Saturday, August 15, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

রাপা নুইয়ের ভলকানো ম্যারাথন সম্পূর্ণ করে ইতিহাস গড়লেন কলকাতার উদ্যোক্তা রাম গোপাল কোঠারি

প্রথম ভারতীয় হিসেবে বিশ্বের অন্যতম দুর্গম জনবসতিপূর্ণ দ্বীপ ইস্টার আইল্যান্ডে এই কৃতিত্ব অর্জনকারী রাম গোপাল বাবু। এর আগেও ভৌগোলিক উত্তর মেরুতে ম্যারাথন শেষ করার নজিরও গড়েছিলেন তিনি ।

ম্যারাথন এ দৌড়লেও রাম গোপাল কোঠারি নিজেকে কখনও দৌড়বিদ বলে মনে করেন না। তাঁর পরিচয়, তিনি একজন ভ্রমণপিপাসু।

প্রতিযোগিতামূলক দৌড়ের প্রতি ভালোবাসার চেয়ে পৃথিবীর অজানা ও বিষ্ময়কর স্থান ঘুরে দেখার অদম্য ইচ্ছাই কলকাতার এই উদ্যোক্তাকে ভৌগোলিক উত্তর মেরু থেকে বিশ্বের অন্যতম বিচ্ছিন্ন জনবসতিপূর্ণ দ্বীপ চিলির রাপা নুই (ইস্টার আইল্যান্ড)-এ পৌঁছে দিয়েছে। সম্প্রতি তিনি সেখানে অনুষ্ঠিত ভলকানো ম্যারাথন সম্পূর্ণ করে প্রথম ভারতীয় হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন।

এই সাফল্য এসেছে ভৌগোলিক উত্তর মেরুতে ম্যারাথন সম্পূর্ণ করা প্রথম ভারতীয় হওয়ার এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে।

রাপা নুই, যা ইস্টার আইল্যান্ড নামেই বেশি পরিচিত, সেখানে পৌঁছানোই ছিল এক রোমাঞ্চকর অভিযান। ভারত থেকে মুম্বই, ইস্তানবুল ও সান্তিয়াগো হয়ে প্রায় ২৪,০০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে তিনি দ্বীপে পৌঁছান। রহস্যময় মোয়াই পাথরের মূর্তি এবং কঠিন আগ্নেয়গিরির ভূপ্রকৃতির জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত এই দ্বীপ।

এই সফরের মাধ্যমে তাঁর ভ্রমণ করা দেশের সংখ্যা দাঁড়াল ৮০।

কোঠারি সংবাদ সংস্থা পিটিআই-কে বলেন,
“আমি বিশ্বের অন্যতম দুর্গম জনবসতিপূর্ণ দ্বীপ চিলির রাপা নুই (ইস্টার আইল্যান্ড)-এ অনুষ্ঠিত ভলকানো ম্যারাথন সম্পূর্ণ করা প্রথম ভারতীয় হয়েছি।”

তিনি আরও বলেন,
“এই রেকর্ডগুলো শুধু পথচলার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। আমার আসল যাত্রা সবসময়ই নিজের সীমাকে অতিক্রম করা এবং অন্যদেরও নিজেদের সীমার বাইরে স্বপ্ন দেখতে অনুপ্রাণিত করা।”

তবে তাঁর কাছে এই রেকর্ডগুলো বৃহত্তর এক যাত্রার কেবল উল্লেখযোগ্য মাইলফলক মাত্র।

বিশ্বের সবচেয়ে অদ্ভুত ও কঠিন ম্যারাথনগুলোর প্রতি আকর্ষণের কারণ জানতে চাইলে কোঠারি বলেন,
“আপনি ঠিক শব্দটাই ব্যবহার করেছেন—‘ক্ষুধা’। এখন এটা সত্যিই এক ধরনের ক্ষুধায় পরিণত হয়েছে।”

এই অদম্য তাগিদই তাঁকে প্রথম নিয়ে যায় ২০২২ সালে অ্যান্টার্কটিকায়।

সেই অভিযানের পরিকল্পনা করতে গিয়েই তিনি আর্কটিকে অনুষ্ঠিত একটি ম্যারাথনের কথা জানতে পারেন। প্রথমে এটি ৮৯ ডিগ্রি অক্ষাংশে অনুষ্ঠিত হলেও পরে পুরোপুরি ৯০ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশে আয়োজন করা হয়। কোঠারি সেখানে অংশগ্রহণ করেন এবং প্রথম ভারতীয় হিসেবে ম্যারাথন সম্পূর্ণ করেন।
তবুও তাঁর ‘বাকেট লিস্ট’-এ একটি স্বপ্নের গন্তব্য তখনও বাকি ছিল।

“ইস্টার আইল্যান্ড ছিল আমার স্বপ্নের জায়গাগুলোর একটি,” বলেন তিনি।

বহু বছর ধরেই দ্বীপের বিশাল পাথরের রহস্যময় মূর্তিগুলো তাঁকে আকৃষ্ট করত।

পরে জানতে পারেন, অ্যাডভেঞ্চার রেসিং সংস্থা রানবুক এই দ্বীপেই ভলকানো ম্যারাথনের আয়োজন করে। তখনই ভ্রমণ আর সহনশীলতার আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জকে একসঙ্গে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

উত্তর মেরুর অভিযানের তুলনায় ভলকানো ম্যারাথনের জন্য অনেক বেশি পরিকল্পিত প্রস্তুতি নিয়েছিলেন কোঠারি।

তিনি নিয়মিত হাফ ম্যারাথন দৌড়ান এবং টাটা মুম্বই ম্যারাথন ও কলকাতা ম্যারাথন-এর মতো প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। রাপা নুইয়ের দুর্গম আগ্নেয়গিরির পথ এবং প্রায় ৬০০ মিটার উচ্চতায় ওঠানামার সঙ্গে মানিয়ে নিতে তিনি বিশেষভাবে নিজের প্রশিক্ষণসূচি তৈরি করেন।

তিনি বলেন,
“এই ম্যারাথনটাকে আমি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছিলাম।”

অনুশীলনের সময় তিনি নিয়মিত ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত দৌড়াতেন। পাশাপাশি খাড়া চড়াইয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে সল্টলেক স্টেডিয়ামের র‌্যাম্পে দীর্ঘ সময় ধরে অনুশীলন করেন। সন্ধ্যাবেলায় ঢালু ট্রেডমিলে দীর্ঘক্ষণ হাঁটতেন, যাতে সহনশক্তি আরও বাড়ে।

এই প্রস্তুতির বড় অংশই পরিচালনা করেন নর্থ কলকাতা রানার্স গোষ্ঠীর অধিনায়ক বিকাশ দুগ্গর।

কোঠারি বলেন,
“উচ্চতার জন্য উনি আমাকে র‌্যাম্পে দৌড়ানোর ওপর জোর দিতে বলেন। দীর্ঘ দূরত্বের দৌড়ে এনার্জি জেল ব্যবহারের পরামর্শও তিনিই দেন।”

এই প্রস্তুতির সুফলও পান তিনি।

কোঠারির কথায়,
“আমি একমাত্র প্রতিযোগী ছিলাম, যার পায়ে কোনও ক্র্যাম্প ধরেনি।”

তিনি আরও বলেন,
“আমার রুমমেট ছিলেন চীনের একজন দৌড়বিদ। তিনি বিশ্বের প্রায় ৭০টি ম্যারাথন সম্পূর্ণ করেছেন। কিন্তু তাঁরও ক্র্যাম্প ধরেছিল। আমি তাঁকে অনেক আগেই পিছনে ফেলে ফিনিশ করি।”

প্রতিযোগিতাটি ছিল অত্যন্ত কঠিন।

প্রথমার্ধে ছিল পাকা রাস্তা, যেখানে বারবার উঁচু-নিচু পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। এরপর শুরু হয় প্রকৃত চ্যালেঞ্জ—আগ্নেয়গিরির রুক্ষ পথ, আলগা পাথর, গর্ত এবং অসমতল ভূমি।

কোঠারি বলেন,
“২১ কিলোমিটারের পর থেকেই আসল চ্যালেঞ্জ শুরু হয়। হঠাৎ করেই পুরো ভূপ্রকৃতি বদলে যায়।”

তবে চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছিল এতটাই মনোমুগ্ধকর যে অভিজ্ঞ দৌড়বিদরাও মুগ্ধ হয়ে যেতেন।

তিনি বলেন,
“আমাদের পাশ দিয়ে ঘোড়া ছুটে যাচ্ছিল, হলুদ ফুলে ভরা উপত্যকা আর চারদিকে প্রশান্ত মহাসাগরের অপূর্ব দৃশ্য। অনেক দৌড়বিদকে শুধু দৃশ্য দেখতে গিয়ে পিছলে পড়তেও দেখেছি।”

সবচেয়ে কঠিন ছিল রানো কাউ আগ্নেয়গিরির চূড়ায় ওঠা
রানো কাউ আগ্নেয়গিরির গহ্বর পর্যন্ত খাড়া চড়াইই ছিল পুরো ম্যারাথনের সবচেয়ে কঠিন অংশ।

কোঠারি বলেন,
“ওই পাঁচ কিলোমিটারই ছিল সবচেয়ে কঠিন। চড়াই এতটাই খাড়া ছিল যে হাঁটাও কঠিন হয়ে পড়েছিল।”

তিনি আরও বলেন,
“শেষ দুই কিলোমিটার ছিল ভয়ঙ্কর। পুরো পথটাই ভাঙাচোরা ছিল। সত্যি বলতে, কীভাবে শেষ করেছি, এখনও বুঝতে পারি না।”

শারীরিক কষ্ট সত্ত্বেও কোঠারির মতে, তাঁর দেখা ম্যারাথনগুলোর মধ্যে ইস্টার আইল্যান্ডের পথই সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর।

তিনি বলেন,
“আমি ৮০টি দেশ ভ্রমণ করেছি। অ্যান্টার্কটিকা এখনও আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর জায়গা। কিন্তু সবুজ প্রকৃতি, মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং সৌন্দর্যের কথা বললে ইস্টার আইল্যান্ডকে হারানো সত্যিই কঠিন।”

কোঠারির পরবর্তী চ্যালেঞ্জও ইতিমধ্যেই ঠিক হয়ে গেছে।

আগামী নভেম্বরে তিনি আবার অ্যান্টার্কটিকায় ফিরতে চান। সেখানে ২৪ ঘণ্টার একটি আল্ট্রা ম্যারাথনে অংশ নিয়ে মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যাওয়া তাপমাত্রার মধ্যে ১২০ কিলোমিটার দৌড় সম্পূর্ণ করার লক্ষ্য নিয়েছেন।

যদি তিনি সফল হন, তবে আবারও এই অসাধারণ কৃতিত্ব অর্জনকারী প্রথম ভারতীয় হিসেবে ইতিহাস গড়বেন।