বাংলার হয়ে প্যারা ক্রিকেট খেলেছেন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের প্রতিনিধিত্বও করেছেন। অথচ ৪৭ বছর বয়সে সংসার চালাতে দুধ সরবরাহের কাজ করতে হয় কমল সরকারকে
উত্তর কলকাতার বরানগর মেট্রো স্টেশন থেকে অল্প হাঁটাপথ। ডানলপ ক্রসিংয়ের কাছেই ছোট্ট একটি ঘরে থাকেন কমল সরকার। প্যারা ক্রিকেটে বাংলার প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। তাঁর দাবি, অলরাউন্ডার হিসেবে ভারতের হয়েও খেলেছেন। অথচ বরানগরের বাইরে খুব কম মানুষই তাঁকে চেনেন।

ভুল চিকিৎসা-নির্ণয়ে মাত্র ছয় বছর বয়সে বাঁ হাত হারান
“১৯৮৬ সালে টবিন রোডের একটি হাসপাতালে ভুল চিকিৎসা-নির্ণয়ের কারণে মাত্র ছয় বছর বয়সে আমার বাঁ হাত কেটে বাদ দিতে হয়েছিল,” বলছিলেন সরকার, যাঁকে স্নেহ করে সকলে ‘কাজু দা’ বলে ডাকেন।
কিন্তু একটি হাত হারিয়েও খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন থেকে কখনও সরে আসেননি কমল।
“অস্ত্রোপচারের পর নিজেকে কখনও অন্যরকম মনে হয়নি। সবসময় আমার বন্ধু ও পরিবারের সমর্থন পেয়েছি। জীবনে যখন কঠিন সময় এসেছে, তখন বন্ধুরাই আর্থিকভাবে আমাকে সাহায্য করেছে,” বলেন তিনি।
এখন ৪৭ বছর বয়স কমলের। একটি ছোট্ট চিলেকোঠার ঘরে থাকেন তিনি। বিবাহিত কমলের যমজ সন্তান রয়েছে। তবে তাঁর স্ত্রী ও সন্তানরা তাঁর ঘর থেকে তিনটি বাড়ি দূরে থাকেন।

“পরিবারের সঙ্গে রাতের খাবার খাই। কিন্তু তারপর ঘুমোতে এখানে ফিরে আসি। সন্তান ও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর মতো বিলাসিতা আমার নেই—এটাই আমার আফসোস,” বলেন তিনি।
দুধ সরবরাহকারী একটি সংস্থায় দীর্ঘ সময় কাজ করেন কমল। তাঁর কথায়, এই কাজ থেকে যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনওরকমে দিন চলে।
কমল জানান:
“১৯৯৯ সালে প্রথম বাংলার ক্রিকেট দলে খেলি। সেই বছর আমরা টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছিলাম এবং আমাকে সেরা ফিল্ডারের পুরস্কার দেওয়া হয়। সেটাই ছিল আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। টুর্নামেন্টটি হয়েছিল লখ্নৌয়ে। জয়ের পর দলের সঙ্গে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে খেলেছি। এরপর আমাকে ভারতীয় প্যারা-ক্রিকেট দলে খেলার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়,” ।
কমল আরো বলেন,
“২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলার ক্রিকেট দলের হয়ে খেলেছি। তারপর অবসর নিই।”
তবে কমলের ক্রীড়াজীবন শুধু ক্রিকেটেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অ্যাথলেটিক্সেও প্রতিযোগিতা করেছেন তিনি। ছিলেন একজন প্যারালিম্পিয়ানও।
“দুর্ঘটনার পর আমাকে মেদিনীপুরের একটি আবাসিক স্কুলে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে আমি লং জাম্প এবং হাই জাম্পে অংশ নিতাম,” বলেন কমল।

বর্তমানে প্রতিবন্ধী খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত একটি পশ্চিমবঙ্গ ফুটবল দলের হয়েও খেলেন কমল।
“মূল খেলা শুরু হওয়ার আগে আমরা একটি প্রদর্শনী ম্যাচ খেলি। তার জন্য আমাদের সামান্য পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। এই দলের প্রত্যেক খেলোয়াড়ই বিশেষভাবে সক্ষমদের আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্টে খেলেছেন,” জানান তিনি।
তবুও শুধুমাত্র খেলাধুলাই কমলের একমাত্র প্রকাশের মাধ্যম নয়। অবসর সময় বলতে যা সামান্য পান, সেই সময়ে নিজের ঘরের দেওয়ালেই কয়লার আঁচড়ে এঁকে চলেন বিভিন্ন মানুষের প্রতিকৃতি।
“আমি কখনও ছবি আঁকার প্রশিক্ষণ নিইনি। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকতে ভালোবাসি। গভীর রাতে, যখন গোটা শহর ঘুমিয়ে পড়ে, তখন আমার মনে যা আসে, তাই আঁকতে ভালো লাগে,” বলেন কমল।
তাঁর ছোট্ট ঘরের দেওয়ালজুড়ে রয়েছে শিব, গণেশ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং আরও অনেকের প্রতিকৃতি। সবকটি ছবিই তৈরি হয়েছে কয়লার আঁচড়ে।
জীবনে কমলের একটাই বড় আক্ষেপ। চোখ ঢেকে, চোখের জল সামলাতে সামলাতে তিনি বলেন, “আমি আন্তর্জাতিক স্তরে একাধিকবার ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছি। জাতীয় মঞ্চে বাংলারও প্রতিনিধিত্ব করেছি। কিন্তু সুস্থ ও নিরাপদ জীবনযাপনের জন্য কেউ কখনও আমাকে সাহায্য করেনি। ন্যূনতম জীবনধারণের খরচ চালাতে আমাকে একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করতে হয়।”
“কত সরকারি দফতরে গিয়েছি, কত মন্ত্রী ও ক্রীড়াবিদদের সঙ্গে দেখা করেছি, তার হিসেবও হারিয়ে ফেলেছি। তবু শেষ পর্যন্ত কিছুই হয়নি,” যোগ করেন কমল।

কমলের প্রিয় ক্রিকেটার সচিন তেন্ডুলকর। একবার নিজের আদর্শ ক্রিকেটারের সঙ্গে দেখা করার সুযোগও হয়েছিল তাঁর। পরে সচিন তাঁকে স্বাক্ষর করা একটি ছবি এবং একটি ছোট্ট নোট পাঠিয়েছিলেন।
“আমার নায়কদের সঙ্গে দেখা হয়েছে—বেশিরভাগের সঙ্গেই। আমি কিশোর কুমারের ভক্ত। কিন্তু সোনালি কণ্ঠের সেই মানুষটির সঙ্গে দেখা করার সময়টা আর হয়ে ওঠেনি,” বললেন কমল।
কথা বলতে বলতে তাঁর কণ্ঠ ধীরে ধীরে থেমে যায়। কিন্তু যা কখনও থেমে যায় না তা হল কমলের অফুরন্ত প্রাণশক্তি। সেই চালিকা শক্তিই তাকে সব সমস্যা ট্যাকেল করে জীবনের গোলপোস্টের দিকে এগিয়ে দেয় নিরন্তর।


