রিকশা চালান, কিন্তু তিনি শুধুই ‘রিকশাওয়ালা’ নন। লেখাপড়া প্রায় নেই, তবু আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ে তাঁর জ্ঞান অবাক করে দেয় অনেক বিশেষজ্ঞকেও। দক্ষিণ কলকাতার পাটুলির বাসিন্দা সাজ্জাদ হালদারের জীবন যেন ফুটবলপ্রেমের এক অসাধারণ গল্প।
ফুটবলের প্রসঙ্গ উঠলেই সাজ্জাদ হালদার আর পাড়ার নির্ভরযোগ্য মানুষের গন্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেন না। মুহূর্তের মধ্যেই তিনি যেন হয়ে ওঠেন এক চলন্ত ফুটবল বিশ্বকোষ।
সাদা পাঞ্জাবি, লুঙ্গি আর স্মার্টফোনহীন জীবন—আজকের প্রজন্ম যাকে মজা করে “বার্নার ফোন” বলে—সবই আগের মতো। পাশেই দাঁড়িয়ে থাকে তাঁর রিকশা। কিন্তু বিশ্বকাপ, জার্মানি কিংবা কিলিয়ান এমবাপ্পের নাম উচ্চারণ করলেই ৬৪ বছরের এই মানুষটি অনায়াসে এক যুগ থেকে আরেক যুগে চলে যান। খেলোয়াড়, দল, কৌশল, বিশ্বকাপের ইতিহাস—সবই তাঁর নখদর্পণে, যেন কয়েক দশক ধরে বিষয়টি নিয়েই পড়াশোনা করেছেন।
সম্প্রতি সাজ্জাদ হালদার বাঙালির সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছেন। দক্ষিণ কলকাতার পাটুলির একটি চায়ের দোকানে গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন বিশ্বকাপ অংশগ্রহণকারী দেশের পতাকার নিচে বসে ফুটবল নিয়ে তাঁর প্রাণবন্ত আলোচনা একসময় ক্যামেরাবন্দি হয়। সেই ভিডিও মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়।
ভিডিও দেখে অনেকেই বিস্মিত হন—যিনি রিকশা চালান এবং মাত্র এক বছর স্কুলে পড়েছেন, তিনি কীভাবে আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ে এত সাবলীলভাবে আলোচনা করতে পারেন!
তবে সাজ্জাদের কাছে ফুটবল কখনও ক্ষণিকের শখ ছিল না।
“আমি ১৯৮৬ সাল থেকে ফুটবল দেখা শুরু করি। তখন আমাদের টেলিভিশন কেনার সামর্থ্য ছিল না। আমার এক বন্ধু ছিল, সে একটি মিষ্টির দোকানে কাজ করত, যদিও এখন সেই দোকান আর নেই। সে ছিল মোহনবাগানের অন্ধ সমর্থক। তার দোকানেই বিভিন্ন দলের ফুটবল ম্যাচ দেখা শুরু করি,”—মাই কলকাতাকে জানান সাজ্জাদ।
১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর মতো তিনিও মুগ্ধ হয়েছিলেন দিয়েগো মারাদোনার খেলায়। তবে অধিকাংশের মতো আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়ে যাননি।
“আমার প্রিয় দল জার্মানি। লোথার ম্যাথাউস, অলিভার কান এবং পরে ২০১৪ সালের বিশ্বকাপজয়ী জার্মান দলকে আমি ভীষণ ভালোবাসতাম। মারাদোনা আমাকে ফুটবলের প্রেমে ফেলেছিলেন, কিন্তু যে দল মারাদোনাকে থামিয়েছিল, সেই জার্মানিকেই আমি আরও বেশি ভালোবেসে ফেলি।”
বর্তমানে তাঁর প্রিয় ক্লাব বিশ্বের অন্যতম সফল ক্লাব।
“আমি রিয়াল মাদ্রিদের সমর্থক। এখন আমার সবচেয়ে প্রিয় ফুটবলার কিলিয়ান এমবাপ্পে। আগে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোকে খুব ভালোবাসতাম।”
তিনি জানান, ভারতীয় ক্লাব ফুটবল তাঁকে কখনও খুব একটা টানেনি। সেন্ট লিও নিয়েও তাঁর বিশেষ আগ্রহ নেই।
“লা লিগা, সিরি আ, বুন্দেসলিগা—সবই আমি অনুসরণ করি। ওদের খেলার গতি আর কৌশল আমার ভীষণ ভালো লাগে। ইউরোপের ফুটবল অনেক দ্রুতগতির। লাতিন আমেরিকার ফুটবল বা মেসিকে আমি কখনও বিশেষ পছন্দ করিনি।”
ইউরোপের বড় বড় লিগের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দ্রুতগতির খেলা, কৌশলগত লড়াই তাঁকে আজও টিভির সামনে আটকে রাখে। এখন তিনি ছেলের স্মার্টফোনে ম্যাচ স্ট্রিমিং করে দেখেন।
কলকাতায় তিনি মাত্র একটি বড় ম্যাচ মাঠে বসে দেখেছেন। আশির দশকে ইস্টবেঙ্গল ও মহামেডান স্পোর্টিংয়ের সেই বিখ্যাত ম্যাচ, যেখানে খেলেছিলেন চিমা ওকোরি, জামশেদ নাসিরি ও মাজিদ বিসকার।
“সব বিস্তারিত মনে নেই। তবে দর্শকদের মধ্যে ভয়ঙ্কর মারামারি হয়েছিল, সেটা এখনও মনে আছে। ওটাই ছিল কলকাতায় আমার শেষ মাঠে বসে ফুটবল দেখা। ভারতীয় ফুটবল আমি খুব একটা দেখি না, শুধু এশিয়ান টুর্নামেন্টে ভারত খেললে দেখি।”
“সেটাও এখন খুব হতাশাজনক,”—আক্ষেপ সাজ্জাদের।
তবে নিজের পাড়ায় সাজ্জাদ শুধু ফুটবল বিশেষজ্ঞ নন। তিনি প্রচলিত অর্থে ‘রিকশাওয়ালা’ও নন। যাত্রী বহনের জন্য নয়, বিভিন্ন কাজের জন্যই তিনি রিকশা ব্যবহার করেন।
প্রতিবেদকের তাঁর সঙ্গে দেখা বরোদা অ্যাভিনিউয়ে মৈত্র পরিবারের বাড়িতে। বিশ্বকাপ নিয়ে কথা শুরু হওয়ার আগেই তাঁর ফোন বেজে ওঠে।
“হ্যাঁ, রঘুনাথ মার্কেটে রেডিও সারানো হয়। কিন্তু এখন আর রেডিও কে শোনে বলুন তো?”—রেডিও সারাতে চাওয়া এক ব্যক্তিকে বলেন সাজ্জাদ।
“আমি পড়তে পারি না। শুধু বাংলায় নিজের নাম সই করতে পারি। ফোন নম্বরও সেভ করতে পারি না। শেষ তিনটি সংখ্যা দেখে কোন বাড়ি সেটা চিনে নিই।”
তিনি মাত্র এক বছর স্কুলে পড়েছিলেন। এরপর তাঁর বাবা তাঁকে পার্ক সার্কাসের ধাঙড় বাজারে পারিবারিক সবজির দোকানে কাজে বসিয়ে দেন।
কিন্তু হিন্দি ভাষায় দক্ষ না হওয়ায় সেই ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারেননি।
“আমি খুব কম হিন্দি জানতাম। সেখানে অধিকাংশ দোকানদার ও ক্রেতাই সাবলীল হিন্দি বলতেন। তাই দোকান চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। পরে রিকশা চালানোই সহজ মনে হয়।”
প্রতিদিন ভোর ৪টায় ঘুম থেকে ওঠেন সাজ্জাদ। স্নান সেরে ফজরের নামাজ পড়েন। এরপর ভাজা ছোলার গুঁড়ো দিয়ে তৈরি ছাতুর শরবত পান করে দিনের কাজ শুরু করেন।
যে শহরের প্রায় ১২ শতাংশ মানুষ প্রবীণ এবং তাঁদের অনেকেই একা থাকেন বা ইন্টারনেট ব্যবহারে অভ্যস্ত নন, সেখানে সাজ্জাদ হালদার যেন একাই সুইগি, আরবান কোম্পানি, ব্লিঙ্কিট এবং জি৪এস-এর সম্মিলিত রূপ।
তিনি প্রবীণদের ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে সাহায্য করেন, বাজার করে দেন, সরকারি অফিস বা হাসপাতালে সঙ্গে যান। প্রয়োজনে তাঁদের বাড়ি পাহারা দিতেও রাত কাটিয়ে দেন।
সারাক্ষণই তাঁর ফোন বেজে চলে।
আলোচনা যতই অন্যদিকে যাক, ফুটবল শেষ পর্যন্ত ফিরে আসে। তবে সেটাই তাঁর একমাত্র ক্রীড়াপ্রেম নয়।
হকিও তিনি গভীর আগ্রহ নিয়ে অনুসরণ করেন। ভারতের একসময়ের গৌরবময় অবস্থান থেকে অবনতির কথাও তাঁর জানা।
“লন টেনিস খুব একটা বুঝি না। কিন্তু হকি বুঝি। খেলার গতি আমার খুব ভালো লাগে। একসময় ভারত আর পাকিস্তান ছিল সেরা দল। এখন আমরা অষ্টম স্থানে। তবুও ভারতের হকির খবর আমি নিয়মিত রাখি।”
বরিস বেকার ও স্টেফি গ্রাফের নামও তাঁর জানা। যদিও তাঁর মতে, টেনিস ফুটবল বা হকির তুলনায় অনেক কঠিন খেলা।
দক্ষিণ কলকাতার বহু প্রবীণ মানুষের কাছে সাজ্জাদ হালদার আজ ভরসার আরেক নাম। মৈত্র পরিবারও বাজার করা থেকে সামাজিক অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া—সব দায়িত্বই নিশ্চিন্তে তাঁর হাতে তুলে দেন।
মৈত্র পরিবারের কথায়, “ও খুবই অদ্ভুত মানুষ। বাজার করে এনে মাথায় হিসেব কষে টাকা নেয়। আবার অনেক সময় পরের দিন এসে বলে—’কাল ভুল হিসেব করে বেশি নিয়ে ফেলেছিলাম’, তারপর বাড়তি টাকা ফিরিয়ে দেয়।”
ভাইরাল ভিডিও তাঁকে জনপ্রিয়তা দিলেও সাজ্জাদ আজও একই মানুষ। দিনের কাজ শেষ করে সন্ধ্যায় নিজের পরিচিত পাড়াতেই ফিরে যান।
তাঁর কাছে ফুটবল কোনও পালানোর পথ নয়, কোনও শখও নয়। এটি এক আজীবনের ভালোবাসা—একটি বিশ্বকাপ থেকে আরেকটি বিশ্বকাপ, পাড়ার মিষ্টির দোকানের ধার করা টেলিভিশন থেকে চায়ের দোকানের গভীর রাতের আড্ডা—এইভাবেই গড়ে উঠেছে তাঁর ফুটবলযাত্রা।
পাটুলিতে তিনি সবার কাছে পরিচিত সাহায্যের জন্য প্রথম ফোন করা মানুষ হিসেবে। কিন্তু বিশ্বকাপ এলেই সাজ্জাদ হালদার হয়ে ওঠেন সেই মানুষ, যিনি একটি ম্যাচও মিস করেন না, আর যার ফুটবলের গল্প কোনওদিন ফুরোয় না।


