Friday, August 14, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

জাতীয় গ্রন্থাগারের ‘সিটি হাব’ ১২ বছর পর ফের খুলল দরজা, ছাত্র-গবেষক ও বইপ্রেমীদের জন্য নতুন ঠিকানা

একদা যেখানে পড়াশোনা করতেন বাংলার খ্যাতনামা সাহিত্যিক, চলচ্চিত্রকার ও গবেষকরা, সেই ঐতিহাসিক পাঠাগার এবার আধুনিক রূপে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হল।

কলকাতার ৬, এসপ্ল্যানেড ইস্ট-এ অবস্থিত জাতীয় গ্রন্থাগারের রিডিং লাউঞ্জ দীর্ঘ ১২ বছর পর গত ৬ জুলাই পুনরায় খুলে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ভবনটির মারাত্মক কাঠামোগত ক্ষয়ের কারণে সংস্কারের কাজ চলছিল। সম্পূর্ণ সংস্কার ও আধুনিকীকরণের পর নতুন এই পাঠাগারের নাম রাখা হয়েছে ‘সিটি হাব’।

সম্পূর্ণ আধুনিক রূপে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত

সম্পূর্ণ পুনর্নির্মাণ ও অভ্যন্তরীণ সজ্জার পর এই পাঠাগার এখন সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই বিশাল হলঘরটি দুটি ভাগে বিভক্ত—একদিকে রয়েছে রিডিং লাইব্রেরি, অন্যদিকে বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই-সহ কম্পিউটার সেন্টার।
সপ্তাহের সকল কর্মদিবসে সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এবং সপ্তাহান্ত ও সরকারি ছুটির দিনে সকাল ৯টা ৩০ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এটি খোলা থাকবে এই হাব।

একসময় বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অসংখ্য ছাত্রছাত্রী ও গবেষকদের অন্যতম প্রিয় পাঠাগার ছিল এই স্থান। এখানকার উল্লেখযোগ্য পাঠকদের মধ্যে ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন এবং রাধাপ্রসাদ গুপ্ত।

সরকারি চাকরির প্রস্তুতিতে বিশেষ গুরুত্ব পাবে এই হাব।

ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগারের সমন্বয়কারী প্রতীক চৌধুরী জানান, সিটি হাব মূলত শহরের যুবসমাজকে কেন্দ্র করেই গড়ে তোলা হয়েছে।

তিনি বলেন, “ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশন (UPSC), পশ্চিমবঙ্গ সিভিল সার্ভিস (WBCS), স্টাফ সিলেকশন কমিশন (SSC)-সহ বিভিন্ন সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া পড়ুয়াদের কথা মাথায় রেখেই এই পরিকাঠামো তৈরি করা হয়েছে।”

তিনি আরও জানান, আগে এই লাইব্রেরিটি ছিল সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্র পাঠকেন্দ্র। তবে সংস্কারের জন্য ভবনটি বন্ধ হওয়ার পর সমস্ত সংরক্ষিত সংগ্রহ ভাষা ভবনে স্থানান্তর করা হয়। পুরনো সংবাদপত্রগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করায় জরুরি ভিত্তিতে সেগুলির সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের কাজ করা হয়।

জাতীয় গ্রন্থাগারের নিয়মেই চলবে সিটি হাব

প্রতীক চৌধুরীর কথায়, সিটি হাব ঠিক জাতীয় গ্রন্থাগারের মতোই পরিচালিত হবে।

বর্তমানে এখানে বই পড়তে হলে জাতীয় গ্রন্থাগারের সদস্যপদ কার্ড সঙ্গে আনতে হবে। পরিচয়পত্র দেখিয়ে আলিপুরে অবস্থিত জাতীয় গ্রন্থাগারের মূল ক্যাম্পাস থেকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই সদস্যপদ নেওয়া যাবে।

যাঁদের সদস্যপদ নেই, তাঁরাও পাঠাগারে প্রবেশ করতে পারবেন, তবে রিডিং লাউঞ্জে রাখা বই পড়ার অনুমতি পাবেন না।

পড়ুয়াদের সুবিধার জন্য আধুনিক পরিকাঠামো

ছাত্রছাত্রীদের কথা মাথায় রেখে পাঠাগারটি বিশেষভাবে সাজানো হয়েছে। ছয়জন বসার উপযোগী টেবিলগুলির মধ্যে পার্টিশন দিয়ে ব্যক্তিগত পড়াশোনার পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে আরামদায়ক লাউঞ্জ ও সোফা।

মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত বিস্তৃত বইয়ের তাক, কাঠের মেজনাইন বারান্দা এবং সেখানে পৌঁছানোর জন্য প্যাঁচানো সিঁড়ি এই পাঠাগারের নান্দনিকতাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

শীঘ্রই চালু হবে পৃথক সিটি হাব সদস্যপদ

সিটি হাবের লাইব্রেরি অ্যান্ড ইনফরমেশন অ্যাসিস্ট্যান্ট সালমান পিনজারা বলেন, “যে কেউ এখানে এসে পড়াশোনা করতে পারেন। আপাতত জাতীয় গ্রন্থাগারের সদস্যপদ প্রয়োজন হলেও খুব শিগগিরই সিটি হাবের জন্য আলাদা সদস্যপদ কার্ড চালু হবে।”

তিনি আরও বলেন, “সদস্যপদ না থাকলে ভিতরে বসা যাবে, কিন্তু বই পড়া যাবে না। সদস্যরা পাঠাগারে থাকা সব বই পড়তে পারবেন, তবে কোনও বই বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি থাকবে না।”

শহরের কোলাহল থেকে দূরে শান্ত পাঠপরিবেশ ও সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এই পাঠাগারটি শহরের ভিড় ও যানবাহনের কর্কশ শব্দ থেকে অনেকটাই মুক্ত।
বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের সুবিধার জন্য এখানে র‌্যাম্পের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে সবার জন্য সহজলভ্য পাঠাগার

সালমান পিনজারা বলেন, “এই জায়গাটি অত্যন্ত কৌশলগতভাবে নির্বাচন করা হয়েছে। যাঁরা সবসময় আলিপুরে অবস্থিত জাতীয় গ্রন্থাগারে যেতে পারেন না, তাঁরা সহজেই এখানে আসতে পারবেন। নিয়মিত পাঠকদের জন্য এটি অত্যন্ত সুবিধাজনক হবে। ইতিমধ্যেই এখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের আগমন ঘটছে এবং আগামী দিনে সেই সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আমাদের আশা। সকলের জন্য সহজে পৌঁছনো যায় এমন এই সিটি হাব আসলে জাতীয় গ্রন্থাগারেরই একটি শাখা।”