বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাইকেলে ঘুরে সচেতনতার বার্তা ছড়ানোই লক্ষ্য তিন বন্ধুর। হাওড়ার কালী বাবুর বাজারে এক গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় তিন বন্ধু দেখাচ্ছিলেন তাঁদের ভিয়েতনাম সাইকেল অভিযানের ওপর একটি তথ্যচিত্র। সাদা কাপড়ের তৈরি অস্থায়ী পর্দাটি বাতাসে দুলছিল, কিন্তু দর্শকদের উচ্ছ্বাসে কোনও ভাটা পড়েনি। তথ্যচিত্রটি ছিল সবার কাছে দারুণ জনপ্রিয়। এমন সচেতনতামূলক বার্তা নিয়ে বিদেশে সাইকেল অভিযান এই প্রথম নয় মলয় মুখোপাধ্যায়ের। আর এটাই যে শেষও নয়, তা স্পষ্ট।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মলয় মুখোপাধ্যায় তাঁর দুই বন্ধু পার্থ প্রতিম হাজরা এবং দেবাশিস চক্রবর্তীর সঙ্গে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া বন্দর থেকে শুরু করেন তাঁদের বিশেষ অভিযান ‘সাইকেল-এ সাহারা’। মলয় পেশায় একজন পর্বতারোহী, পার্থ প্রতিম হাজরা কাপড় ব্যবসায়ী এবং দেবাশিস চক্রবর্তী একজন সাংবাদিক। বিশ্বের বৃহত্তম মরুভূমিতে টানা নয় দিনের সাইকেলযাত্রার জন্য তাঁরা কয়েক সপ্তাহ ধরে কঠোর অনুশীলন করেন, যাতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার মতো সহনশক্তি গড়ে ওঠে।
মলয় মুখোপাধ্যায় বলেন,
“আমার স্কুলজীবনের এক বন্ধু কায়রোতে থাকে। তাই অভিযান শুরুর আগে থাকার জন্য একটি জায়গা পেয়ে গিয়েছিলাম। সাধারণত ভোর সাড়ে ৪টায় ভাড়া করা সাইকেল নিয়ে যাত্রা শুরু করতাম এবং এক একটি নির্ধারিত বিরতিস্থল থেকে পরবর্তী বিরতিস্থলে এগিয়ে যেতাম।”
কায়রো থেকে লেক নাসের পর্যন্ত যাত্রাপথে তাঁরা লক্ষ্য করেন, মরুভূমির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী মানুষের উপস্থিতি অত্যন্ত কম। মিশরের জাতীয় সড়কগুলি ছয়টি প্রধান শহরকে যুক্ত করেছে। ফলে পথে দেখা মিলত মূলত ভারী ট্রাক ও পণ্যবাহী গাড়ির।
পার্থ প্রতিম হাজরা বলেন,
“প্রতি ২০ কিলোমিটার অন্তর খেজুরগাছের নীচে সবার জন্য রাখা থাকত মাটির কলসি ভর্তি পানীয় জল। মরুভূমিতে জল ছিল সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয়। তাই এই ব্যবস্থা আমাদের ভীষণ সাহায্য করেছে।”
স্থানীয় মানুষের সঙ্গে পরিচয়, একই থালায় বসে খাবার ভাগ করে খাওয়া এবং তাঁদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে গল্প-আড্ডার মধ্য দিয়েই সাহারা অভিযানের পথ সম্পূর্ণ করেন তিন বন্ধু।
পার্থ-র ভাষায়, “আপনি যদি স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মিশে তাঁদের মতো জীবনযাপন করেন, তাহলে অসাধারণ সব গল্প জানতে পারবেন। আমরা জেনেছিলাম, মিশরের যেখানেই যান না কেন, বিনামূল্যে রুটি পাওয়া যায়। শুধু সেই রুটির সঙ্গে খাওয়ার জন্য যে পদটি লাগে, সেটিই কিনতে হয়।”
সেখানকার সামাজিক রীতি মেনে বড় থালায় একসঙ্গে খাবার ভাগ করে খেয়েছেন তাঁরা। যাত্রাপথে গ্রামের মানুষ কৌতূহলভরে ভারতীয় এই সাইকেল আরোহীদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং বিনামূল্যে ফল ও সবজি খেতে দিয়েছেন।
ফোনে ত্রিশূল শৃঙ্গে পরবর্তী পর্বতারোহণ অভিযানের প্রস্তুতি নিতে নিতে মলয় মুখোপাধ্যায় বলেন, “এবার আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য শ্রীলঙ্কা।” পার্থ প্রতিম হাজরা জানান, প্রতি বছর শীতকালে অন্তত একটি আন্তর্জাতিক সাইকেল অভিযান করার লক্ষ্য নিয়েই এগিয়ে চলেছেন তাঁরা।
তিনি আরও বলেন, “আমরা তিনজন যেন এখন একটাই শরীর হয়ে গেছি। তাই আমাদের মধ্যে কারও কোনও সমস্যা হলে, তিনজনকেই অভিযান থামাতে হয়। সেই কারণেই আমরা সবসময় অত্যন্ত সতর্ক থাকি।”
অনুমতি বা প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে খুব কমই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁদের। কারণ, এর আগেই তাঁরা বাংলাদেশ, ফিলিপিন্স, কম্বোডিয়া এবং ভিয়েতনাম—এই চারটি আন্তর্জাতিক সাইকেল অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন।
মলয় মুখোপাধ্যায় বলেন,
“আমাদের প্রতিটি সফরই ছিল এক একটি জাদুকরী অভিজ্ঞতা। ভিয়েতনামের হো চি মিন ট্রেল হোক কিংবা কম্বোডিয়ার আঙ্কোর ওয়াট ট্রেল—প্রতিটি জায়গাতেই আমরা কোনও ধারণা ছাড়াই গিয়েছিলাম। আর সেই জন্যই অভিজ্ঞতাগুলো এত সমৃদ্ধ হয়েছে।”
তিনি জানান, আগামী শ্রীলঙ্কা অভিযানে দ্বীপ রাষ্ট্রটির উপকূলবর্তী অঞ্চল ধরে সাইকেলে ঘুরে তার বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যকে কাছ থেকে জানার পরিকল্পনা রয়েছে।
ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণেই সাহারা পথকে বেছে নিয়েছিলেন তাঁরা।
মলয় মুখোপাধ্যায় বলেন,
“ভ্যালি অব দ্য কিংস, ভ্যালি অব দ্য কুইন্সের মধ্য দিয়ে সাইকেল চালিয়ে নীল নদের পাশ ধরে এগিয়ে যাওয়া ছিল স্বপ্নপূরণের মতো। মনে হচ্ছিল, ছোটবেলায় যে ছেলেটি ফারাওদের দেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখত, অবশেষে সে-ই যেন নিজের সেই স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পেল।”


