কলকাতার পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ শহরের আইকনিক ট্রাম পরিষেবা। শহরের ফুচকা ও রসগোল্লার মতোই সমান জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী।
২৪ ফেব্রুয়ারি শহর উদ্যাপন করল এই ঐতিহাসিক পরিবহণ ব্যবস্থার ১৫৩ বছর পূর্তি। একসময় যে ট্রাম নেটওয়ার্ক ছিল শহরের যাতায়াতের মেরুদণ্ড, আজও তা বহন করে চলেছে অতীতের স্মৃতি ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকার।
এই বিশেষ দিনটি স্মরণীয় করে তুলতে তাজা ফুলে সাজানো একটি ভিনটেজ ট্রাম শহর জুড়ে যাত্রা করে, দৃশ্যটি ছিল সত্যিই মনোমুগ্ধকর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ঐতিহ্যবাহী কাঠের ট্রাম ‘গীতাঞ্জলি’ সারাদিন কলকাতার রাস্তায় ছুটে বেড়িয়ে, উদ্যাপন করে সেই উত্তরাধিকার, যা বহুদিন ধরেই শহরের সাংস্কৃতিক বুনোটের অংশ।
ট্রাম নং ৪৯৮,‘গীতাঞ্জলি’ ট্রামটি মঙ্গলবার সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে গড়িয়াহাট ডিপো থেকে তার উদ্যাপনী যাত্রা শুরু করে।
তারপর এটি এসপ্ল্যানেড অতিক্রম করে শ্যামবাজারের দিকে এগিয়ে যায়। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকতে বহু ট্রামপ্রেমী উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের চোখে-মুখে ছিল উচ্ছ্বাস ও আবেগ।

কলকাতায় প্রথম ট্রাম চালু হয় ২৪ ফেব্রুয়ারি, ১৮৭৩ সালে। এর ফলে এটি এশিয়ার প্রাচীনতম সচল ট্রাম নেটওয়ার্ক হিসেবে স্বীকৃত। প্রথমদিকে এটি ছিল ঘোড়ায় টানা পরিষেবা, যা তৎকালীন কলকাতায় শিয়ালদহ থেকে আর্মেনিয়ান ঘাট পর্যন্ত চলত।
এই ঐতিহাসিক মাইলফলককে স্মরণীয় করে রাখতে ট্রামপ্রেমীরা সুসজ্জিত এই ভিনটেজ ট্রামের পতাকা উড়িয়ে,মঙ্গল শাঁখ বাজিয়ে, অনুষ্ঠানের সূচনা করেন, যা বর্তমানে চালু থাকা দুই রুটে পূর্ণ এক চক্কর সম্পন্ন করে। যাত্রী ও ট্রাম-অনুরাগীরা ট্রামের ভেতরে সমবেত হয়ে জন্মদিনের কেক কাটেন এবং ছোট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন—নস্টালজিয়া ও আন্দোলনের বার্তা মিলেমিশে একাকার হয়ে ওঠে সেই আয়োজনে।
এদিন ট্রাম ব্যবহারকারী ও পরিবহণ আন্দোলনকারীরা শহরের গুরুত্বপূর্ণ করিডরে ট্রাম পরিষেবা পুনরুদ্ধারের দাবি নতুন করে তুললেন।
বর্তমানে ট্রাম চলাচল সীমাবদ্ধ মাত্র দুটি খণ্ডিত রুটে—শ্যামবাজার–ধর্মতলা এবং গড়িয়াহাট–ধর্মতলা। তার ওপর পরিষেবাও চলছে অনিয়মিতভাবে। যাত্রী সংগঠনগুলির বক্তব্য, ক্রমশ সঙ্কুচিত এই নেটওয়ার্ক শহরের পরিবহণ সংকটকে আরও গভীর করছে। তাঁদের দাবি, কঙ্কালসার পরিষেবা সত্ত্বেও ট্রামে এখনও নিয়মিত যাত্রীসমাগম হচ্ছে, যা এই প্রায় শূন্য হয়ে যাওয়া পরিবহণ ব্যবস্থার প্রতি সুপ্ত চাহিদারই প্রতিফলন।
ক্যালকাটা ট্রাম ইউজার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দেবাশিস ভট্টাচার্য বলেন, “এত পরিচ্ছন্ন এক পরিবহণ ব্যবস্থা, যার পরিকাঠামো প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে, সেটিকে ধীরে ধীরে ভেঙে ফেলা অত্যন্ত দুঃখজনক।”

সোমবারের অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল ট্রাম কার নম্বর ৪৯৮—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নোনাপুকুর কর্মশালায় নির্মিত কাঠের বডিযুক্ত একটি বগি। ট্রাম ইতিহাস-গবেষক সাগ্নিক গুপ্ত জানান, এই বগিটি নির্মিত হয়েছিল অত্যন্ত অসাধারণ পরিস্থিতিতে। তাঁর কথায়, “তৎকালীন ব্রিটিশ শহর কলকাতায় জাপানি বিমান হানার আশঙ্কা এবং লন্ডনে অবস্থিত ক্যালকাটা ট্রামওয়েজ কোম্পানির সদর দপ্তরের কঠোর সময়সীমার চাপে শ্রমিকেরা রাতের অন্ধকারে মোমবাতির আলোয় এই এল-ক্লাস ট্রামগুলি নির্মাণ করেছিলেন।”
চলমান ইতিহাস আর শহরের অনন্ত আকর্ষণের প্রতি এক কালজয়ী শ্রদ্ধার্ঘ্য হয়ে উঠেছিল ২৪ ফেব্রুয়ারির এই উদ্যাপন। শহরের রাস্তায় ধীরে চলা ট্রামের টংটং শব্দ যেন আজও স্মরণ করিয়ে দেয়—কলকাতার ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় নয়, ট্র্যাকের উপরেও যা সমানভাবে জীবন্ত।


