বাবার তিরস্কৃত হওয়ার ঘটনা সমক্ষে এসেছিল।
দেবরাজ দত্তও অ্যাক্লাইমাটাইজেশনের গুরুত্বের ওপর জোর দেন। “প্রতিটি বেস ক্যাম্পে নির্দিষ্ট সময় থাকা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম জোগাড় করা এবং প্রতিবারই কিছুটা উঠে আবার নেমে আসা—এই প্রক্রিয়াটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এভারেস্ট বা সমকক্ষ পাহাড়গুলোয় একবারে ওঠা যায় না,” তিনি বলেন।
দীপায়ন ও দেবাংশী এই অভিজ্ঞতায় ভীষণ খুশি। পয়লা বৈশাখে দীপায়ন রবীন্দ্রসংগীত ‘আনন্দলোকে’ গানটি পাহাড়ে গেয়েছে। সে জানায়, এই যাত্রা ছিল অসাধারণ, আর ট্রেকের সময় পাহাড়গুলো আরও বিশাল বলে মনে হয়েছে। “অনেক নতুন মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে, আর পুরো ভ্রমণটা আমার দারুণ লেগেছে,” বলে সাত বছরের দেবাংশী। “আমি খুব তাড়াতাড়ি আবার পাহাড়ে যেতে চাই।”- সে জানায়।


