দুই শতাব্দী প্রাচীন এক প্রাসাদ, যা একসময় মা ও শিশুর হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহৃত হত—২৬ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশ করল এক নতুন রূপে।
২৫০ শয্যার সুপারস্পেশালিটি বেসরকারি হাসপাতাল হিসেবে পথচলা শুরু করল চার্নক লোহিয়া হাসপাতাল।
রবীন্দ্র সরণিতে অবস্থিত এই ঐতিহ্যবাহী ভবনই এখন শহরের নতুন স্বাস্থ্যকেন্দ্র।
প্রায় ২০০ বছর আগে যেখানে আয়োজিত হত নৃত্যানুষ্ঠান, সেই রাজকীয় বলরুম আজ রূপান্তরিত হয়েছে অত্যাধুনিক আইসিইউ-তে। আর একসময়ের কর্মী কোয়ার্টার এখন রোগীদের জন্য আরামদায়ক প্রাইভেট কেবিন।
বড়বাজারে অবস্থিত প্রাক্তন লোহিয়া মাতৃ সেবা সদন-এর নতুন নামকরণ হয়েছে চার্ণক লোহিয়া হাসপাতাল।
৯ মার্চ থেকে হাসপাতালের পরিষেবা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে। উল্লেখ্য, এই হাসপাতাল ভবনটি গ্রেড–ওয়ান হেরিটেজ স্ট্রাকচার হিসেবে স্বীকৃত।
চার্ণক হাসপাতালের ম্যানেজিং ডিরেক্টর প্রশান্ত শর্মা জানান, “১৫ মাসে আমরা পুরো কাজ শেষ করেছি। গ্রেড–ওয়ান ঐতিহ্যবাহী ভবন সংরক্ষণের যে নিয়মাবলি রয়েছে, সে সম্পর্কে অভিজ্ঞ স্থপতিদের পরামর্শ নিয়েই পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে।”
নিওক্লাসিক্যাল গ্রিকো–রোমান স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই প্রাসাদটির প্রবেশপথে রয়েছে বিশাল স্তম্ভ ও ওপরে উঠে যাওয়ার প্রশস্ত সিঁড়ি।
উনিশ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে এটি ছিল মল্লিক ও শীল পরিবারের আবাসস্থল। নিমতলা ঘাটের কাছাকাছি রবীন্দ্র সরণির চার বিঘা জমির উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য।
১৯৪০ সালে একদল শিল্পপতি ভবনটি অধিগ্রহণ করেন এবং এক বছর পর এটিকে ‘লোহিয়া মাতৃ সেবা সদন’ নামে ভর্তুকিযুক্ত প্রসূতিকালীন হাসপাতালে রূপান্তরিত করা হয়। পরে ২০১৬-১৭ সাল নাগাদ হাসপাতালটি বন্ধ হয়ে যায়।
এর সাত বছর পর, চার্নক হাসপাতাল দীর্ঘমেয়াদি লিজে সম্পত্তিটি গ্রহণ করে। সংস্থাটি ইতিমধ্যেই বিমানবন্দরের কাছে তেঘরিয়ায় একটি হাসপাতাল পরিচালনা করছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন এই প্রকল্পের ঘোষণা করা হয়।

শর্মা বলেন, “এই নতুন হাসপাতাল ঐতিহ্য ও স্বাস্থ্যসেবার এক অনন্য সংমিশ্রণ। গ্রেড–ওয়ান হেরিটেজ হওয়ায় ভবনের বহির্ভাগে সামান্যতম পরিবর্তনও করা যায় না। আমরা এই সুন্দর স্থাপত্যের আসল সত্তাকে অক্ষুণ্ণ রেখেছি, কেবল ব্যবহারিক পরিবর্তন এনেছি”।
তিনি আরও জানান, “কাঠের বিমের পরিবর্তে স্টিলের সাপোর্ট বসানো হয়েছে এবং ২০ ফুট উঁচু সিলিং নতুন করে সংস্কার করা হয়েছে। মূল মেঝে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ৩০ ইঞ্চি পুরু ছিদ্রযুক্ত দেওয়াল, যা শীতকালে ঘরকে উষ্ণ ও গ্রীষ্মকালে শীতল রাখে, তাতে কোনোরকম হস্তক্ষেপ করা হয়নি”।
শহরের একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের জন্মসনদে লোহিয়া হাসপাতালের নাম রয়েছে। তাঁদের মধ্যে শিল্পপতি এল.এন. মিত্তলের নাম উল্লেখযোগ্য। অতীতের স্মৃতি সংরক্ষণে একতলার একটি ছোট ঘরকে মিনি মিউজিয়ামে রূপান্তরিত করা হয়েছে, যেখানে জন্মসনদ থেকে পুরনো এক্স-রে মেশিন—বিভিন্ন স্মারক প্রদর্শিত হচ্ছে।
এই হাসপাতাল সংকটজনক রোগীদেরও পরিষেবা দেবে। তিনতলা বাড়িটিতে রয়েছে ৯০টিরও বেশি ওয়ার্ড বেড, ২০টি প্রাইভেট কেবিন এবং বিভিন্ন ক্রিটিক্যাল কেয়ার এর জন্য ৮০টি আইসিইউ শয্যা। দ্বিতীয় তলায় রয়েছে শিশু বিভাগ, যার অন্তর্ভুক্ত নবজাতক আইসিইউ।
হাসপাতালে আধুনিক অপারেশন থিয়েটার, ক্যাথ ল্যাব, ১০ শয্যার জরুরি বিভাগ, ১০ শয্যার ডায়ালিসিস ইউনিট এবং উন্নত ডায়াগনস্টিক ও ইমেজিং পরিষেবা রয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন একাধিক গণ্যমান্য ব্যক্তি। কলকাতার মেয়র ও রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী, ফিরহাদ হাকিম, হাসপাতালটির উদ্বোধন করেন এবং একে “শহরের মুকুটে নতুন পালক” বলে অভিহিত করেন।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী শশী পাঁজা, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, সুজিত বোস, রাজ্যসভার সাংসদ দোলা সেন এবং জোড়াসাঁকোর বিধায়ক বিবেক গুপ্তা।
প্রশান্ত শর্মা বলেন, “হাসপাতালটির আশেপাশে উন্নতমানসম্পন্ন বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার অভাব রয়েছে। বড়বাজার, জোড়াসাঁকো, নিমতলা ঘাট স্ট্রিট ও বিবেকানন্দ রোডের বাসিন্দাদের চিকিৎসার জন্য প্রায়ই দক্ষিণ কলকাতা বা সল্টলেকে যেতে হয়। আমরা আশা করি, শহরের এই অংশের স্বাস্থ্যপরিষেবার প্রয়োজন এবার মেটাতে পারব।”
ঐতিহ্যের আবহে আধুনিক চিকিৎসা—চার্নক লোহিয়া হাসপাতালের এই নতুন অধ্যায় শহর কলকাতার স্বাস্থ্যপরিসেবায় এক তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন হয়ে উঠবে বলেই আশা করা হচ্ছে।


