বনগাঁর নারী নিরাপত্তায়–প্রযুক্তি, দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ, সচেতনতা ও জনসংযোগের সমন্বয়ে সর্বাঙ্গীণ সুরক্ষা দিচ্ছে আইপিএস দিনেশ কুমারের ‘দশভুজা’ কর্মসূচি।
পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী অঞ্চল বনগাঁ, যেখানে গ্রামের পটচিত্রে মিশে যায় শহরের জটিলতা। সেই মিশ্র ভূচিত্রে বহু চ্যালেঞ্জের মাঝেই সেখানে দীর্ঘদিন ধরে নারীর নিরাপত্তা ছিল একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।
ক্রমবর্ধমান লিঙ্গবৈষম্য ভিত্তিক হিংসা, পাশাপাশি আধুনিক যুগের সাইবার অপরাধের মতো জটিল সমস্যায় নারীরা আরও বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছিলেন। এবং ঠিক সেই সময়ই এক যুগান্তকারী উদ্যোগ বদলে দিতে শুরু করেছে পরিস্থিতি।
২০১২ ব্যাচের পশ্চিমবঙ্গ ক্যাডারের আইপিএস অফিসার দিনেশ কুমার, বর্তমানে বনগাঁ পুলিশ জেলার পুলিশ সুপার (SP), তাঁর নেতৃত্বে চালু করেছেন “দশভুজা: নারীর নিরাপত্তা ৩৬০°” কর্মসূচি।
এটি একটি দশ কর্মসূচি সমন্বিত, বহু-মাত্রিক সুরক্ষাছত্র। দশভুজা নামটি এসেছে দশভুজা দেবী দুর্গার কাছ থেকে—যিনি সর্বব্যাপী শক্তি ও সুরক্ষার প্রতীক।
প্রযুক্তির ব্যবহার, কার্যকরী জনসংযোগ এবং সক্রিয় পুলিশিং—সবকিছুকে একসঙ্গে জুড়ে নারীদের জন্য তৈরি করা হয়েছে আরও নিরাপদ পরিবেশ।
সর্বাঙ্গীণ নিরাপত্তা উদ্যোগ
দূরদর্শী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত কুমার ‘দশভুজা’কে বানিয়েছেন বনগাঁ পুলিশ জেলার অন্যতম প্রধান উদ্যোগ।
তিনি বলেন, “নারী নিরাপত্তা মানে শুধু অপরাধ ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়—বরং অপরাধ প্রতিরোধের জন্য ৩৬০-ডিগ্রি কৌশল গড়ে তোলা।”
বিস্তৃত ভৌগোলিক পরিসর—অতিদূর গ্রাম থেকে পর্যটন এলাকা—বুঝে এই কর্মসূচি বস্তুগত ও ডিজিটাল—দুই ক্ষেত্রের ঝুঁকি ই মোকাবিলা করে। নিরাপত্তার প্রতিটি আলাদা দিককে লক্ষ করে উদ্যোগটির দশটি আন্তঃসংযুক্ত দিক আছে। একইসঙ্গে কম খরচে বহু মানুষের উপকার নিশ্চিত করছে এটি।
যেমন মাত্র ১৬ হাজার টাকা একবারের সরঞ্জাম খরচে(বডি ক্যামেরা, স্মার্টফোন ইত্যাদি) প্রতিজন ‘রক্ষক’কে প্রস্তুত করা হয়েছে—সরকারি ভাবে ধার্য করা রিসোর্সেস ব্যবহার করেই বাড়ানো হয়েছে কার্যকারিতা।
দশভুজার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নিরীক্ষা (NIRIKSHA)—
একটি নিরাপত্তার নিরীক্ষা বা অডিট ব্যবস্থা। হাসপাতাল, স্কুল, হোটেল, আবাসিক কমপ্লেক্স—সব জায়গায় হচ্ছে সুবিবেচিত নিরাপত্তা পরিদর্শন। কমিউনিটির সহযোগিতায় GIS-ভিত্তিক CCTV মানচিত্র, অন্ধকারাচ্ছন্ন ‘ডার্ক স্পট’ চিহ্নিত করে সেখানে আলো ও টহল বাড়ানো, চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের পুলিশ ভেরিফিকেশন সার্টিফিকেট (PCC) বাধ্যতামূলক করা—সবই এই স্তম্ভের অন্তর্ভুক্ত।
SP কুমারের নেতৃত্বে পরিদর্শনের পর ইতিমধ্যে ৮০০-র বেশি প্রতিষ্ঠানকে সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ড. জে. আর. ধর সাব-ডিভিশনাল হাসপাতাল–এর নিরীক্ষায় নজরদারি বৃদ্ধি ও নিরাপত্তারক্ষীদের ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচি যুক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন,
“আমরা ব্যবসায়িক সংস্থার মালিকদের সচেতন করেছি—নারী নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, ভেরিফিকেশনহীন কর্মী রাখা চলবে না।”
এর পাশাপাশি মহিলা টয়লেট, ক্রেশ, বিশেষভাবে সক্ষম নারীদের সুবিধা, এবং অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি (ICC)–র উপস্থিতিও যাচাই করা হচ্ছে।
এরকম দশটি কার্যসূচি আসুন দেখে নিই এক নজরে
১. NIRIKSHA – নিরাপত্তা নিরীক্ষা
জেলার হাসপাতাল, স্কুল, হোটেল, আবাসিক কমপ্লেক্স–সহ ৮০০+ প্রতিষ্ঠানে চলছে কঠোর নিরাপত্তা অডিট।
GIS–ভিত্তিক CCTV মানচিত্র।
অন্ধকার এলাকার আলো ও টহল বৃদ্ধি।
কর্মীদের বাধ্যতামূলক পুলিশ ভেরিফিকেশন।
মহিলা টয়লেট, ক্রেশ, ICC–র উপস্থিতি যাচাই।
২. RAKSHA KAVACH – দ্রুত প্রতিক্রিয়া ইউনিট
আটতিরিশটি গ্রামপঞ্চায়েতের প্রতিটিতে টহলদারি জন্য মোতায়েন হয়েছে ৪০ জন রক্ষক, বডি ক্যাম ও বিশেষ মোটরবাইকসহ।
যুক্ত হয়েছে 24×7 হেল্পলাইন যা 7319224450 ও 112 নম্বর-এ উপলব্ধ।
রক্ষকদের প্রতিক্রিয়ার সময়: ২–১০ মিনিটের মধ্যেই। রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং চলছে; শিগগিরই অ্যাপও যুক্ত হবে।
৩. SHAKTI – আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণ
ক্লাস ৮–১২-এর মেয়েদের জন্য বিনামূল্যের সেল্ফ-ডিফেন্স এর প্রশিক্ষণ চালু হয়েছে এলাকার
১২৯ স্কুল/কলেজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।
সাইবার সখী সার্টিফিকেশন।
ডিপফেক, ব্ল্যাকমেল প্রতিরোধ প্রশিক্ষণ ইত্যাদির মাধ্যমে ডিজিটাল অপরাধ মোকাবিলার চেষ্টাও চলছে।
৪. JAGRITI – সচেতনতা অভিযান
৭৩৬ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বয়সভিত্তিক সচেতনতা শিবির।
গুড টাচ–ব্যাড টাচ।
POCSO আইন, স্বয়ং সিদ্ধা।
POSH আইন, সাইবার অপরাধ।
উইনার্স দলের ইভ-টিজিং বিরোধী সেশন ও প্রবীণ নাগরিক সুরক্ষা প্রচারও যুক্ত।
৫. NITI SATATA – দ্রুত বিচার।
অপরাজিতা টাস্ক ফোর্স ৬৫টি মামলার অগ্রগতি ট্র্যাক করছে।
ভুক্তভোগীরা পাচ্ছেন-
আইনি সহায়তা (DLSA)
গোপনীয়তার আশ্বাস, সাথে চিকিৎসা, ক্ষতিপূরণ
আপডেটসহ অনন্য অভিযোগ নম্বর(complain code)
৬. DRISHTI – কন্ট্রোল রুম মনিটরিং
সবকটি স্তম্ভের কার্যকারিতার ডেটাভিত্তিক বিশ্লেষণ।
সোশ্যাল মিডিয়া নজরদারি,
নারীদের প্রতি অপরাধে জড়িতদের ওপর পর্যবেক্ষণের কাজ এই শাখার দায়িত্ব।
৭. VAARTA – মানবিক যোগাযোগ ব্যবস্থা
নিয়মিত ফলো-আপ, কাউন্সেলিং এবং গোপনে অভিযোগের স্ট্যাটাস জানার সুযোগ থাকছে এই শাখার আওতায়।
অ্যাপ ইন্টিগ্রেশনও আসছে শীঘ্রই।
৮. PRATISTHA – স্বীকৃতি ও উৎসাহ
সাহসী নারী, এনজিও ও গুড সামারিটানদের সম্মাননা দিয়ে পীড়িতা ও সমাজকে যুক্ত করছে দশভুজা।
৯. SAMATA – জেন্ডার সেনসিটাইজেশন
পুলিশ, ছাত্রছাত্রী ও হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সহমর্মিতা ও SOP-র প্রশিক্ষণ জারি থাকছে এই শাখার কার্যপ্রণালীতে।
১০. PRAGATI – উদ্ভাবন ও ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি
আসছে একীভূত দশভুজা অ্যাপ
SOS অ্যালার্ট
রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং
পুলিশ বন্ধু –র GPS অ্যালার্টে দ্রুত সাড়া।
এই উদ্যোগের সামগ্রিক প্রভাবে-
প্রতিক্রিয়ার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
কমিউনিটিতে নিরাপত্তা নিয়ে আস্থা বেড়েছে।
সীমান্তঘেঁষা অঞ্চলের ঝুঁকি মোকাবিলা আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
SP দিনেশ কুমার বলেন:
“দশভুজার ১০টি দিকই কম খরচে সহজে প্রয়োগযোগ্য—এটি দেশজুড়ে নারীর নিরাপত্তার নতুন মানদন্ড হতে পারে।”
আজকের সমাজে নারী নিরাপত্তার প্রয়োজনগুলো বদলে বদলে যাচ্ছে, আর দিনেশ কুমারের মতো কর্মকর্তারা সেই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
‘দশভুজা’ শুধুমাত্র একটি প্রকল্প নয়—এটি একটি আন্দোলন, যা নারীদের নির্ভয়ে এগিয়ে চলার শক্তি দিচ্ছে—বনগাঁতে এবং তার বাইরেও।


