Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

রবীন্দ্র সরোবর বাঁচাতে এক নারীর একক লড়াই: আপসহীন সুমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প

ব্যস্ত মহানগর কলকাতা, আর দক্ষিণ কলকাতার হৃদয়ে অবস্থিত রবীন্দ্র সরোবর—জনপ্রিয় নাম লেক বা ঢাকুরিয়া লেক, যা শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সবুজ ও জলাভূমি অঞ্চল। প্রতিদিন ভোরে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ এখানে হাঁটতে আসেন, বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নেন, প্রকৃতির কাছে একটু শান্তি খুঁজে পান। কিন্তু এই প্রিয় লেক-কে বাঁচিয়ে রাখতে গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে একা লড়াই করে চলেছেন এক নারী—সুমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

একসময় তিনি ছিলেন শুধুই একজন সাধারণ মর্নিং ওয়াকার। আজ তিনি কলকাতার নাগরিক-পরিবেশ আন্দোলনের এক পরিচিত মুখ। আইনি জটিলতা এবং প্রাণনাশের হুমকি—সবকিছুকে উপেক্ষা করে তিনি লড়ে চলেছেন রবীন্দ্র সরোবরের পরিবেশ রক্ষার জন্য।

প্রায় দুই দশক আগে সুমিতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিদিন ভোরে হাঁটার জন্য রবীন্দ্র সরোবর এলাকায় আসা শুরু করেন। ধীরে ধীরে শুধু সহ-হাঁটাহাঁটি করা মানুষদের সঙ্গেই নয়, এই লেকের সঙ্গেও তার এক গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

১৯৯০-এর দশকে প্রথম যখন তিনি এই হ্রদকে কাছ থেকে দেখেন, তখন এর অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। কোনও রক্ষণাবেক্ষণ ছিল না, চারপাশে আবর্জনার স্তুপ জমতো। অনেক মানুষ ও তাদের পোষা প্রাণী খোলা জায়গায় মলত্যাগ করত। ফলে হ্রদের চারপাশে হাঁটাও প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল।

সুমিতা সেই সময়ের কথা স্মরণ করে বলেন, লেক-এর এই অবস্থা তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন—এই জলাধারকে রক্ষা করতে কিছু না কিছু করতেই হবে। এই সময়ে মর্নিং ওয়াকারদের মধ্যেই ছিলেন মেঘালয়ের প্রাক্তন রাজ্যপাল তথা রাজনীতিবিদ তথাগত রায়। তিনিই সুমিতাকে পরামর্শ দেন—মর্নিং ওয়াকারদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করে কর্তৃপক্ষের কাছে একটি আবেদন জমা দিতে।
প্রথমে ১০০টি স্বাক্ষর সংগ্রহ করার কথা থাকলেও সুমিতা প্রায় ১,০০০ জনের সমর্থন জোগাড় করেন। সেই আবেদন জমা পড়ার পর প্রশাসন নড়েচড়ে বসে এবং ধীরে ধীরে লেক-এর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শুরু হয়।

এই ঘটনাই সুমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বুঝিয়ে দেয়—নাগরিকদের ছোট উদ্যোগও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। সেইদিন থেকে আজও, সুমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিন শুরু হয় ভোর ৪টা ৩০ মিনিটে। বাড়ি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার হেঁটে তিনি সকাল ৫টা ৩০-এর মধ্যে রবীন্দ্র সরোবর পৌঁছে যান।

হাতে একটি কাঠের লাঠি নিয়ে তিনি প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে হ্রদের চারপাশে টহল দেন। কেউ আবর্জনা ফেললে বা পরিবেশ নষ্ট করলে তিনি সরাসরি প্রতিবাদ করেন। হকারদের সঙ্গে তর্ক করেন, প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং নাগরিকদের সচেতন করার চেষ্টা করেন। কখনও কখনও সন্ধ্যাতেও তিনি আবার সরোবর এলাকায় ফিরে আসেন পরিস্থিতি দেখতে।

সুমিতা দেবীর বাকি গল্প জানার আগে আসুন জেনে নি, রবীন্দ্র সরোবরের গুরুত্ব

প্রায় ১৯২ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত রবীন্দ্র সরোবর কলকাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সম্পদ। এর মধ্যে প্রায় ৭৩ একর জুড়ে রয়েছে জলাধার, আর বাকি অংশে রয়েছে নানা ধরনের গাছপালা ও সবুজ অঞ্চল।
এই এলাকায় ১১ হাজারেরও বেশি গাছ রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৭,৫০০টির বয়স ৭০ বছরেরও বেশি। ফলে এই অঞ্চল শহরের জন্য এক বড় অক্সিজেনের উৎস এবং প্রাকৃতিক কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।

এছাড়া সরোবরের চারপাশে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, উদ্ভিদ ও প্রাণীর বাস—যার মধ্যে রয়েছে স্থায়ী ও পরিযায়ী পাখিও। তাই কংক্রিটের শহরের মাঝখানে এটি যেন এক সবুজ আশ্রয়স্থল। এই কারণেই ১৯৯৭ সালে ভারত সরকারের পরিবেশ মন্ত্রক রবীন্দ্র সরোবরকে “জাতীয় হ্রদ” হিসেবে ঘোষণা করে।
তবুও গত দুই দশকে মানুষের বিভিন্ন অমানবিক কর্মকাণ্ডে এই হ্রদের পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
২০০৫-২০০৬ সালে হ্রদের সৌন্দর্যায়নের সময় জল ও মাটির সংযোগস্থল অর্থাৎ রিপেরিয়ান জোন কংক্রিট দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। এর ফলে শামুক ও ব্যাঙের মতো ছোট প্রাণী দ্রুত কমে যেতে শুরু করে। এতে হাঁস ও রাজহাঁসের খাদ্যশৃঙ্খলেও পরিবর্তন আসে।

আরও একটি বড় সমস্যা হল ধর্মীয় অনুষ্ঠান। প্রতি বছর ছট পূজার সময় লেক-এ বিপুল পরিমাণ তেল, ফুল, ফল এবং অন্যান্য উপাচার ফেলা হয়। এর ফলে জলের দূষণ বাড়ে এবং মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটে। এর পাশাপাশি আশপাশের ক্লাবগুলির রান্নাঘরের বর্জ্য, প্লাস্টিক, থার্মোকল এবং অপরিশোধিত নিকাশিও এই হ্রদের জলের মান নষ্ট করছে।

এই সমস্ত ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডের থেকে রবীন্দ্র সরোবর-কে রক্ষার লড়াইয়ে সুমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বহু আইনি পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। ২০০৭ সালে তিনি একটি বড় সাফল্য পান, যখন লেক-এর এলাকায় ভবঘুরে পশু ও পোষা প্রাণীর প্রবেশ বন্ধ করা সম্ভব হয়।

২০১৪ সালে তিনি জানতে পারেন রাজ্যের নগর উন্নয়ন দফতর একটি ৬০ ফুট চওড়া ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিকল্পনা করছে, যা সরোবরের উপর দিয়ে যাবে এবং প্রায় ৪০০টি গাছ কেটে ফেলতে হবে। তিনি দ্রুত বিষয়টি সংবাদমাধ্যমের সামনে আনেন। জনমতের চাপে শেষ পর্যন্ত সরকার সেই প্রকল্প থেকে সরে আসে। তবে এই আন্দোলনের কারণে সুমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে।

তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা তাকে টার্গেট করেছেন। হ্রদ এলাকায় হকারদের প্রবেশ ঠেকাতে গেলে তার সঙ্গে বহুবার সংঘর্ষ হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে তাকে শারীরিকভাবে আঘাত করার চেষ্টাও হয়েছে। এমনকি তার বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি মামলাও দায়ের করা হয়েছে—যেগুলি এখনও আদালতে চলছে। তবু সুমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রচেষ্টা অনেক নাগরিককে অনুপ্রাণিত করেছে। অনেকেই তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সরোবর রক্ষায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ কিছুটা কমেছে। বর্তমানে এখানে গাছ লাগানো বা স্বেচ্ছাসেবী পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর জন্য এনজিও, ছাত্রছাত্রী বা নাগরিকদের কলকাতা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট অথরিটির অনুমতি নিতে হয়।

পরিবেশবিদ ও গ্রিন টেকনোলজিস্ট সোমেন্দ্র মোহন ঘোষের মতে, রবীন্দ্র সরোবরের মতো পরিবেশ-সংবেদনশীল এলাকায় দূষণের মাত্রা যদি স্বাভাবিকের তিনগুণ বেশি থাকে, তাহলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এখানকার জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।

তিনি আরও বলেন, জাতীয় হ্রদের মর্যাদা পাওয়ার পরও এখানে এখনও কোনও পূর্ণাঙ্গ বিশেষজ্ঞ কমিটি নেই, যেখানে জীববৈচিত্র্য বা বৃক্ষরোপণ বিশেষজ্ঞরা থাকবেন। নাগরিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও পরিবেশ রক্ষায় বিশেষজ্ঞদের ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি।

সুমিতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বীকার করেন, অনেকেই তাকে বিভিন্ন অনিয়মের খবর দেন, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে এই লড়াইয়ে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে খুব কম মানুষই এগিয়ে আসেন। কারণ এতে সময় দিতে হয়, বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করতে হয় এবং অনেক সময় প্রভাবশালী মানুষের বিরাগভাজন হতে হয়। তবু তিনি থেমে যেতে রাজি নন। তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য—জীবদ্দশায় যেন রবীন্দ্র সরোবরের পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় থাকে।

তাঁর মতে, যদি একজন নিরস্ত্র সাধারণ নারী এত বছর ধরে এই সরোবরের জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে পারেন, তাহলে সরকারও নিশ্চয়ই এর সুরক্ষায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে। সুমিতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন চেষ্টা করছেন জাতীয় গ্রিন ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে সরোবরের নিরাপত্তায় কেন্দ্রীয় শিল্প নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করানোর জন্য।

তাঁর বিশ্বাস—সঠিক নিরাপত্তা ও সচেতনতার মাধ্যমে এখনও রবীন্দ্র সরোবরকে রক্ষা করা সম্ভব। আর সেই আশাতেই তিনি প্রতিদিন ভোরে আবারও পৌঁছে যান লেক-এর ধারে—একাই, কিন্তু অদম্য দৃঢ়তায়।