রেলপথে উত্তর-পূর্বে যোগাযোগের নতুন দিগন্ত উন্মোচন হল।
২৬ বছরের দীর্ঘ পরিকল্পনা ও নির্মাণযাত্রার পর মিজোরামের রাজধানী আইজল অবশেষে ভারতের রেল মানচিত্রে যুক্ত হলো। সদ্য সম্পূর্ণ হওয়া বৈরাবি-সাইরাং রেললাইন, যার দৈর্ঘ্য ৫১.৩৮ কিলোমিটার, ভারতের অন্যতম দুর্গম ভূপ্রকৃতির উপর নির্মিত এক ইঞ্জিনিয়ারিং বিস্ময়।
এই রেললাইন অগণিত প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে আইজলকে দেশের মূল রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার সাথে সংযুক্ত করেছে।

৫১.৩৮ কিমি দীর্ঘ এই লাইনে রয়েছে ৪৮টি সুড়ঙ্গ, যেগুলির সম্মিলিত দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩ কিমি। রয়েছে ৪০টিরও বেশি সেতু।
এর মধ্যে ১৯৬ নম্বর সেতুটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ এটির উচ্চতা ভূমিপৃষ্ঠ থেকে ১০৪ মিটার, যা দিল্লির কুতুব মিনারের থেকেও ৪২ মিটার বেশি উঁচু।

ঘন অরণ্য, খাড়া পাহাড় এবং বিস্তারিত ভূমিধ্বসপ্রবণ এলাকার ওপর দিয়ে এই লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। “আমরা ভূমিধ্বস আর চরম আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াই করেছি। এটি আমাদের সবচেয়ে কঠিন প্রকল্পগুলির একটি ছিল,” জানিয়েছেন প্রকল্পের চিফ ইঞ্জিনিয়ার বিনোদ কুমার।
নতুন এই সংযোগ গুয়াহাটি থেকে আইজল পৌঁছানোর সময়সীমাকে কমিয়ে আনবে অনেকটাই। যেখানে সড়কপথে ১৮ ঘণ্টা সময় লাগত, এছাড়াও সড়কপথে যানজট, খারাপ রাস্তা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ এই সময়সীমাকে দীর্ঘ করত অনেকটাই। সেখানে রেলপথে সময় লাগবে ১২ ঘণ্টারও কম।
ভাড়া ধরা হয়েছে প্রায় ৪৫০ টাকা। ফলে শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, পর্যটক এবং সাধারণ যাত্রীদের জন্য এটি হবে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
“মিজোরামে এর আগে কোনো রেল সংযোগ ছিল না। এই প্রকল্প উত্তর-পূর্ব ভারতের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনবে” বলে মনে করছেন উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক কে কে শর্মা। তিনি আরও জানান, “এই অঞ্চলে স্থানীয় শ্রমিক পাওয়া মুশকিল তাই বাইরে থেকে শ্রমিক আনতে হয়েছে, সেই সব অসংখ্য শ্রমিক বছরের পর বছর সাইটের কাছে থেকে খারাপ আবহাওয়া আর দুর্গম পরিবেশের মধ্যে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন।”

আসাম থেকে আসা একজন শ্রমিকের কথায়—“মাসের পর মাস বৃষ্টি হয়েছে। তবু আমরা থেকেছি, কাজ করেছি, আর হাত দিয়ে এই লাইন নিজেদের হাতে গড়ে তুলেছি।”
উত্তর-পূর্বের এই নতুন রেললাইন ১৩ সেপ্টেম্বর উদ্বোধন করলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী।
দীর্ঘ দুই দশকের চেষ্টার পর আনুষ্ঠানিক ভাবে উদ্বোধন হওয়া বৈরাবি-সাইরাং প্রকল্প আজ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পরিকাঠামো উন্নয়নের প্রতীক। এই রেললাইন শুধু একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা নয়, বরং একটি দূরবর্তী রাজ্যকে ভারতের মূল স্রোতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার দিকে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।
এই প্রকল্পের চিন্তাভাবনা শুরু হয় ১৯৯৯ সাল থেকেই। ২০০০ সালে মিজোরামের দুয়ার মুখ কলাসিব এর কাছে থাকা বৈরাবি আর আসামের শিলচরকে জুড়ে দেওয়ার কাজও শুরু হয় তবুও বাকি থেকে যায় আইজল পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ। পরবর্তী কালে ২০০৮-০৯ সালে পুরো পরিকল্পনাটির অনুমোদন পাওয়া যায়। তথাপিও দুর্গমতার দিকে নজর রেখে কাজ শুরু করা যায়নি। অবশেষে ২০১৪ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর হাতে শিলান্যাস হয় প্রকল্পের।
অস্বাভাবিক প্রতিকূলতাকে কাটিয়ে উঠে, দেরি হলেও সফলভাবে শেষ হওয়া এই প্রকল্প মিজোরামের জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করবে, একথা বলাই যায়।


