নিউ মার্কেটের ভেতরে অবস্থিত নাহুম অ্যান্ড সন্স—একটি ইহুদি বেকারি, এমন এক শহরে যেখানে বাগদাদি ইহুদি জনসংখ্যা প্রায় বিলুপ্ত।
কলকাতার পথে ঘাটে একটা জনপ্রিয় প্রবাদ ঘুরে বেড়ায়….
“এক ইহুদির কারখানায় কেক বানায় মুসলমান খানসামা, আর ক্রিস্টানদের পার্বণে সামিল হতে সেখানে সারবদ্ধ হয়ে কেক কেনে হিন্দু সহ সব ধর্মের মানুষ।”
এটাই নাহুমস এন্ড সনস্- এর কলকাতা।
প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯০২ সালে। ইরাক থেকে আগত নাহুম ইসরায়েল মরদেকাই এই বেকারির সূচনা করেন।
এক শতাব্দী এক কুড়ি বছর পেরিয়েও বেকারিটি দেখতে প্রায় আগের মতোই রয়ে গেছে। সাজসজ্জা যেন নিজেকে সমকলীন করতে অস্বীকার করেছে, কাউন্টারগুলো সব সময় ভিড়ে ঠাসা, আর রেসিপিগুলোও—শৈশবের গুপ্তধন লুকোনোর গোপন ঠিকানার মতো—অপরিবর্তিত গোলকধাঁধা। নাহুমের বেকিং, কথা বলে এক ভিন্ন ভাষায়—সংযমের ভাষায়। নরম রোল, লেমন টার্ট, অতিরঞ্জনহীন ব্রাউনি। দেখনদারি নেই কোথাও তবুও এদের ইহুদি প্লাম কেক এতটাই ঘন ও ভারী যে তা চোখ-বুজে যে কোনও উৎসবে উপহার হিসেবে দেওয়ার কথা ভাবাই যায়।
চাল্লা বা ইহুদি বেণীবদ্ধ রুটি স্বচ্ছন্দে জায়গা করে নেয় ব্রিটিশ এক্লেয়ার ও চিকেন পাফের পাশে।
এইভাবেই বাগদাদের এক ক্ষুদ্র অংশ কোন ফাঁকে টুক করে এসে ব্রিটিশ কলকাতায় ঢুকে পড়েছিল একদিন তারপর থেকে গিয়েছে এতটা দীর্ঘকাল ধরে। ডিসেম্বর এলেই উৎপাদনের চাপ তুঙ্গে ওঠে— শেষের সপ্তাহগুলোতে প্রতিদিন এক হাজার পাউন্ডেরও বেশি কেক বেক করা হয়, আর কর্মীদের কাজের সময়কাল হয়ে ওঠে দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর। তবুও ক্লান্তিহীন ভাবে দোকানের সামনে সারবদ্ধ হয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে কলকাতার মানুষ। নাহুমস এর এক টুকরো কেক ছাড়া বড়দিন আসে না যে তাদের জীবনে। আড়াই ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন ৭০ বছরের জয়দেব রাহা, যিনি মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই অস্ত্রোপচার করিয়েছেন। তিনি বলেন, “প্রতি বছরই আমি নাহুমে আসি, যাই হোক না কেন। আমি ওদের প্লাম কেক, রাম বল আর রিচ ফ্রুট কেক নিই। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে এই ঘ্রাণই আমার ধৈর্য ধরে রাখে। এ বছর শরীর সায় দিচ্ছে না, কিন্তু এটা আমার শৈশবের অংশ, আমার সন্তানের শৈশবের অংশ, আর এখন আমার নাতি-নাতনিদেরও।”
জোমাটো বা সুইগির মতো অনলাইন ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মে নিজেদের সামিল করেন নি এরা। কোনো বিকল্প না থাকায়, মানুষের সারি বাড়তেই থাকে দোকানের সামনে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকে স্মৃতির জাদুঘরের মতো। প্রতি বড়দিনে, শহর জাগার আগেই এদের ওভেনগুলো জেগে ওঠে। আর এই শহর আরও একবার গায়ে মেখে নেয় রাম, ওয়াইন আর রীচ টুটি-ফ্রুটির নস্টালজিক উষ্ণ আমেজ।


