Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

দার্জিলিং টয় ট্রেনের প্রথম মহিলা টিটিই হলেন, সরিতা ইয়োলমো

UNESCO-র হেরিটেজ তালিকাভুক্ত দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে (ডিএইচআর)–এর ১৪৫ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন মহিলা ট্রাভেলিং টিকিট এক্সামিনার (টিটিই) দায়িত্ব নিলেন। এই পদে নিযুক্ত হয়েছেন সরিতা ইয়োলমো, যিনি নর্থ ইস্ট ফ্রন্টিয়ার রেলওয়ে-এর অভিজ্ঞ কর্মী। গত ৫ ফেব্রুয়ারি তিনি আইকনিক নিউ জলপাইগুড়ি–দার্জিলিং রুটে প্রথম বারের জন্য দায়িত্ব পালন করেন।

১৮৮১ সালে রেলপথ চালু হওয়ার পর থেকে এই পদটি এতদিন শুধুমাত্র পুরুষদের দখলেই ছিল।
৫৫ বছর বয়সি সরিতা জানান, “আমি বহু বছর কার্সিয়াংয়ের রেলওয়ে প্রিন্টিং প্রেসে কাজ করেছি। প্রেস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সমস্ত কর্মীদের বিভিন্ন জায়গায় বদলি করা হয়। ২০১৯ সালে আমিও নিউ জলপাইগুড়িতে বদলি হয়ে আসি। প্রথমে ঘোষণাকারী হিসেবে কাজ শুরু করি, পরে অনুসন্ধান কাউন্টারে এবং তারপর টিকিট পরীক্ষক হিসেবে কাজ করি।”

রেলওয়ে প্রিন্টিং প্রেসে যোগদানের আগে তিনি অল্প সময়ের জন্য তিনধারিয়ার রেল হাসপাতালেও কাজ করেছিলেন।

টিকিট পরীক্ষক হিসেবে তিনি নিউ জলপাইগুড়ি থেকে ব্রডগেজ ট্রেনে বিস্তর সফর করেছেন।
৫ ফেব্রুয়ারি তাঁকে নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত ডিএইচআর সেকশনে ট্রেন টিকিট পরীক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, “ডিএইচআরে টিটিই হিসেবে দায়িত্ব পেয়ে আমি যেমন রোমাঞ্চিত ছিলাম, তেমনই ভীষণ চাপও অনুভব করেছি। কারণ অন্য ট্রেনে আমার সঙ্গে আরও অনেক টিটিই সহকর্মী থাকেন, কিন্তু এখানে আমি একাই ছিলাম। তার ওপর নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত ১০ ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রায় এত যাত্রীর দায়িত্ব নেওয়া—এটা আমার জীবনে একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা।”
সোনাদা হাইস্কুল থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে তিনি দার্জিলিং কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু ১৯৯১ সালে চাকরি পাওয়ার পর প্রথম বর্ষ থেকেই আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি।

তাঁর স্বামী দাওয়া ইয়োলমো, যিনি এক বছর আগে তিনধারিয়ার রেলওয়ে ওয়ার্কশপ থেকে সিনিয়র সেকশন ইঞ্জিনিয়ার পদে অবসর নিয়েছেন, বলেন, “সরিতা শুধু একজন নিবেদিতপ্রাণ রেলকর্মীই নন, তিনি সমানভাবে একজন দায়িত্বশীল মা ও স্ত্রী। এখন তিনি প্রথম মহিলা ট্রেন টিকিট কালেক্টর হওয়ায় তাঁর কাঁধে আরও একটি নতুন দায়িত্ব যুক্ত হয়েছে।”

ডিএইচআরের ডিরেক্টর ঋষভ চৌধুরী বলেন, “আমরা সরিতার জন্য গর্বিত এবং তাঁর সাফল্যের জন্য শুভেচ্ছা জানাই।”

ভারতীয় রেলওয়েস গত কয়েক বছরে অপারেশনাল পদে মহিলাদের অংশগ্রহণ ধারাবাহিকভাবে বাড়িয়েছে—মহিলা লোকোমোটিভ পাইলট, গার্ড ও স্টেশন মাস্টারের মতো পদে তাঁদের উপস্থিতি বেড়েছে। তবে ঐতিহ্যবাহী ও পাহাড়ি পরিষেবাগুলি ঐতিহাসিকভাবে পুরুষ-প্রধানই ছিল, মূলত দুর্গম ভূপ্রকৃতি, দীর্ঘ ডিউটি সাইকেল এবং পুরোনো কর্মী নিয়োগ পদ্ধতির কারণে।

১৮৮১ সালে রেলপথ চালুর পর থেকে ‘টয় ট্রেন’-এ এই প্রথম কোনও মহিলা, টিকিট পরীক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হলেন।

দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে কেবল একটি পরিবহণ ব্যবস্থা নয়। সরু গেজের এই রেলপথ চা-বাগান, বাজার ও গ্রাম অতিক্রম করে লুপ ও জিগজ্যাগ পেরিয়ে পাহাড়ি শহর দার্জিলিংয়ে পৌঁছায়—যাকে প্রায়ই ‘পাহাড়ের রানি’ বলা হয়। ১৯৯৯ সালে ‘মাউন্টেন রেলওয়েজ অফ ইন্ডিয়া’-র অন্তর্ভুক্ত হয়ে এই রেলপথ ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ স্থানের স্বীকৃতি পায়।

মহিলা টিটিই হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে সরিতা বলেন, “যাত্রীরা যখন আমাকে টিটিই-র পোশাকে টিকিট পরীক্ষা করতে দেখেন, তখন তাঁরা কৌতূহলী হয়ে ওঠেন। সেই থেকেই একটা মানবিক বন্ধনের সূচনা হয়। তারপর শুরু হয় ছবি তোলার পালা।”

তবে রেল পরিষেবার নিয়ম অনুযায়ী, সরিতাকে অন্যান্য ট্রেনেও টিটিই হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

শুক্রবার দুপুরে তাঁকে নিউ জলপাইগুড়ি থেকে ত্রিপুরা সুন্দরী এক্সপ্রেস ধরতে হবে টিটিই হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য।

নিজের পথচলা নিয়ে তিনি বলেন, “কার্সিয়াংয়ের রেল প্রেসের মানি ভ্যালু সেকশনে কাজ করে আমি খুশিই ছিলাম। কিন্তু ভাগ্যে অন্য কিছু লেখা ছিল। প্রেস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর নিউ জলপাইগুড়িতে বদলি হয়ে আমাকে নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে হয়। যদি আমি নিউ জলপাইগুড়িতে নর্থ ইস্ট ফ্রন্টিয়ার রেলওয়ের বাণিজ্যিক বিভাগে যোগ না দিতাম, তাহলে এই নতুন সুযোগগুলো পেতাম না। এখন পিছনে ফিরে তাকালে আমি ভীষণ খুশি।”

যেকোনও একটি কাজ যখন একজন নারী সফলভাবে সম্পাদন করেন, তখন সেই কাজ নারীরা করতে পারেন কি না—এই প্রশ্নটাই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। ১৪৫ বছরের ইতিহাস পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মাটি দেখবে নতুন উত্তর।
ঔপনিবেশিক অবকাশযাপন, চা-বাগান আর সিনেম্যাটিক রোমান্টিকতা ঘিরে গড়ে ওঠা ছোট্ট পাহাড়ি শহরে আজকের সবচেয়ে আধুনিক ছবি—ঐতিহ্যবাহী কোচের ভেতর ইউনিফর্ম পরা এক নারী, জানালার বাইরে বাষ্প উড়তে উড়তে এগিয়ে চলেছে ট্রেন, আর তিনি দৃঢ়ভাবে টিকিট পরীক্ষা করে চলেছেন।