সহনশীলতার ইতিহাসের ধিমে আঁচে জন্ম নেওয়া মুরগির ঝাল কারি আর পুরনো কলকাতার ঐতিহ্যে অনুপ্রাণিত এক ককটেল—এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই এ বছরের বড়দিনের বিশেষ আয়োজন পার্ক স্ট্রিটের ট্রিঙ্কাসে।
এই বড়দিনে ট্রিঙ্কাস আপনার প্লেটে তুলে দিচ্ছে এক ঝাল মুরগির পদ, যা সীমান্ত পেরিয়ে এসেছে, আর টিকে থেকেছে সময়ের কঠিন পরীক্ষায়।
প্রায় এক শতাব্দী ধরে কলকাতার খাদ্যসংস্কৃতি ও সঙ্গীতজগতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকা পার্ক স্ট্রিটের এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানটি এ বছর তাদের ৯৮তম বড়দিন উদ্যাপন করতে চলেছে—রেঙ্গুনের এক সময়ের স্মৃতিতে জারিত অসংখ্য স্বাদের সম্ভারে।
সুইস বেকার মিস্টার ট্রিনকা এই প্রতিষ্ঠানটি শুরু করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে পুরী ও জোশুয়া পরিবার এর দায়িত্ব নেয়।
জোশুয়া পরিবার এক দাঙ্গা বিধ্বস্ত রেঙ্গুন থেকে একসময় সুদূর কলকাতায় পাড়ি দিয়েছিল—সঙ্গে এনেছিল এক প্রাচীন পারিবারিক রেসিপি, যা আজ আবার নতুন করে ফিরছে।
ট্রিঙ্কাস এর তৃতীয় প্রজন্মের কর্ণধার আনন্দ পুরী জানান, সহনশীলতার শিকড়ে প্রোথিত বড়দিনের বিশেষ পদ এই বিশেষ চিকেন কারিটি আবার ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত এসেছে তাঁদের পারিবারিক যাত্রাকে সম্মান জানানোর ইচ্ছা থেকেই। তিনি বলেন,
“শহুরে কিংবদন্তি আর উত্তরাধিকার মিলিয়েই এই ব্র্যান্ডকে ঘিরে যে অসাধারণ গল্প তৈরি হয়েছে, যা শহরের মানুষের কথাবার্তায় উঠে আসে বারবার। সেই গল্পের ধারাকে আরও কিছুটা এগিয়ে নিয়ে যেতে এ বছরের বড়দিনের স্পেশালের মাধ্যমে আপনাদের সামনে আরও একটি গল্প তুলে ধরা একেবারেই যথাযথ।”
এই গল্পের শুরু ১৯৪০-এর দশকে। সেই সময় এলিস জোশুয়া তাঁর বাবা-মা ও সাত ভাইবোনের সঙ্গে রেঙ্গুনে থাকতেন।
রাজনৈতিক অস্থিরতা যখন গোটা অঞ্চলকে গ্রাস করে, তখন হাজার হাজার পরিবার সবকিছু ফেলে রেখে নিরাপত্তার খোঁজে বেরিয়ে পড়তে বাধ্য হয়। এলিস ও তাঁর পরিবারও মাসের পর মাস ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে হেঁটে শেষে কলকাতায় পৌঁছোন—নিজেদের বলতে গেলে প্রায় কিছুই ছিল না।
তখনই জন্ম চিমু আন্টির চিকেন কারির।
সেই সময় খাবারের ছিল তীব্র অভাব। কিন্তু পরিবারের এক আত্মীয়া, যিনি স্নেহভরে পরিচিত ছিলেন ‘চিমু আন্টি’ নামে, প্রায় কিছু না থাকা সত্ত্বেও ভরপেট খাবার তৈরি করার একটি পথ খুঁজে পান।
আনন্দ স্মৃতিচারণা করে বলেন, “তিনি জানতেন তাঁর পরিবার ঝাল খুব ভালোবাসে। বাজার থেকে তিনি মুরগির সস্তা কাটা অংশ কিনতেন। শুধু রসুন আর প্রচুর কাঁচালঙ্কা ব্যবহার করেই তিনি বানাতেন এক আগুনে ঝাল চিকেন কারি।
কারিটি এতটাই ঝাল ছিল যে, তার সঙ্গে খেতে হতো বিশাল পরিমাণ ভাত। অল্প উপকরণেই এভাবে বড় একটি পরিবারকে তৃপ্তি করে খাওয়ানো যেত।”
বছরের পর বছর এই সহজ রান্নার প্রণালী পরিবারের সাথে সাথে ঘুরে বেড়িয়েছে, নৈশভোজের আড্ডায় জায়গা পেয়েছে, মহাদেশ পেরিয়েছে, আর শেষ পর্যন্ত এসে ঠাঁই পেয়েছে ট্রিঙ্কাসের মেনুতে। আনন্দ বলেন, “কলকাতার দরজায় যখন শীত কড়া নাড়ছে, আর জীবনে একটু ঝালের প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছে, তখনই চিমু আন্টির চিকেন কারির প্রত্যাবর্তন। আমরা মুরগির আরও ভালো কাট ব্যবহার করছি, কিন্তু আসল রেসিপির ঝাঁজ একেবারেই কমানো হচ্ছে না।
সাবধান থাকাই ভালো, এই নেশাধরানো পদ আপনাকে দীর্ঘ সময় ধরে গরম রাখবে।”
আর বড়দিনের স্বাদে ককটেল তো মাস্ট, তাই এই ঝাল চিকেন কারির সঙ্গে জুটি বাঁধতে ট্রিঙ্কাস নিয়ে এসেছে একটি নতুন ককটেল, নাম —‘ক্রিসমাস কেক’।
আনন্দ হাসতে হাসতে বললেন, “এর স্বাদ ঠিক যেমন নাম, তেমনই।”
মশলাদার রাম আর উষ্ণ, চেনা স্বাদের মিশেলে এই ককটেল পুরনো কলকাতার বাড়িঘরে ছড়িয়ে থাকা একসময়ের উৎসবের ঘ্রাণ আর বেকিংয়ের উষ্ণতার প্রতি এক শ্রদ্ধার্ঘ্য।
সব শেষে আনন্দ বলেন, “এই বড়দিনে আমাদের মেনুর স্পেশাল পদগুলি কলকাতার বর্ণময় অতীত এবং রন্ধনসংস্কৃতিতে ট্রিঙ্কাসের অবদানের প্রতি এক আন্তরিক শ্রদ্ধার্ঘ্য—যেমনটা আমাদের পুরো মেনুটাই।”


