অনেক আন্দোলন, আইন প্রণয়ন, ইত্যাদি প্রভৃতির পরও তৃতীয়লিঙ্গের মানুষদের এখনও সাধারণ মানুষের সমাজে অন্তর্ভুক্তি অনেকাংশেই অধরা থেকে গেছে। একথা যেমন সত্যি, ঠিক সেভাবেই একটাও সত্যি যে এক ২১ বছরের বাঙালী তরুণের হাত ধরেই ২০১৭ তে দক্ষিণ কলকাতার
বাঁশদ্রোণীতে চারটি পাবলিক টয়লেটে যুক্ত হয়েছিল ‘ত্রিধারা’—ট্রান্সজেন্ডারদের জন্য পৃথক পরিসর।
ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিরা কীভাবে পোশাক পরবেন—এই বিতর্ক যখন আরও তীব্র হচ্ছিল, ঠিক সেই সময় কলকাতার দক্ষিণ প্রান্তে এক ২১ বছরের ছাত্র নীরবে শুরু করেছিলেন এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পরিবর্তন। তাঁর উদ্যোগে দক্ষিণ কলকাতার বাঁশদ্রোণী এলাকার চারটি পাবলিক টয়লেটে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য আলাদা শৌচাগারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
ওয়ার্ড নম্বর ১১২-এর এই চারটি পাবলিক টয়লেটে এখন ‘লেডিজ’ ও ‘জেন্টস’-এর পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে আরেকটি কক্ষ—যার গায়ে লেখা ‘ত্রিধারা’। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতীকের মাধ্যমে চিহ্নিত এই কক্ষটি ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের জন্য নির্দিষ্ট।
এই উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছেন শোভন মুখার্জি। ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের নানা সমস্যার কথা জানতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, আলাদা পাবলিক টয়লেটের অভাব তাদের দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম বড় বাধা। এরপরই তিনি নিজের প্রস্তাব নিয়ে ওয়ার্ড কাউন্সিলর অনিতা কর মজুমদারের কাছে যান। কাউন্সিলর বিষয়টির গুরুত্ব বুঝে দ্রুত অনুমতি দেন এবং আলাদা সাইনেজ বসানোর ব্যবস্থা করেন।
শোভন বলেন, “আমি আমার সামান্য ক্ষমতার মধ্যেই কমিউনিটির জীবন একটু সহজ করতে চেয়েছিলাম। কাউন্সিলরকে ধন্যবাদ, তিনি বিষয়টি আন্তরিকভাবে বুঝেছিলেন।”
তরুণ শোভনের উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে অনিতা কর মজুমদার বলেন, “ওকে কুর্নিশ জানাই—এমন সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ ভাবনা আমাদের অনেকের মাথাতেই আসে না। এখন পর্যন্ত তৃতীয় লিঙ্গের জন্য টয়লেট নির্দিষ্ট করা নিয়ে কেউ কোনও সমস্যা করেনি। ভবিষ্যতে কেউ করলে, আমি ব্যক্তিগতভাবে হস্তক্ষেপ করব এবং এই প্রকল্পে কোনও বাধা আসতে দেব না।”
টাইমস অব ইন্ডিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় স্যানিটেশন মন্ত্রক ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী শৌচাগার ব্যবহারের নির্দেশিকা জারি করলেও বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা পাবলিক ও নিরাপত্তাকর্মীদের কাছ থেকে আজও হয়রানি ও শত্রুতার মুখে পড়েন।
এই চারটি টয়লেটের মধ্যে দু’টি পাবলিক টয়লেট কমপ্লেক্স মাস্টারদা সূর্য সেন ও গীতাঞ্জলি মেট্রো স্টেশনের পাশে অবস্থিত। এলাকায় মোট পাঁচটি পাবলিক টয়লেট কমপ্লেক্স রয়েছে। তবে একটি ব্লকে মাত্র দু’টি শৌচাগার থাকায় সেখানে তৃতীয় লিঙ্গের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি।
এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগে আপ্লুত শহরের এলজিবিটিকিউআই (LGBTQI) কমিউনিটির সদস্যরা শোভনের প্রতি অকুণ্ঠ প্রশংসা বর্ষণ করেছেন—কারণ সেইসময় তিনি কোনও সক্রিয় সমাজ কর্মী ছিলেন না, না তিনি নিজে এই কমিউনিটির সদস্য।
পশ্চিমবঙ্গ ট্রান্সজেন্ডার বোর্ডের সদস্য ও ট্রান্সজেন্ডার অধিকারকর্মী রঞ্জিতা সিনহা বলেন, “সরকারি প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাদা পাবলিক টয়লেটের বিষয়টি নিয়ে বহুবার আলোচনা করেছিলাম। শোভন সেসময় সদ্য গ্রাজুয়েট ছাত্র, কোনও অ্যাক্টিভিস্টও নন—তাই যখন তিনি বিষয়টি তুললেন, প্রথমে ভাবছিলাম তিনি কতটা সিরিয়াস। কিন্তু তাঁর উদ্যোগে আমি সত্যিই বিস্মিত। এমনকি কমিউনিটির জন্য তিনি যে শব্দটি তৈরি করেছেন, সেটিও অত্যন্ত যথাযথ। এই উদ্যোগ নন্দন কিংবা বড় শপিং মলের মতো ব্যস্ত জায়গা সহ সব পাবলিক টয়লেটে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত।”
তৃতীয় লিঙ্গের টয়লেটের পাশাপাশি ২০৫ এবং ২০৫এ বাসে তৃতীয় লিঙ্গের আলাদা বসার সীট ও নির্ধারিত হয়েছিল শোভনের উদ্যোগে। পরবর্তী কালে পাবলিক টয়লেটে মহিলাদের জন্য স্যানিটারী ন্যাপকিন উপলব্ধ করানো ও গ্রামীণ এলাকায় সচেতনতা প্রসারের কাজ করে বাংলার প্যাডম্যান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন শোভন।
কলকাতার এক তরুণের এই মানবিক পদক্ষেপ দেখিয়ে দিয়েছে—সংবেদনশীলতা আর সদিচ্ছা থাকলে সামাজিক পরিবর্তনের জন্য বড় পরিচয় বা ক্ষমতার প্রয়োজন হয় না।


