Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

বসন্ত পঞ্চমীতে সেজে উঠেছে বাংলার একমাত্র শতাব্দীপ্রাচীন সরস্বতী মন্দির

হাওড়ার কদমতলা এলাকার পঞ্চাননতলা। এখানের একটি সরু গলি ধরে হেঁটে গেলে একটি শতবর্ষ পেরোনো জরাজীর্ণ দোতলা বাড়িতে পৌঁছানো যায়, যেখানে একটি সরস্বতী মন্দির রয়েছে – যা সারা দেশে একটি বিরল ঘটনা এবং সম্ভবত বিদ্যাদেবীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত বাংলার একমাত্র মন্দির।

স্থানীয়রা এই ভেবে গর্ববোধ করেন যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও একবার বঙ্কিমচন্দ্রের সাথে দেখা করতে এখানে এসেছিলেন। কারণ এই মন্দিরের সত্বাধিকারী দাস পরিবারের একটি বাড়িতে বেশ কয়েক বছর বঙ্কিমচন্দ্র বাস করেছিলেন, যাকে স্মরণ করে আজ এখানে আছে বঙ্কিমচন্দ্র পার্কও। এই দাস পরিবারের সম্পত্তি আশেপাশে প্রায় ২০ কাঠা জমি জুড়ে বিস্তৃত। ১৯১৩ সালে, এই পরিবারের ছেলে, পেশায় ইঞ্জিনিয়ার, বীরেশচন্দ্র দাস কাজের সূত্রে জয়পুর গিয়েছিলেন।

বাড়ি ফেরার সময় তিনি সরস্বতীর একটি মার্বেল পাথরের মূর্তি সঙ্গে নিয়ে আসেন। বংশধর অমলেন্দুশেখর দাস বলেন, “আমার প্রপিতামহ উমেশচন্দ্র দাস জোর দিয়েছিলেন যে বাড়িতে একটি মন্দির নির্মাণ করা হোক, যেখানে প্রতিমাটির পূজা করা যাবে।” কিন্তু ১৯১৯ সালে উমেশচন্দ্রের মৃত্যু হওয়ায় সেই কাজ হয়ে ওঠেনি। এক দশক বাদে ১৯২৩ সালের ২৮ জুন এই মন্দিরের দ্বার উদ্ঘাটন হয়।

২০২১ সালে একবার মন্দির সংস্কারের কাজ হয়েছিল। ১৯২৩ থেকে এমন একটি দিনও যায়নি যেদিন প্রতিমাটির পূজা হয়নি। মন্দিরের দেয়ালে মার্বেলের ফলকে মন্দিরটি কখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া আছে। ভবনটির পেছনের দিকে একটি সাধারণ ঘরে মন্দিরটি অবস্থিত।

মন্দিরের চূড়াটি হলুদ রঙের। উপরের ধাতব ত্রিশূল এবং চক্রগুলো দূর থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। দেয়ালের চারটি কোণা ফুলের মতো আকৃতির, এবং দেবীর বাহন চারটি রাজহাঁস ফুলগুলোর পাশে সুন্দরভাবে বসে আছে। ফুলগুলোর নিচে বড় বীণা এবং শঙ্খ খোদাই করা। উপরে প্রদর্শিত হচ্ছে পোড়ামাটির কারুকার্য। ফুল এবং ‘কলকা'(একটি দেশীয় মোটিফ) নকশা মন্দিরের দেয়ালকে সজ্জিত করেছে।

মন্দিরের প্রবেশপথে লোহার শিকযুক্ত একটি বড় কাঠের দরজা রয়েছে। দরজাটি খুললে একটি বিশাল লোহার স্তম্ভ দেখা যায়, যার পরে আরেকটি লোহার দরজা রয়েছে। এরপর একটি ঘেরা খোলা জায়গা(চাতাল) আছে। মন্দিরের ছাদ কাঠের বিম দিয়ে তৈরি এবং মন্দিরের প্রবেশপথও তাই। মন্দিরের ভেতরের দেয়ালও পোড়ামাটির মূর্তি দিয়ে খোদাই করা। দেবীর চমৎকার প্রতিমাটি গর্ভগৃহের কেন্দ্রবিন্দু।

দেবী, তাঁর বাহন রাজহাঁস, তাঁর বীণা—সবকিছুই একটিমাত্র দুধ সাদা মার্বেল পাথরের খণ্ড থেকে খোদাই করা। সামনের দুই স্তরের একটি গেট উমেশচন্দ্র দাস লেনে খোলে। গেটগুলো সকাল সন্ধ্যা জনসাধারণের দর্শনের জন্য খোলা রাখা হয়। দুপুরে সেগুলো বন্ধ থাকে। কিন্তু যদি কেউ কোনো বংশধরের পরিচিত হন, তবে নিয়মিত মন্দিরের গেট বন্ধ থাকলেও পাশের গেট দিয়ে প্রবেশের সুযোগ আছে।

মন্দিরের দেয়ালে হলুদ রঙটি ‘বাসন্তী’ রঙের সাথে সম্পর্কিত, যা ঐতিহ্যগতভাবে দেবীর সাথে যুক্ত। ছাদ থেকে একটি ছোট ঝাড়বাতি ঝুলছে। হলুদ দেয়ালে লাল ও গোলাপি রঙের কাগজের শিকলি লাগানো আছে। গর্ভগৃহের প্রবেশকারী গেটটিকে উজ্জ্বল কমলা ও হলুদ রঙের গাঁদা ফুলের মালার দিয়ে বৃত্তাকারে সাজানো হয়েছে। এই সুরক্ষিত স্থানে প্রবেশাধিকার শুধুমাত্র নিত্যপুজোর পুরোহিতের, যিনি প্রতিদিন দুবার পূজা করতে আসেন। পাশের দুটি অলঙ্কৃত স্তম্ভ গর্ভগৃহের উপর নজর রাখে।

গেট থেকে প্রায় দশ কদম দূরে রয়েছে দেবতাকে রাখার স্থান।সোনালি অলঙ্কারে উদ্ভাসিত প্রতিমাটিকে কেবল সরস্বতী পূজার দিনই শাড়ি পরানো হয়। পরম্পরা মেনে দেওয়া হয় বড় বাতাসার ভোগ আর ১০৮টি মাটির খুরিতে নৈবেদ্য। এই বছর দেবী গোলাপি রঙের শাড়িতে সজ্জিত হয়েছেন। রবিবার সন্ধ্যায় পুরোহিত শাড়িটি বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন।

বছরের বাকি সময়টা বীণা হাতে এই তিন-চার ফুট উঁচু দুধসাদা মার্বেলের প্রতিমাটি একটি ধবধবে সাদা রাজহাঁসের উপর সুন্দরভাবে বসে থাকবেন। সরস্বতী পুজো বাংলা তথা পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের খুবই জনপ্রিয়।

বাঙালী হৃদয়ে বসন্তের রঙ লাগে প্রতিটি বসন্ত পঞ্চমী থেকে তবু এই আবহে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, সরস্বতীর পুজোর এই আগ্রহ থাকলেও কেন অন্য কেউ সরস্বতী মন্দির নির্মাণে একই রকম আগ্রহ দেখায়নি? প্যান্ডেলে দেবীর পূজায় যে উৎসাহ দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গে তা মন্দির নির্মাণের ক্ষেত্রে কেন প্রতিফলিত হয়নি?

প্রসঙ্গত জেনে নেওয়া যাক, ভারতের অন্যান্য রাজ্যের কথা, যেখানে সরস্বতীর মন্দির রয়েছে,
অন্ধ্রপ্রদেশ – বাসারার সরস্বতী মন্দির, কালেশ্বরমের মহা সরস্বতী মন্দির এবং ওয়ারাঙ্গলের বিদ্যা সরস্বতী।
কর্ণাটক– শৃঙ্গেরীর সারদা দেবী
কাশ্মীর– প্রৌঢ়া সরস্বতী
তামিলনাড়ু– কুথানুরের সরস্বতী
ঝাড়খণ্ড– বাবা বৈদ্যনাথ মন্দির চত্বর, যেখানে ২২টি মন্দিরের মধ্যে একটি মা সরস্বতীকে উৎসর্গীকৃত।