Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

২০০ বছর পেরিয়েও ঐতিহ্যের টান: বাঁকুড়ার কেঞ্জাকুড়ায় ফি-মাঘের মুড়িমেলা

সন্ধ্যার টিফিনে চপ-মুড়ি, বাঙালির নাড়ির টান। সেসব নিয়ে রাজনীতি অর্থনীতিতেও প্রবল টানাটানি। আবার মেলা-মোচ্ছবও অধুনা বঙ্গ জীবনের অঙ্গ, তাই বলে চপ-মুড়ি উদযাপনের মেলা? শোনা ইস্তক খানিক খটকা লাগে বটে। কিন্তু খোঁজ নিলে দেখা যাবে এই উদ্যোগের গুঁড়ি প্রায় দুই শতক পেরিয়েছে।

এমনিতে আজকের ডিজিটাল যুগে, শহরের নব্যযুব বা কিশোর- কিশোরীদের মধ্যে মুড়ি প্রীতি কতটা তা জানা নেই তবে বাঁকুড়াবাসীদের সাথে মুড়ির এক অমোঘ টানের কথা প্রায় সর্বজনবিদিত।
এই আশ্চর্য যোগ শুধু গভীরই নয়, ঐতিহ্যবাহীও ৷ মুড়ির মত একটা সাধারণ খাবারের সঙ্গে এই জেলার এমনই আত্মিক টান যে, সেই মুড়িকে ঘিরে প্রতি বছর মাঘের শুরুতে বসে যায় আস্ত একটা মেলা ।আর তা দেখতে ও অংশ নিতে দূরদূরান্ত থেকে লোকজন আসেন ৷ শুধু মুড়ির টানে।

বাঁকুড়ার কেঞ্জাকুড়া এলাকার এই মুড়ির মেলার মধ্যে দিয়ে জেলাবাসী শুধু যে তাঁদের এই মুড়ি-প্রেমকে বছর বছর একবার করে ঝালিয়ে নেন তা নয়, শয়ে শয়ে মানুষ দ্বারকেশ্বর নদের তীরে স্রেফ এক মুঠো মুড়ি মুখে দিয়ে মজে ওঠেন আনন্দে, ভাগ করে নেন সুখ-দুঃখের রোজনামচা ৷ অচিরেই কেঞ্জাকুড়ার মুড়ির মেলা হয়ে ওঠে সামাজিক ও আত্মিক বন্ধনের মূর্ত প্রতীক ৷
রাঢ় বাংলার লোককথা ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ এই মুড়ি মেলা ৷ যেখানে মুড়ি খাওয়া একটি জাতিগোষ্ঠীর আভ্যন্তরীণ সম্পর্কের উন্নয়নের মাধ্যম হিসেবেও বিবেচিত হয়।
আসুন জেনে নেওয়া যাক এই মুড়ি মেলার ইতিহাস
কেঞ্জাকুড়ায় মুড়ি মেলার ইতিহাস অনেক পুরনো ৷ কীভাবে এমন অভূতপূর্ব মেলা শুরু, তা নিয়ে যেমন রয়েছে জনশ্রুতি ; তেমনই রয়েছে লোকগানের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নিবিড় যোগাযোগের কাহিনী ৷

বাঁকুড়ার এই কেঞ্জাকুড়ায়, দ্বারকেশ্বর নদের পাড়েই রয়েছে সঞ্জীবনী মাতার আশ্রম। প্রতি বছর মকর সংক্রান্তিতে হরিনাম সংকীর্তনের অনুষ্ঠান হত এখানে বহুযুগ ধরে । শেষ হত মাঘ মাসের চার তারিখ। দূরদূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ এই সংকীর্তন শুনতে হাজির হতেন এই আশ্রমে। কথিত আছে, কেঞ্জাকুড়া একটা সময় ছিল ঘন বনজঙ্গলে ঢাকা। হরিনাম সংকীর্তন শেষ হতে সন্ধ্যা গড়িয়ে যেত । তারপর কেউ জঙ্গল পার করে ফিরে যাওয়ার সাহস দেখাতেন না । পরদিন সকালে সঙ্গে থাকা শুকনো মুড়ি দ্বারকেশ্বর নদের জলে ভিজিয়ে তা খেয়ে বাড়িতে ফেরার পথ ধরতেন তারা। সেই অসুবিধাই ধীরে ধীরে পরিনত হয় বহু মানুষের মিলনক্ষেত্রে, সেই থেকেই এই মুড়ি মেলার উৎপত্তি ৷
অতীতের সেই ঘন জঙ্গল যেমন আর নেই, তেমনই নেই তা পেরোনোর ঝক্কি আর বিপদ । তবে আজ প্রয়োজন না-থাকলেও মুড়ি খাওয়ার ‘রেওয়াজ’ কার্যত উৎসবের চেহারা নিয়েছে ৷ এখন আর শুধু হরিনাম সংকীর্তন শুনতে আসা মানুষ নন, কেঞ্জাকুড়া-সহ আশপাশের অন্তত কুড়িটি গ্রামের মানুষজন পরিবার-পরিজন নিয়ে নিয়ে মাঘের সকালে দ্বারকেশ্বর নদের চরে চলে আসেন।

সঙ্গে আনেন মুড়ি। শীতের মিঠে রোদে পিঠ দিয়ে চলে জমিয়ে মুড়ি খাওয়া। মুড়ির অনুষঙ্গ হিসাবে কেউ আনেন চপ কিংবা বেগুনি, আবার কেউ নিয়ে বসেন ঘুগনি। সঙ্গে থাকে লঙ্কা, পেঁয়াজ, শসা, নারকেল, টম্যাটো, চানাচুর, তিল, নারকেল নাড়ু ইত্যাদি আরও অনেক কিছু।
এই বিষয়ে সঞ্জীবনী মাতা আশ্রম কমিটির সদস্য তথা মুড়ি মেলার বর্তমান আহ্বায়ক পার্থবাবু বললেন,
“অসংখ্য মানুষ এখানে ভিড় জমান ৷ প্রশাসনের সহায়তায়ও পাই আমরা । দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই মেলা  আগামী দিনেও এই ভাবেই চলবে বলে আমরা আশাবাদী। প্রতি বছর আমরা লক্ষ্য করেছি পুরোনোদের মতো বহু মানুষ প্রথমবার এই মুড়ির মেলায় আসেন। এঁদের জন্যেই এত বছর ধরে মুড়ির মেলা চলে আসছে এবং তা কলেবরেও বেড়েছে। মেলাকে কেন্দ্র করে সকলের উচ্ছ্বাসও চোখে পড়ার মতো।” নেই নেই করে মুড়ি মেলার বয়েস দু-শো বছর পেরিয়েছে । তবে ভাটা পড়েনি উচ্ছ্বাস আর আবেগে। সেই ছবিই দেখা গেল এবছরও ৪ঠা মাঘ, রবিবার ৷

কেঞ্জাকুড়ায় দ্বারকেশ্বর নদের চরে মুড়ি মেলায় অংশ নিয়ে আনন্দে মাতলেন হাজার হাজার মানুষ। শীতের নদীতে জল কম, মেলা বসে নদের চরায় আর জলের অভাব মেটাতে নদের চরের বালিতে গর্ত করে জল সংগ্রহ করে, সেই জল মুড়িতে ছিটিয়ে সেই মুড়ি খাওয়াই রীতি। সময় পালাটালেও রীতি অপরিবর্তিত থেকে যায়। আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল এই মুড়ি বা আনুষঙ্গিক খাবার মেলায় বিক্রি হয় না। সবাই যার যার বাড়ি থেকে সঙ্গে করে নিয়ে এসে পরিবার-পরিজন সহ মেলায় বসে খান।
এবারেও খেলেন আট থেকে আশি। মাতলেন গল্পে ৷ সুখ-দুঃখ, সাফল্য-ব্যর্থতা, পাওয়া-না পাওয়া সবেরই আলোচনা চলল মুড়ি খেতে খেতে ৷ ২০২৬ সালের ১৮ জানুয়ারির সকালে জমে উঠল কেঞ্জাকুড়ায় মুড়ির মেলা।
মেলায় এসে উচ্ছ্বসিত স্থানীয় বাসিন্দা ঝিমলি দে৷ তাঁর কথায়, “প্রতি বছর অপেক্ষা করে থাকি এই দিনটার জন্য। সকাল সকাল মুড়ি বেঁধে চলে আসি কেঞ্জাকুড়ায়। এই সঞ্জীবনীর ঘাট, এই মুড়ির মেলা আমাদের বাঁকুড়ার খুব আপনার ৷ সবাই একসঙ্গে বসে মুড়ি খাব, এটাই এই মেলার বিশেষত্ব; এটাই মজা ৷”

হাওড়া থেকে, মেলায় প্রথমবার আসা দম্পতি মল্লিকা ও সুবিনয় গড়াই বললেন, “এই মেলার গল্প আগে অনেক শুনেছি, বেশকিছু ভিডিয়োও দেখেছি ৷ এবার প্রথম এলাম ৷ সবাই মিলে মুড়ি খেলাম ৷ তারপর আশপাশটা ঘুরে দেখে খুব ভালো লাগছে ৷ এতটাই ভালো লেগেছে যে, প্রতি বছর আসতে চাই ৷”

কেঞ্জাকুড়ার মুড়ির মেলা এখন শুধু স্থানীয়দের মধ্যে আর সঞ্জীবনী মায়ের মন্দির চত্বরে সংকীর্তন শুনতে আসা মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাৎসরিক এই মেলা আজ দূরদূরান্ত থেকে আসা অনেকের কাছেই একে ওপরের কথা শোনার, গল্প ভাগ করে নেওয়ার এক মিলনক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। অনলাইন আর্থিক বাজার, ডিজিটাল আর এ-আই চালিত ভার্চুয়াল দুনিয়ায় সম্পর্কের মূল্যবোধ হারিয়ে যাওয়া নিয়ে বৌদ্ধিক সমাজ যখন আলোচনায় মত্ত ৷

একসঙ্গে খাবার খেতে বসা যে সময় পরিবারের অভ্যন্তরেও প্রায় উঠে যাচ্ছে , উৎসব উদযাপনের অঙ্গনে মিলিত হলেও যেখানে বেশিরভাগ সময় বেশীরভাগ যার যার মোবাইলে নিমজ্জিত থেকে একে অপরের সঙ্গে খুবই কম কথা বলে । সেই অস্বাভাবিক সময়ে দাঁড়িয়ে মানুষের সুখ-দুঃখ স্বাভাবিক নিয়মে ভাগ করার ক্ষেত্র হিসেবে, মানুষকে তার আসল স্হান, প্রকৃতি ও মাটির কাছাকাছি ধরে রাখার নিরিখে কেঞ্জাকুড়ার মুড়ির মেলা এক অসীম সম্ভাবনার দিক নির্দেশ দেয়।