বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে ঘড়ির কাঁটা ঘুরতেই একসঙ্গে বেজে উঠল ঘণ্টাধ্বনি—প্রথমে কোয়ার্টার চাইম, তারপর পাঁচটি ডং।
শতাব্দীপ্রাচীন এই ঘড়ির ঘণ্টাধ্বনি, যা এক দশক আগে থেমে গিয়েছিল, আবার তার ধ্বনি শোনার মুহূর্তটি অনেকের কাছেই ছিল গভীর নস্টালজিয়ায় ভরা।
“পুরোনো স্মৃতি ফিরে এল। আমি অভিভূত,” বললেন এম লিলারাম অ্যান্ড কোং-এর বিবেক লিলারাম। ১৯২৭ সালে নিউ মার্কেটে প্রতিষ্ঠিত এই গয়নার দোকান বহু প্রজন্মের সাক্ষী। অন্যদিকে, প্রথমবার ঘণ্টাধ্বনি শোনা কলেজছাত্রী রোশনি চ্যাটার্জির কথায়, “এটা যেন জাদুর মতো। হঠাৎ ঘড়ি বেজে উঠতেই চারপাশের পরিবেশটাই বদলে গেল।”
নিউ মার্কেটের ঐতিহ্যবাহী টাওয়ার, যেখানে চারমুখী গিলেট অ্যান্ড জনস্টন ওয়েস্টমিনস্টার ঘড়িটি দীর্ঘদিন অবহেলা ও বিকল অবস্থায় পড়ে ছিল, গত ১০ ফেব্রুয়ারি ফের সচল হয়ে উঠল। এর মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ হল সংস্কার প্রকল্পের কাজ। এই দায়িত্ব সামলেছেন দুই বাবা-ছেলের জুটি—স্থাপত্য সংস্থা অ্যাপ্রোপ্রিয়েট অলটারনেটিভ-এর অঞ্জন মিত্র ও সপ্তর্ষি মিত্র সম্পন্ন করেছেন কাঠামো সংস্কারের কাজ আর স্বপন দত্ত ও সত্যজিৎ দত্ত পুনরুজ্জীবিত করেছেন ঘড়ি ও তার ঘণ্টাধ্বনি ব্যবস্থা।
টেকনো ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কোং লিমিটেড এই ৪৪ লক্ষ টাকার প্রকল্পে অর্থ বিনিয়োগ করেছে, যার মধ্যে ঘড়ির জন্য ব্যয় হয়েছে ৬ লক্ষ টাকা। সংস্থার সিএসআর প্রধান হিনা গোরসিয়ার কথায়, “ভারতে থাকা এ ধরনের মাত্র চারটি ঘড়ির একটির পুনরুদ্ধারে অংশ নিতে পেরে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত।” বাকি তিনটি ঘড়ি রয়েছে আইআইইএসটি শিবপুর, মুম্বইয়ের লোয়ার প্যারেল রেলওয়ে ওয়ার্কশপ এবং চেন্নাই মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনে।
কলকাতা রেস্টোরার্স-এর মুদার পাথেরিয়া, যিনি এই প্রকল্পের স্বপ্নদ্রষ্টা, বলেন, “এই ঐতিহ্যচিহ্নের পুনরুদ্ধার আশপাশের এলাকায় নতুন প্রাণ সঞ্চার করবে বলে আমরা আশাবাদী।” ক্ষতিগ্রস্ত টাওয়ারের সংস্কারকাজ শুরু হয় ২৪ জুলাই ২০২৫-এ এবং পাঁচ মাসে সম্পন্ন হয় ২২ ডিসেম্বর ২০২৫-এ।
টাওয়ারের সংস্কার শেষ হলেও এখনো বাকি রয়ে গেছিল বহিরঙ্গের পুনর্নবীকরণ, যা ২০২৬ সালের জানুয়ারির শুরুর মধ্যে সম্পূর্ণ করার কথা হয়। পাশাপাশি, বহুল প্রতীক্ষিত ঐতিহ্যঘড়িটি আনুষ্ঠানিকভাবে সক্রিয়করণের সময়সীমা ধার্য করা হয়েছিল ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে।
এরপর সেই মতো ঘড়ির উপর কাজ শুরু হয় এবং কয়েক সপ্তাহ আগে তা সম্পূর্ণ হয়। ১০ ফেব্রুয়ারি, মঙ্গলবার কলকাতা পুরসভাকে হস্তান্তরের আগে দুটি ট্রায়াল রান করা হয়, যার মধ্যে শেষটি হয় ৮ ফেব্রুয়ারি, শনিবার। স্বপন দত্ত জানান, “ঘড়ি ও তার ঘণ্টাধ্বনি ব্যবস্থা এখন সচল। তবে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি। সপ্তাহে তিনবার ঘড়িতে দম দিতে হবে।”


