Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

পয়লা পার্বণ ২০২৬: বাঙালিয়ানার আবহে বাঙালির মহা সাংস্কৃতিক কার্নিভাল

আবারও নিজের সংস্কৃতির রঙে সেজে উঠল কলকাতা। প্রতি বছর পালিত হয় বাংলা নববর্ষে। এবার বালাই ভোট। তাই সময়ের আগে মার্চ মাসেই সল্টলেক করুণাময়ীর বইমেলা গ্রাউন্ডে ফিরল পয়লা পার্বণ ২০২৬। চার দিনব্যাপী এই সাংস্কৃতিক কার্নিভাল সঙ্গীত, শিল্প, খাদ্য ও কমিউনিটির এক প্রাণবন্ত মেলবন্ধনের মাধ্যমে উদযাপন করল বাঙালিয়ানার নির্যাস।
বাংলার চিরন্তন ঐতিহ্যের ভিতের উপর দাঁড়িয়ে, সমসাময়িক সৃজনশীলতার জন্য নিজেকে উন্মুক্ত রেখে, বিগত কিছু বছর যাবৎ পয়লা পার্বণ ধীরে ধীরে শহরের অন্যতম প্রতীক্ষিত সাংস্কৃতিক আসরে পরিণত হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে এই উৎসব একত্র করছে, শিল্পী, উদ্যোক্তা ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের—যাঁরা সঙ্গীত, শিল্প, খাদ্য, ফ্যাশন ও হস্তশিল্পের মাধ্যমে উদযাপন করেন বাঙালি ঐতিহ্যের বহুরঙা রূপ।
এবারের আয়োজনও আগের বছরের উচ্ছ্বাসকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়ে হাজির করেছে নস্ট্যালজিয়া ও নতুন অভিজ্ঞতার সুচিন্তিত সংমিশ্রণ। দর্শকদের জন্য ছিল জনপ্রিয় বাংলা ব্যান্ড ও শিল্পীদের জমজমাট লাইভ পারফরম্যান্স—যার মধ্যে রয়েছে ক্যাকটাস, লক্ষ্মীছাড়া, শিলাজিৎ মজুমদার ও ফসিলস। পাশাপাশি ফিনালে পারফরম্যান্সে মঞ্চ মাতালেন ফকিরা। এই পরিবেশনাগুলি যেমন তুলে ধরল বাংলার সমসাময়িক সঙ্গীতের প্রাণশক্তি, তেমনই ভিন্ন ভিন্ন প্রজন্মের দর্শকের হৃদয়ে সাড়া ফেলতেও সক্ষম হল।
মঞ্চের বাইরে ছিল শিল্পের রঙিন পসরা, যেখানে দেখা মিলল, হাতে তৈরি বাঙলার বস্ত্র, ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প, টেরাকোটা সামগ্রী, ডোকরা শিল্পকর্ম এবং টেকসই দেশীয় ব্র্যান্ডের নানান পণ্য। এই স্টলগুলি দর্শকদের বাংলার সমৃদ্ধ কারুশিল্পের ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করানোর পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোশকতার সুযোগ করে দেয় বারবার।
খাদ্যরসিকদের জন্য ছিল আগের বছরগুলোর মতোই জনপ্রিয় বাংলা গ্যাস্ট্রোনমি প্যাভিলিয়ন। খাঁটি বাঙালি পদ থেকে আন্তর্জাতিক খাদ্য, কলকাতার আইকনিক স্ট্রিট ফুড থেকে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের আঞ্চলিক স্বাদ—সব মিলিয়ে ফুড অ্যারেনা উপহার দিল বৈচিত্র্যময় রসনাতৃপ্তির অভিজ্ঞতা।

পয়লা পার্বণ ২০২৬-এ বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণকে। সৃজনশীল কর্মশালা, প্রতিযোগিতা এবং ইন্টারঅ্যাকটিভ সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর মাধ্যমে তাঁদের সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।
এছাড়াও কার্নিভালে ছিল বসে আঁকো প্রতিযোগিতা, রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশনা, কুকিং কনটেস্ট, র‍্যাপ শোকেস এবং ফ্যাশন শো। উৎসবে গ্ল্যামারের ছোঁয়া যোগ করল ‘ঠাকুমার ঝুলি’-র ট্রেলার লঞ্চ, যেখানে উপস্থিত ছিলেন শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায় এবং ছবির টিম। পাশাপাশি উন্মোচিত হল আসন্ন ছবি ‘সপ্তডিঙার গুপ্তধন’-এর পোস্টার, অভিনেতা আবির চট্টোপাধ্যায়, অর্জুন চক্রবর্তী, ঈশা সাহা এবং পরিচালক ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায়-এর উপস্থিতিতে।

বছরের পর বছর ধরে এই উৎসব শুধুমাত্র একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের গণ্ডি ছাড়িয়ে গিয়েছে। এটি হয়ে উঠেছে এমন এক প্ল্যাটফর্ম, যা কমিউনিটিকে সংযুক্ত করে, স্থানীয় সৃষ্টিশীল মানুষদের সমর্থন জোগায় এবং বাঙালির আত্মপরিচয় ও ঐতিহ্যের প্রতি গভীর গর্বকে উদযাপন করে।
শহরে বসন্তের আবহ নামতেই পয়লা পার্বণ ২০২৬ সকলকে আহ্বান জানিয়েছে চারটি দিনকে স্মরণীয় করে রাখতে—বাংলা নববর্ষের প্রাক্কালে বাঙালির সংস্কৃতি উদযাপনের এই কর্মকাণ্ড নিঃসন্দেহে কলকাতার প্রাণ এবং বাঙালিয়ানার চিরন্তন স্পিরিটকে সাথে নিয়ে নতুন বছরে পা দেওয়ার পথ প্রশস্ত করল।