সারাবছরের শাক-ডাল-চচ্চড়ির জীবন কাটানো বাঙালির বহু অপেক্ষার শারোদৎসব।
বাঙালি জীবনের যাপনে বছরের এই একটা সময়, আসে যখন তারা জীবনের স্থুলতা ভুলে বিভিন্ন ভাবে তাদের প্রতিভার প্রকাশ ঘটাতে উৎসাহিত হয়। বহুবছর ধরে চলে আসা ঐতিহ্যই সেই শারোদৎসবকে, দুর্গাপূজাকে ভিন্ন ভিন্ন রঙে সাজায়।
শারোদৎসবে রঙ যোগানো সেরকমই এক শিল্পী রেবা পাল।
৭২ বছর বয়সে, যখন বেশিরভাগ মানুষ জীবনের গতি কমিয়ে দেন, তখনও রেবা পালের হাত চলে সেই একই নিষ্ঠা ও মাধুর্য, যেমনটি চলেছিল তাঁর ১৬ বছর বয়সে, যখন প্রথমবার তিনি হাতে তুলি ধরেছিলেন।
তাঁর আঁকা প্রতিটি আঁচড় বাঁচিয়ে রাখে এক ম্লান হতে থাকা ঐতিহ্য—চালচিত্র, যা দুর্গা প্রতিমার পেছনের সূক্ষ্ম নকশার পটভূমি হয়ে ওঠে।

এই শিল্প তিনি শিখেছিলেন তাঁর প্রয়াত স্বামী, শিল্পী জ্যোতি পালের কাছ থেকে। স্বামী-স্ত্রী মিলে কয়েক দশক ধরে বাড়ি ও প্যান্ডেলে রঙিন তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলেছেন পুরাণের কাহিনি।
স্বামীর মৃত্যুর পর রেবা একাই এই উত্তরাধিকার বয়ে এনেছেন। তিন কন্যাকে মানুষ করেছেন, সংসার চালিয়েছেন, আর কখনও নিজের শিল্পকে নিভতে দেননি।

তাঁর সাদামাটা ঘর,সরল জীবন , সংগ্রাম অনেক; তবু যখন তিনি তুলি ধরেন—সাদা রঙের জন্য খড়ির গুঁড়া, নীলের জন্য নীলরঙ, লালের জন্য সিঁদুর—তখন তাঁর পৃথিবী রঙে ভরে ওঠে। প্রতিটি চালচিত্র শুধু শিল্প নয়, প্রজন্মের সেতুবন্ধন, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সংযোগ।
যে সময়ে যন্ত্রে ছাপা ব্যাকড্রপ হাতে আঁকা পটচিত্রকে সরিয়ে দিচ্ছে, তখন রেবা পালের কাজ মনে করিয়ে দেয়: শিল্প কেবল সাজসজ্জা নয়, শিল্প মানে ভক্তি, স্মৃতি ও দৃশ্যমান ভালোবাসা।
এই শারদীয়া দুর্গাপূজায়, যখন আলোকসজ্জায় ঝলমল করবে প্যান্ডেল, তখন যেন আমরা স্মরণ করি তাঁর মতো শিল্পীদের—যারা আমাদের শুধু সৌন্দর্য নয়, উপহার দেন গল্প, উত্তরাধিকার আর হৃদয়ের স্পর্শ।


