“আজি হতে শতবর্ষ পরে, কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি কৌতুহল ভরে”…
তেরোশ বঙ্গাব্দের শুরুতে বসে রবীন্দ্রনাথের কাছে এই রকম ভবিষ্যতের কল্পনা যতটা কষ্টসাধ্য ছিল তার থেকে অনেক অনেক বেশি কষ্টকল্পনা আজকের দিনে বসে একশো বছর পরের সাহিত্যের দুনিয়াকে কল্পনা করা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতি মৌলিক সৃজনশীলতাকে যেমন প্রশ্নের মুখে ফেলেছে তেমন ভাবেই সাহিত্যের মূলাধার কাগজে ছাপানো বই ও প্রযুক্তির অগ্রগতির বাজারে কতদিন টিকবে, সেটাও এখন প্রশ্নের মুখে।
তবে ওই যে কথায় আছে, “বৃথা আশা মরিতে মরিতেও মরেনা…” আর সেই আশা যদি শিল্পীর কল্পনাপ্রসূত হয় তাহলে তো কথাই নেই। সেরকমই একটি আশার নির্মীয়মান গল্প ‘ফিউচার লাইব্রেরি’।

স্কটিশ শিল্পী কেটি প্যাটারসনের উদ্যোগে ২০১৪ সালে শুরু হয় ‘ফিউচার লাইব্রেরি’ প্রকল্প, যা ২১১৪ সালে গিয়ে সম্পূর্ণ হবে। এ শিল্পকর্মে প্রতি বছর, সারা বিশ্ব থেকে নির্বাচিত একজন লেখকের একটি করে মৌলিক পাণ্ডুলিপি যোগ হবে, যা ছাপা হয়ে বই আকারে প্রকাশিত হবে ২১১৪ সালে।
শুধু তাই নয়, এই বই ছাপা হবে সেই বিশেষ অরণ্যের কাগজে—যা ২০১৪ সালে রোপণ করা হয়েছিল নরওয়েতে।

২০১৪ সালে নরওয়ের একটি অরণ্যের কিছুটা অংশ পরিষ্কার করে ১,০০০ স্প্রুস গাছ রোপণ করা হয়। ১০০ বছর পর ২১১৪ সালে সেই গাছ থেকে তৈরি হবে এই বই ছাপার কাগজ।
আর নতুন গাছ লাগানোর জন্য অরণ্যের যেসব গাছ কাটা পড়েছিল তা দিয়ে নরওয়ের অসলো শহরের ডেইকমান বেয়ারভিকা গ্রন্থাগারের ভেতরে তৈরি হয়েছে একটি বিশেষ কক্ষ, যার নাম ‘দ্য সাইলেন্ট রুম’, যেখানে নীরবে শায়িত থাকবে একশোটি পান্ডুলিপি।
২০১৪ সালে মার্গারেট অ্যাটউডের Scribbler Moon দিয়ে শুরু হওয়া এই সংগ্রহের সব লেখা আজ সংরক্ষিত আছে ‘দ্য সাইলেন্ট রুম’-এ। ২০২৫ সালে সেই কক্ষে নিজের মৌলিক পান্ডুলিপি জমা দেওয়ার জন্য মনোনীত লেখক, ভারতের অমিতাভ ঘোষ।

এই প্রকল্পটির উদ্দেশ্য—অরণ্য, প্রকৃতি আর সাহিত্যের মাঝে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের সংযোগ তৈরি করা। এ প্রকল্পে গাছের বৃত্তচিহ্নকে কল্পনা করা হয়েছে বইয়ের অধ্যায় হিসেবে।
‘দ্য সাইলেন্ট রুম’-এর ভিতরের নক্সা তাই গাছের গুঁড়ির ভিতরের বয়স নির্ধারণকারী বলয়ের মতো। প্রকৃতি, সময় আর সাহিত্যের মধ্যে এক গভীর শারীরিক সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে করা হয়েছে এই নকশা।
অসলো শহরের ডেইকমান বেয়ারভিকা গ্রন্থাগারের এই বিশেষ কক্ষে গেলে দর্শনার্থীরা দেখতে পাবেন কাচে ঢাকা বাক্সতে সযত্নে রাখা পাণ্ডুলিপিগুলি। তবে সেগুলি পড়ার সুযোগ পাওয়া যাবে শতবর্ষ পরে।
এ প্রকল্প আসলে সমকালীন প্রজন্মের কাছে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গত প্রজন্মের এক উপহার। সমকালীন অগ্রগতির ইঁদুর দৌড়ে ব্যস্ত থাকা মানব সমাজকে এই প্রকল্প এক দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিতে উৎসাহিত করবে। ঘরের কোনে বসে ভবিষ্যতের প্রতি অনিশ্চিত দৃষ্টিভঙ্গি না রেখে, এই প্রকল্প সেই বিশ্বাসের জায়গা তৈরি করছে যেখানে আমরা সুনিশ্চিত করতে পারি যে শত বছর পরও পাঠক থাকবে, যারা এই অমূল্য সাহিত্যকর্ম গ্রহণ করবে। এবং এই ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।


