Wednesday, July 1, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

এক্সট্রিম কলকাতা: যেখানে স্কেটার, বাইকার ও মার্শাল আর্টিস্টরা খুঁজে পান একতার মঞ্চ

সপ্তাহান্তে যদি নিউ টাউনের ইকো পার্কের হেলিপ্যাড মাঠে যান, তাহলে দেখতে পাবেন এক অভিনব কমিউনিটি। চাকা আর শরীরচর্চার মধ্যেই তারা খুঁজে পান স্বাধীনতা ও সংযোগের অনুভূতি — স্কেটিং, সাইক্লিং, মার্শাল আর্টসের মাধ্যমে।

কারা যোগ দিতে পারে এখানে??
ইকো পার্কের সপ্তাহান্তের এই কমিউনিটিতে সবাই স্বাগত — শুধু দরজার বাইরে রেখে আসতে হবে সব পূর্বধারণা। এই গোষ্ঠীর বিশেষত্ব হল, এখানে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যেমন আছেন তিরিশ-চল্লিশ বছর বয়সের পেশাদার মানুষ, তেমনই আছেন আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া শিশুরাও। ‘এক্সট্রিম কলকাতা’ গত ছয় বছর ধরে মানসিক সুস্থতার উদ্দেশ্যে স্কেটিং, সাইক্লিং ও মার্শাল আর্টসের মতো কার্যকলাপকে কেন্দ্র করে একটি কমিউনিটি হিসেবে কাজ করে চলেছে।

তাদের মূল লক্ষ্য হল ভেদাভেদ ভেঙে মানুষের মধ্যে মিলের জায়গা খুঁজে বের করা। “বিবিসি আমাদের নিয়ে প্রতিবেদন করার পর রাজনৈতিক নেতারাও বুঝতে পারেন যে আমরা সত্যিই একটি বৈধ ও ইতিবাচক গোষ্ঠী। দুঃখের বিষয়, বিদেশিদের স্বীকৃতি পাওয়ার পরেই আমাদের গ্রহণযোগ্যতা মিলল,” বলেন এক্সট্রিম কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা রাহুল চক্রবর্তী। তিনি একজন স্কেটার, সংগীতশিল্পী, মার্শাল আর্টিস্ট এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মেন্টর।

তিনি আরও বলেন, “তারপর সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট (এসআরএফটিআই)-এর পড়ুয়ারা তিন মাস আমাদের সঙ্গে ছিলেন। তারা সুবিধাবঞ্চিত বাচ্চাদের বাড়িতে গিয়েছেন, আমাদের কাজ কাছ থেকে দেখেছেন এবং একটি তথ্যচিত্র তৈরি করেছেন। পুরো অভিজ্ঞতাটাই ছিল অত্যন্ত আবেগঘন।” “একটি খোলা পরিসর মানুষকে সুবিধা, শ্রেণিভেদ ও বৈষম্য সম্পর্কে যে শিক্ষা দেয়, তা কোনও তত্ত্বের বই দিতে পারে না,” যোগ করেন রাহুল।
কর্মজীবী প্রাপ্তবয়স্ক থেকে শুরু করে কিশোর-কিশোরী — সবাই একসঙ্গে জড়ো হন এই মাঠে। এখানে সব বিভেদ দূরে সরিয়ে রাখা হয়। প্রতিষ্ঠাতার বক্তব্য, “শুরুতে যখন এই কমিউনিটি গড়ে তুলছিলাম, তখন বিভিন্ন পটভূমির মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়। কেউ কেউ খুব সুবিধাপ্রাপ্ত পরিবার থেকে আসতেন, দামি সরঞ্জাম, স্কেটবোর্ড নিয়ে আসতেন। কিন্তু যখন দেখলাম তারা সুবিধাবঞ্চিত বাচ্চাদের খারাপ ব্যবহার করছে, তখন আমাকে তাদের চলে যেতে বলতে হয়েছে।” তিরিশোর্ধ্ব ইন্দ্রাণী রায়, যিনি এক্সট্রিম কলকাতার সদস্য, বলেন স্কেটিং তাঁকে উদ্বেগ মোকাবিলায় সাহায্য করে এবং স্বাধীনতার অনুভূতি দেয়।
“আমি এমন একটি পরিবারে বড় হয়েছি, যেখানে বেশিরভাগ বাইরের কার্যকলাপে ‘না’ বলা হত। একবার স্কেটিং শুরু করার পর আর পিছনে ফিরে তাকাইনি। এটা আমার নিরাপদ জায়গা, আর এই কমিউনিটির মাধ্যমে আমার মানসিক স্বাস্থ্যেরও উন্নতি হয়েছে,” বলেন ইন্দ্রাণী।

রাহুল জানান, সেনাবাহিনীর পরিবেশে বড় হওয়ার কারণে তিনি ‘সর্ব ধর্ম স্থল’-এর ধারণা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। সামরিক আবাসনে এটি এমন একটি সাধারণ প্রার্থনাস্থল, যেখানে যে কোনও ধর্মের মানুষ এসে প্রার্থনা করতে পারেন।
তবে এক্সট্রিম কলকাতার পথ একেবারে মসৃণ নয়। বড় সমস্যা হল, শহরে একটি উপযুক্ত স্কেটিং পার্কের অভাব। রাহুলের আক্ষেপ, “ভারতের অধিকাংশ বড় শহরেই স্কেটার ও সাইকেল আরোহীদের জন্য আলাদা পার্ক রয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের শহরে সেই পরিকাঠামো নেই। স্কেটিংকে একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম হিসেবে গড়ে তুলতে এটি অত্যন্ত জরুরি।” তাদের আরও সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছিল, যখন কিছু মানুষ সুযোগ নেওয়ার উদ্দেশ্যে দলে ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন।
“বিভিন্ন ধরনের মানুষ আমাদের সঙ্গে যুক্ত হতে চেয়েছিলেন। কিছু নেশাগ্রস্ত ব্যক্তিও ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন। আমরা তাদের বাদ দিয়েছি,” বলেন রাহুল। কিছু সদস্যকে নিয়েও আলাদা করে কাজ করতে হয়েছে তাঁকে।
“একটি ছেলে আছে, যার বাবা অত্যন্ত অত্যাচারী। সে এখানে অন্য বাচ্চাদের উপর দাদাগিরি করত, আসলে বাড়িতে যে হিংসার শিকার হত, সেটাই এখানে ছড়িয়ে দিত,” বলছিলেন তিনি।
তারপর?
“তাই আমি একজন শিশু মনোবিদের সঙ্গে পরামর্শ করি এবং বোঝার চেষ্টা করি, ওই বাচ্চাটির ঠিক কী প্রয়োজন। কিছুটা ধারণা পাওয়ার পর তাকে দলের মনিটর বানাই এবং একদিন আলাদা করে বসে কথা বলি। কথা বলতে শুরু করতেই সে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলে। তারপর থেকে ওর মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে।”

এ শহরের তরুণ প্রজন্ম ইতিবাচক দিশায় হাঁটতে আগ্রহী। এখন বাকি সহায়তা প্রদানের দায়িত্ব নেওয়ার সময় এসেছে।