Monday, June 29, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

একসাথে এভারেস্ট ও লোৎসে জয়ের পরও নতুন চ্যালেঞ্জের খোঁজে ক্যালকাটা ক্লাইম্বার্স সার্কেল -এর শুভম চট্টোপাধ্যায়

একদিন এভারেস্ট, পরদিন লোৎসে জয় — এখনও থামতে রাজি নন বাংলার পর্বতারোহী হুগলির বাসিন্দা শুভম চট্টোপাধ্যায়। পেশায় তিনি একজন ব্যবসায়ী এবং তাঁর পাশে রয়েছে অত্যন্ত সহায়ক একটি পরিবার। বাইরে থেকে দেখলে বিষয়টি সাধারণ ও খুবই স্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু শুভমের পরিচয় এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

গত ২০ মে তিনি বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেন। আর ঠিক পরের দিন, ২১ মে, তিনি আরোহণ করেন মাউন্ট লোৎসে। এভারেস্ট বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ হলেও, লোৎসে জয় করাও কোনো সহজ কৃতিত্ব নয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮,৫১৬ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত লোৎসে বিশ্বের চতুর্থ সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ।

শুভম বলেন, “মাকালুকে তালিকায় রেখে আমার ট্রিপল সামিটের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু অর্থসংক্রান্ত সমস্যার কারণে সেই লক্ষ্য পূরণ করতে পারিনি।”

পর্বতজয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে শুভমের সঙ্গে কথা বললেই স্পষ্ট হয়ে যায়, পর্বতারোহণ এবং রক ক্লাইম্বিংয়ের প্রতি তাঁর আবেগ কতটা গভীর।

২০০৬ সালে ‘সেভেন সামিটস’ সম্পূর্ণ করা কিংবদন্তি ভারতীয় পর্বতারোহী মল্লি মাস্তান বাবুর পথ অনুসরণ করে শুভম ইতিমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ১৬টি শৃঙ্গ জয় করেছেন।

তাঁর সাফল্যের তালিকায় রয়েছে মাউন্ট কিলিমাঞ্জারো (ফেব্রুয়ারি ২০২৪), মাউন্ট এলব্রুস (জুলাই ২০২৪), মাউন্ট গিলুওয়ে (আগস্ট ২০২৪), ইন্দোনেশিয়ার কার্স্টেন্‌জ পিরামিড (নভেম্বর ২০২৪) এবং অ্যান্টার্কটিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ভিনসন ম্যাসিফ (জানুয়ারি ২০২৬)-সহ আরও বহু উল্লেখযোগ্য শৃঙ্গ।

শুভমের কথায়, “আজকাল এভারেস্ট অত্যন্ত বাণিজ্যিক হয়ে উঠেছে। সম্ভবত এ বছর প্রায় ৪০০ জন এভারেস্টে আরোহণ করেছেন, অথচ লোৎসে জয় করেছেন মাত্র ২০ জন।”

তবে পর্বতজয়ের এই সাফল্য শুধুমাত্র ব্যক্তিগত আবেগ বা নেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পিছনে রয়েছে একটি বৃহত্তর লক্ষ্যও।

তিনি বলেন, “আমি চাই ভারতকে বিশ্ব পর্বতারোহণের মানচিত্রে আরও পোক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে। ইতিমধ্যেই আমার ঝুলিতে একটি বিশ্বরেকর্ড এবং পাঁচটি ভারতীয় রেকর্ডসহ একাধিক কৃতিত্ব রয়েছে। মানুষ আমাকে ব্যক্তিগতভাবে চেনে। কিন্তু আমি চাই আমার দেশের ক্লাইম্বিং সংস্কৃতির আরও বিকাশ হোক।”

তিনি আরও যোগ করেন, “আমি কিছু অসাধারণ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে চাই। যেমন—অতিরিক্ত অক্সিজেন ছাড়া কিছু নির্দিষ্ট শৃঙ্গে আরোহণের চেষ্টা, যা কোনো ভারতীয় আগে কখনও করেননি। অথবা গতি-ভিত্তিক নতুন রেকর্ড গড়তে চাই। হয়তো এমন সময়সীমার মধ্যে দুটি ৮,০০০ মিটারের বেশি উচ্চতার শৃঙ্গ জয়ের চেষ্টা করব, যা আগে কেউ কখনও করতে পারেননি।”

অভিযানের সময় যখন পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, স্বাভাবিকভাবেই তাঁর পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন থাকেন। তবে কখনও তাঁকে তাঁর স্বপ্ন ও আবেগের পথ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেননি।

শুভম বলেন, “আমার পরিবার এবং ক্যালকাটা ক্লাইম্বার্স সার্কেলই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। বিভিন্ন পর্বতারোহণ সংস্থা আমাকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং সংবর্ধিতও করেছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কিছু পাইনি। তবে তা নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই। আমি শুধু আমার লক্ষ্য পূরণ করতে চাই।”

এভারেস্ট অভিযানের একেবারে প্রথম যুগ থেকেই বাঙালিদের মধ্যে পর্বতারোহণের একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই খেলাধুলা ও অভিযাত্রিক কর্মকাণ্ডের প্রতি আগ্রহও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

শুভম জানান, ভবিষ্যতের পর্বতারোহীদের গড়ে তুলতেও তিনি আগ্রহী। তিনি বলেন, “এখনও পর্যন্ত শিক্ষক বা প্রশিক্ষকের ভূমিকায় কাজ করার মতো সময় বের করতে পারিনি। তবে ভবিষ্যতে হয়তো সেই কাজেও নিজেকে কিছুটা সময় দিতে পারব।”