Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

কলকাতার জ্ঞান মঞ্চে প্রথমবার নাটক মঞ্চস্থ করলেন বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দারা

‘আমি আমার জীবন ফিরে পেয়েছি’: শোনা গেল শ্রাবণী দে-র মুখে। সত্তরোর্ধ্ব শ্রাবণী দে-র কাছে, কলকাতার এক বৃদ্ধাশ্রমে বহুদিন বসবাস করতে করতে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ ও নিউরোসিসের সঙ্গে লড়াই করা ছিল একপ্রকার অসম্ভব চ্যালেঞ্জ—বিশেষ করে পরিবারের সমর্থন না থাকায়। কিন্তু সেই গল্পে মোড় আসে, যখন তিনি প্রথমবার একটি নাটকের মহড়ায় যোগ দেন। মঞ্চেই তিনি খুঁজে পান, তাঁর ভাষায়, “নতুন জীবন”।

“মঞ্চে অভিনয় করা এবং তার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া আমাকে এক নতুন জীবনের জানালা খুলে দিয়েছে। এর আগে আমি ভীষণ অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলাম। অনিদ্রা ও আরও নানা সমস্যায় ভুগতাম। কিন্তু এখন আমি শান্তি পেয়েছি, আর পেয়েছি এমন এক দল মানুষকে, যাদের উপর ভরসা করা যায়,” বলেন শ্রাবণী। তিনি এবং তাঁর সহ-অভিনেতারা—যাঁদের সকলেরই বয়স প্রায় ৭০-এর কাছাকাছি—৬ মার্চ কলকাতার জ্ঞান মঞ্চে প্রথমবার থিয়েটার শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
এই অনুষ্ঠানটি ছিল ‘থিয়েট্রিশিয়ান’ এবং ‘ট্রিবেকা কেয়ার’-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত, যেখানে প্রবীণ নাগরিকদের সহায়তা করা হয়। ৬৯ বছর বয়সি গৌরী চৌধুরী, আরেকজন বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা, প্রথমবার ২০২১ সালে ট্রিবেকা কেয়ারের সহায়তা নেন। “সেই বছর আমি আমার স্বামীকে হারিয়ে গভীর শোক ও একাকীত্বে ডুবে গেছিলাম,” তিনি জানান।

“ওদের (থিয়েটার দলের) সঙ্গে আমি আবার আমার অভিব্যক্তি ফিরে পেয়েছি, আমার জীবন ফিরে পেয়েছি। প্রত্যেক বাঙালির মতোই আমি সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে কিছু কিছু পারি । সেটাই আজ আমাকে মঞ্চে উঠতে অনুপ্রেরণা দিয়েছে,” যোগ করেন চৌধুরী। অনুষ্ঠানে পরিবেশিত নাট্যাংশগুলি শুরু হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান দিয়ে, যা ধীরে ধীরে ব্যঙ্গাত্মক রূপ নেয়। তবে নবাগত শিল্পীরা নিজেদের তাল লয় থেকে কখনও লাইনচ্যুত হয়ে যাননি।

৭৫ বছর বয়সি অনিরুদ্ধ চট্টোপাধ্যায় একটি নাট্যাংশে অভিনয় করেন, যেখানে তিনি এক আড্ডার ‘চিরচেনা কাকু’-র চরিত্রে রূপ দেন—যিনি প্রমাণ ছাড়াই বড় বড় গল্প বলেন। তাঁর কমেডি টাইমিং এতটাই নিখুঁত ছিল যে, সেটা একবারের জন্য অভিনয় বলে মনে হয়নি।
অবসরপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার সুবাশিস রায় জানান, থিয়েটার তাঁকে হিসেব-নিকেশ আর নকশার বাইরের এক জগৎ উপহার দিয়েছে—যেখানে আবেগ, স্মৃতি এবং হাস্যরসকে নতুনভাবে অন্বেষণ করা যায়। “আজ আমাকে মঞ্চে উঠতেই হত, কারণ আমার পারিবারিক ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে হবে। আজকের এই মঞ্চে ওঠা নতুন সূচনার মতো নয়, বরং যেন উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া কিছুর কাছে ফিরে আসা,” বলেন তিনি। সুবাশিস রায় প্রয়াত আশাপূর্ণা দেবীর নাতি।

জ্ঞান মঞ্চে যাঁরা অভিনয় করেছেন, তাঁদের অধিকাংশই নিকট আত্মীয়দের হারিয়েছেন। অনেকে আবার একা থাকেন, কারণ তাঁদের সন্তানরা বিদেশে কর্মরত। ট্রিবেকা কেয়ারের সিইও প্রদীপ সেন বলেন, “প্রায় ১০ বছর আগে আমরা ট্রিবেকা শুরু করি। আজ আমরা এমন একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারছি, যেখানে শুধুমাত্র প্রবীণ নাগরিকদের অংশগ্রহণই যথেষ্ট —এটা ভীষণ আনন্দের।”

ডা. কৃষ্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানটি কোথাও অপেশাদার মনে হয়নি। নাটকের নির্দেশক অপ্রতিম চট্টোপাধ্যায় বলেন, “এটি ছিল এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। আমি আগে বিভিন্ন দলের সঙ্গে কাজ করেছি, কিন্তু প্রবীণ নাগরিকদের সঙ্গে এই প্রথম। তাঁরা অত্যন্ত আন্তরিক, ভীষণ মনোযোগী এবং নিজেদের সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিয়ে পারফর্ম করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

৭৫ বছর বয়সি অঞ্জু দত্তের জন্য এটি ছিল প্রায় অর্ধশতাব্দী পর থিয়েটারে ফেরা। “কলেজ জীবনের পর এই প্রথম আমি আবার নাটকে অভিনয় করছি। এরা আমাকে ভীষণ আশা জুগিয়েছেন। প্রথমে আসতে দ্বিধা ছিল, কিন্তু পরিচালক এবং দলের সকলেই আমাকে এতটাই সাহস দিয়েছেন যে আজ আমি এখানে দাঁড়িয়ে। আজ আমার ভীষণ ভালো লাগছে,” বলেন তিনি।

আগামী আর বর্তমান প্রজন্মের কথা তো সমাজে সর্বক্ষণই আলোচিত। প্রদীপের নীচের অন্ধকারে পড়ে থাকেন সমাজের প্রবীণরা, যাঁরা একদিন তাদের সবটুকু জীবনী শক্তি এই সমাজেই নিয়োজিত করেছেন। আর আজ বৃদ্ধ অবস্থায় যাদের জীবন ভরে থাকে একাকীত্বে। এই নতুন উদ্যোগের দ্বারা থিয়েটারের মঞ্চে নতুন করে জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পেলেন সেই প্রবীণ নাগরিকরা। আশা করা যায়, অদূর ভবিষ্যতে এরকম প্রবীণ শিল্পীরা আরো বেশি সংখ্যায় মঞ্চ মাতাবেন।

জয়ন্তী মুখোপাধ্যায়, তাঁর অন্যান্য সহ-অভিনেতাদের মতোই, বিষণ্নতাকে দূরে রাখতে অভিনয়ের উপর নির্ভর করেন। অবসরপ্রাপ্ত এই শিক্ষিকা বলেন, “৭০ বছর বয়সেও আমি অভিনয় ভালোবাসি। যদি অভিনয় না করি, তবে আমি গভীর বিষণ্নতায় ডুবে যাব।”