Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

চোখের আড়ালে চলে যাওয়া সংস্কৃতির ঐতিহ্য: কলকাতার খানদানি ‘পানদান’ জানায় তেহজিব, তত্ত্ব আর প্রথার গল্প

বসন্তের প্রায় শেষ পর্যায়, প্রায়শই সন্ধ্যার কালবৈশাখী জানান দিচ্ছে শহরে গ্রীষ্মের আগমন বার্তা। আর এই উদযাপনের প্রথমপর্বে বাংলা নববর্ষকে আগমন জানাতে শহরের রাস্তায় মানুষের ভিড়। নববর্ষ মানে, নতুন জামা, দেদার খাওয়া-দাওয়া, আড্ডা এবং সংস্কৃতির উদযাপন। সেই এই বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংগ হল পান, যা একসময়ে প্রায় সমস্ত সম্ভ্রান্ত পরিবারের মহিলাদের রোজের সঙ্গী ছিল।
নানা পরিবারের ঘরে একসময় রুপো আর পিতলের বাক্স—পানদান—ছিল ভোজনের পরের এক অবিচ্ছেদ্য আচার। খাওয়ার শেষে পান খাওয়ার সেই আয়োজনে এই বাক্সগুলিই ছিল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

কলকাতার বনেদি পরিবারগুলিতে খাওয়া-দাওয়ার পর রুপো বা পিতলের তৈরি ‘পানদান’ বা ‘পানের ডাবর’ থেকে বের হত টাটকা পানপাতা আর সুগন্ধি জর্দা। অধিকাংশ বাড়িতেই পান সাজানোর দায়িত্ব থাকত গৃহকর্ত্রীর উপর, যিনি নিষ্ঠা ও গর্বের সঙ্গে এই কাজ করতেন। যে ব্যক্তি এই ঐতিহ্যবাহী পানদানির মালিক, তাঁকে পরিবারের মধ্যে বিশেষ সম্মানের চোখে দেখা হত।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পানদানের ব্যবহার কমে এসে এখন অনেকটাই স্মারক হয়ে উঠেছে—যা কাচের আলমারির ভেতরে বন্দি বা তাকের উপর শোভা পাচ্ছে।

তবুও, বহু পরিবার আজও এই উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত পানদান ও পানদানিগুলি আগলে রেখেছে। এগুলি যেন গল্প বলে পুরনো অভিজাত ড্রয়িংরুমের, বিয়ের তত্ত্বের, কড়া শাসনের ঠাকুমাদের, আর সেইসব আচার-অনুষ্ঠানের, যা একসময় দৈনন্দিন জীবনের অংশ ছিল। আজ চলুন এরকম কিছু খানদানি পানদান-এর তত্ত্ব তালাশ চালাই।

নবাবি উত্তরাধিকার

মেটিয়াবুরুজ এর শাহানশাহ মির্জার কাছে থাকা রুপোর পানদানটি তাঁর বংশপরম্পরায় নবাব ওয়াজিদ আলি শাহের পরিবারের সঙ্গে যুক্ত। এই পানদানটি প্রথমে ছিল তাঁর ঠাকুমা শেখজাদি বেগমের, পরে তাঁর বাবা সাহেবজাদা ওয়াসিফ মির্জার কাছে আসে।
“এটি আমাদের পরিবারের একটি উত্তরাধিকার, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এসেছে। এর বয়স নিশ্চয়ই ১০০ বছরেরও বেশি,” বলেন মির্জা, যিনি ওয়াজিদ আলি শাহের প্রপৌত্রেরও প্রপৌত্র। তাঁর ঠাকুমার সময়ে এই পানদান শুধুই শোভা বর্ধনের বস্তু ছিল না। আড্ডা বা সমাবেশে তিনি এটি সঙ্গে রাখতেন এবং অতিথিদের জন্য নিজ হাতে পান সাজাতেন। “পান দেওয়া মানে যেন জল দেওয়া—এটি ছিল সাধারণ সৌজন্য,” স্মরণ করেন মির্জা।

আজ অবশ্য তাঁদের পরিবারে প্রায় কেউই পান খান না। তবে, “এটিকে সংরক্ষণ করতে আমরা ভীষণই আগ্রহী,” জানান তিনি। তাঁদের কাছে একটি পানডাব্বাও রয়েছে।

পাথুরিয়াঘাটার নয়না গাঙ্গুলীর কাছে পান মানেই তাঁর মাতামহী, পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুর পরিবারের চিত্রলেখা ঠাকুরের স্মৃতি। তাঁর রুপোর পানদানে খোদাই করা ছিল তাঁর নামের আদ্যক্ষর—CT। এর ভেতরে থাকত জেড-পাথরের ঢাকনাওয়ালা জর্দার বাক্স।

“ওনার পাশে বসে পান সাজানো ছিল আমার প্রিয় কাজগুলির একটি। আমার জন্য আলাদা করে সুপারি ছাড়া পান বানানো হত,” বলেন নয়না। চিত্রলেখা একসময় খ্যাতনামা গায়িকা ছিলেন, তাঁর নামে ৭৮ RPM রেকর্ডও ছিল। কিন্তু পানপ্রেমই একসময় তাঁর জীবনে ট্র্যাজেডি ডেকে আনে। “এক প্রতিদ্বন্দ্বী তাঁর পানে বিষ মিশিয়ে দেয়, যার ফলে তিনি তাঁর কণ্ঠস্বর হারান,” বলেন নয়না।

তবুও, নয়নার ভাষায়, চিত্রলেখার “রানির মতো আচার-ব্যবহার” অটুট ছিল। নয়নার কাছে বিকেল মানেই ছিল ভাঁজ করা পানপাতা, কঠোর টেবিল-ম্যানার্স আর ভূতের গল্প। ৮৬ বছর বয়সে চিত্রলেখার মৃত্যুর পর সেই রুপোর পানদানটি নয়নার কাছেই রয়ে যায়, এবং আজ তিনি সেটিকে সযত্নে রক্ষা করছেন।

অবিভক্ত বাংলার ময়ূর

দক্ষিণ কলকাতায় আর্যাণী বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে রয়েছে উনিশ শতকের শেষ দিকের একটি পিতলের ময়ূর-আকৃতির পানদানি। এটি তাঁর প্রপিতামহী সুরবালা গুপ্তর ছিল, যিনি অবিভক্ত বাংলার দুলালি(বর্তমানে বাংলাদেশের লালমনিরহাট জেলা, রংপুর বিভাগ)-র বাসিন্দা ছিলেন।

“ময়ূরের লেজ খুললে ভিতরে পান রাখার জায়গা দেখা যায়,” বলেন আর্যাণী, ডানা মেলে দেখিয়ে দেন ভেতরের বিভিন্ন মশলার খোপ। আজ এটি তাঁর বসার ঘরের এক শোভাবর্দ্ধক সজ্জালংকার। অতিথিরা মুগ্ধ হয়ে দেখতেন কীভাবে ময়ূরটি ধীরে ধীরে খুলে যায়। “সাধারণ পান দেওয়ার কাজটাকেই এটি এক অভিনয়ে পরিণত করত,” তিনি স্মৃতিচারণ করেন।
ভিন্টেজ বিয়ের গাড়ি
স্বাতী ভাদুড়ির বাড়িতে থাকা পানডাব্বাটি তাঁর শাশুড়ির বিয়ের তত্ত্ব হিসেবে এসেছিল। একটি পুরনো গাড়ির আকৃতিতে তৈরি এই বাক্সটির বনেটে রাখা হত পান, আর গাড়ির মূল অংশে থাকত টাটকা পানপাতা। “দুপুরের খাবারের পর আমরা সবাই একসঙ্গে বসতাম, আর তিনি পান বিলি করতেন। সেটি যেন এক অনুষ্ঠান ছিল,” বলেন স্বাতী। এখন এটি তাঁর স্বামীর উত্তরাধিকার হিসেবে রয়েছে এবং তাঁদের বাড়িতে এক আকর্ষণীয় আলাপের বিষয় হয়ে উঠেছে।
রুপোর হাঁস
অয়ন ঘোষের বাড়িতে একটি রুপোর হাঁস-আকৃতির পানদান রয়েছে, যার সঙ্গে আছে দুটি সূক্ষ্ম ডিমের নকশা। আশ্চর্যের বিষয়, এতে কখনও পান রাখা হয়নি। এটি তাঁর স্ত্রী প্রিয়ব্রতা ঘোষের ঠাকুমা রেণুকা মণ্ডলের বিয়ের তত্ত্ব হিসেবে ১৯৪০-এর দশকের শেষ দিকে আসে।

রেণুকা মণ্ডল ছিলেন অ্যালেনবি রোডের এক খ্যাতনামা গায়িকা ও নৃত্যশিল্পী, যিনি দিলীপ কুমার রায়ের সঙ্গে গান গেয়েছিলেন। সম্ভবত তিনি সুভাষচন্দ্র বসুর সামনেও গান পরিবেশন করেছিলেন এবং ১৯৩৮ সালে তাঁর কাছ থেকে স্বাক্ষরও পান। এই পানদানটি রেণুকা মণ্ডল থেকে তাঁর মেয়ে সস্বতী বক্সি (বালিগঞ্জ প্লেস), এবং সেখান থেকে তাঁর নাতনি প্রিয়ব্রতা ঘোষের কাছে পৌঁছেছে।

জমিদারি স্মৃতি
এরিকা সর্দারের পান-এর ডাব্বাটি তাঁর পিতামহী অসীমা সর্দার ১৯৬২ সালে বিয়ের উপহার হিসেবে পান।
“তিনি এতে পানের মশলা রাখতেন, কখনও কখনও পানও। এই বাক্স থেকেই তিনি সরাসরি খেতেন,” বলেন এরিকা।

অসীমা বাংলাদেশের দেবহাটার জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং পরে বিবাহসূত্রে খুলনার সর্দার পরিবারের সদস্য হন। স্বাধীনতার আগেই তাঁদের পরিবার কলকাতায় চলে আসে। ঝিনুক-আকৃতির এই অলংকৃত বাক্সটি আসলে পানদান নয়, বরং একটি ডাব্বা—যাতে প্রস্তুত করা পান বহন করা হত। বর্তমানে এটি একটি শোভা বর্ধনের বস্তু হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে। এইসব পানদান শুধুমাত্র এক একটি বস্তু নয়—এগুলি এক সময়ের সামাজিক রীতিনীতি, সৌজন্যবোধ ও পারিবারিক ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী।

এই নববর্ষের প্রাক্কালে বাংলার সংস্কৃতির এরকম নিদর্শন গুলো উদযাপনের আনন্দ নিঃসন্দেহে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়।