Tuesday, June 30, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

গাড়ওয়াল হিমালয়: বিয়েবাড়িতে ব্যয়বহুল উপহার, ফাস্ট ফুডের ওপর নিষেধাজ্ঞা, বন্ধ স্বর্ণালঙ্কারের প্রদর্শনও

ভারতীয় বিয়ে মানেই প্রচুর অনুষ্ঠান, অঢেল খাওয়া দাওয়া, যথেচ্ছ দেখনদারি আর অজস্র অর্থ ব্যয়।
এসবের থেকে দূরে যেতে উত্তরাখণ্ডের চকরাতা অঞ্চলের প্রায় দুই ডজন গ্রামের যৌথ সিদ্ধান্ত—বিয়ে-বাড়িতে ফাস্ট ফুড, বিলাসী উপহার ও উচ্চখরচের সব আচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সামাজিক প্রতিযোগিতা ও আর্থিক চাপ কমিয়ে লোকায়ত সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতেই এই সমষ্টিগত উদ্যোগ। নিয়ম ভাঙলে গ্রামপঞ্চায়েতের পক্ষ থেকে ১ লাখ টাকা জরিমানার বিধান করা হয়েছে।

দোহা গ্রাম ক্লাস্টারের প্রধান রাজেন্দর তোমর সংবাদমাধ্যমকে জানান, বিয়ে নিয়ে অযথা ধনসম্পদ প্রদর্শন প্রতিযোগিতার রূপ নিয়েছিল। “এইসব রীতি এখন প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়ে অনর্থক সামাজিক চাপ তৈরি করছিল,”—বললেন তিনি। দাউ, দোহা, চুটৌ, বাজাউ, ঘিংগো ও কৈত্রি-সহ একাধিক গ্রাম নতুন বিধিনিষেধ কার্যকর করেছে।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিয়ের মেন্যুতে চাউমিন, মোমো বা যেকোনো ধরনের ফাস্ট ফুড সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। এর বদলে স্থানীয় উপাদান—মাণ্ডুয়া ও ঝিংগোরা মিলেট দিয়ে তৈরি ঐতিহ্যবাহী গাড়ওয়ালি খাবার পরিবেশনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ব্যয়বহুল উপহার বা বিলাসবহুল সামগ্রীর বিনিময়ও নিষিদ্ধ। কইয়া গ্রামের বাসিন্দা কারমু পাল এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “নিজেদের খাবার-সংস্কৃতি আবার সামনে আসছে—এতে আমরা খুশি। নতুন প্রজন্মও শিকড় ভুলে যাবে না।”


এমনই সুর ধরা পড়েছে উত্তরকাশীর নওগাঁওয়ের পাশের কোটী ঠাকরাল ও কোটী বানাল এলাকায়। সেখানে গ্রামবাসীরা বিয়েতে ডিজে সাউন্ড ও মদ পরিবেশন নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। উৎসবে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে লোকসংগীত ও স্থানীয় বাদ্যযন্ত্র।

কেন উত্তরাখণ্ডের ২৫টি গ্রাম ফাস্ট ফুড, মদ ও বিলাসী বিয়ের রীতি নিষিদ্ধ করল
উত্তরাখণ্ডে এক বড় সাংস্কৃতিক সংস্কার যাত্রা শুরু করতে, জৌনসার-বাওয়ার ও চকরাতা অঞ্চলের বহু গ্রাম সম্মিলিতভাবে এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে

১. সমষ্টি গত এই পদক্ষেপ: সামাজিক চাপে লাগাম

এক দিনের সভা নয়—এ সিদ্ধান্ত এসেছে কয়েক সপ্তাহের আলোচনার পর। গ্রামের প্রতিনিধিরা দেখছিলেন, আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজনের প্রতিযোগিতা পরিবারগুলোর ওপর অযথা আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে। দাউ, দোহা, চুটৌ, বাজাউ, ঘিংগো, কৈত্রি-সহ বহু গ্রামের বাসিন্দারা মনে করেন, আধুনিক এই প্রবণতা পরিবারগুলোর সঞ্চয় নিঃশেষ করে দিচ্ছে। বিয়ে-উৎসব হয়ে উঠছিল প্রদর্শনের রণক্ষেত্র—যে চাপ আর বহন করা সম্ভব ছিল না।

নিষিদ্ধ হলো যেগুলো দোহা গ্রামে অনুষ্ঠিত এক বড় সভায় সম্প্রদায়ের প্রধান রাজেন্দ্র সিং তোমরের নেতৃত্বে সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত হয়—সব অনুষ্ঠানে ফাস্ট ফুড ও মদ একেবারে নিষিদ্ধ।

এক প্রবীণ সদস্য স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন—“কেউ চাউমিন, মোমো, টিক্কি, পিৎজা কিংবা পাস্তা দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করলে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে।”
নিষেধাজ্ঞা শুধু বিয়ের জন্য নয়—যে কোনও উৎসব, সামাজিক যেকোনো সমাবেশেই এ নিয়ম প্রযোজ্য। এমনকি বিয়ারের মতো মৃদু মদ্যপানও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

২. স্থানীয় খাবার ও লোকসংগীতে ফিরে যাওয়া

নতুন বিধি অনুযায়ী, মাণ্ডুয়া-ঝিংগোরা-সহ স্থানীয় উপাদানে তৈরি গাড়ওয়ালি খাবারই পরিবেশন করতে হবে। খরচ কমানোর পাশাপাশি নিজেদের পরিচয় ও ঐতিহ্যকে জিইয়ে রাখাই এর উদ্দেশ্য। প্রচণ্ড শব্দের ডিজে ও মদভিত্তিক নাচগানকে বদলে জায়গা দেবে লোকগান, পাহাড়ি বাদ্যযন্ত্র ও ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনা—যেগুলো একসময়ে পাহাড়ি বিয়ের পরিচয় ছিল।

৩. বধূ-বরপক্ষের উপহারে নতুন নিয়ম

উপহারের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন। রূপার টোকেন, ড্রাই ফ্রুটস্ বা অন্য ব্যয়বহুল উপহারের বদলে শুধু চাল, আটা ও ছাগলের মাংস বিনিময়ের অনুমতি থাকবে। প্রবীণরা জানান—আগের মতো দামি উপহার দেওয়ার রীতি অনেক পরিবারকে বিপদে ফেলত। নতুন নিয়ম সেই অযাচিত প্রত্যাশার বোঝা কমাবে।

৪. নারীদের পরিধেয় অলঙ্কারে সীমাবদ্ধতা

জৌনসার-বাওয়ারের অন্য অংশে গত অক্টোবরে চালু হওয়া অলঙ্কারনীতিকেও এখানে মানা হবে। কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে নারীরা কেবল তিন ধরনের গয়না পরতে পারবেন—নাকে ঐতিহ্যগত ফুলি, কানে ঝুমকি বা তুনগুল এবং গলায় কানডুড়ি বা মঙ্গলসূত্র। প্রবীণদের মতে, সোনার ভারী গহনার বাড়াবাড়ি বিশেষ করে বিয়ের মরসুমে পরিবারগুলোর জন্য বড় আর্থিক চাপ তৈরি করছিল।

৫. গ্রামবাসীদের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন

চাপ বা বিরোধিতা নয়—গ্রামবাসীরা বরং খুশি। এক পরিষদ সদস্য জানালেন—“মানুষ আসলে এসব সিদ্ধান্তে স্বস্তি পেয়েছে।” অনেকেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—যে বিয়েতে এ নিয়ম মানা হবে না, সেখানে তাঁরা অংশ নেবেন না। এভাবে অভ্যন্তরীণ সামাজিক নিয়ন্ত্রণই পর্যবেক্ষণের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠেছে।

৬. নতুন রীতি ছড়িয়ে পড়ছে আরও অঞ্চলে

খাট সাইলি বেল্ট ছাড়িয়ে এই সংস্কার এখন ছড়িয়ে পড়ছে উত্তরকাশীর কোটী ঠাকরাল ও কোটী বানাল গ্রামগুলোতে—যেখানে ডিজে ও মদ নিষিদ্ধ করে লোকসংগীতভিত্তিক উৎসবকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। চকরাতা অঞ্চলের আরও বহু গ্রাম ব্যয়বহুল রীতি বাদ দিয়ে সহজ-সরল আয়োজন বেছে নিচ্ছে—কারণ, লোকেরা মনে করছে, অতিরিক্ত দেখনদারি তরুণ প্রজন্মকে শিকড় থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

এই পরিবর্তনের সারকথা: সহজ সরল বিয়ে, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এই সবকটি অঞ্চলের বার্তা স্পষ্ট—বিয়ে হোক ঐতিহ্যের, একাত্মতার; অযথা ব্যয় বা প্রতিযোগিতার নয়। কঠোর নিয়ম চালু করে গ্রামগুলো চাইছে এমন বিয়ের আয়োজন, যা হবে সাশ্রয়ী, সংস্কৃতিমুখী ও প্রতিযোগিতাহীন।