Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

সোনালি শ্রদ্ধার্ঘ্য: ফরাসি-বাংলা শিল্পী সহযোগিতায় দুর্গাপূজা প্যান্ডেলে জীবন্ত কলকাতার ঘাটচিত্র

কলকাতার দুর্গাপুজো সারা পৃথিবীতেই এক অনন্য নজির। যা ধর্মের, স্থানীয় উৎসবের আঙিনা ছাড়িয়ে বিশ্বের এক অনন্য শিল্পকলা প্রদর্শনীর মঞ্চে পরিণত হয়েছে, পেয়েছে ইউনেস্কোর হেরিটেজ এর সম্মানও। তাই উন্মাদনার সাথে সাথে স্থান ধরে রাখার দায়িত্ব ও বেড়েছে অনেকটাই।

সেকথা মাথায় রেখেই এবছর ইউরোপীয় শিল্পকলা ও বাংলার ঐতিহ্যের মেলবন্ধন নজরে পড়ল। যেখানে ঝলমলে সোনালি সুতোয় ফুটে উঠল কলকাতার ইতিহাস
কলকাতা উত্তর শহরতলির অন্যতম জনপ্রিয় দুর্গাপূজা প্যান্ডেল হাতিবাগান সর্বজনীনে এ বছর শিল্প, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের অনন্য সমন্বয়ে এক ব্যতিক্রমী শিল্পকর্মের প্রদর্শন ঘটল। ফরাসি শিল্পী থমা আনরিও(Henriot) এবং বাঙালি শিল্পী তাপস দত্ত মিলে গঙ্গার ঘাটের চিত্রকে কেন্দ্র করে ২২ ফুট বাই ৭ ফুটের এক অনন্য শিল্পকর্ম নির্মাণ করেছেন।

দুই বছরের গবেষণা ও শ্রমের ফসল এই শিল্পকর্ম, যা ঝলমলে সোনালি সুতোয় বোনা। এতে বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে বাগবাজারের ঐতিহাসিক বসুবাটি প্রাসাদ—যেখানে বহু প্রাচীন দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হত এবং পূজা শেষে সেখান থেকেই প্রতিমা বিসর্জনের জন্য গঙ্গার ঘাটে নিয়ে যাওয়া হতো।

“এটি কলকাতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুর্গাপূজাগুলির মধ্যে একটি ছিল। ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের এক অপূর্ব সমাহার। এ আমার কলকাতার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি,” জানালেন আনরিও, যিনি গত বিশ বছর ধরে কলকাতায় আসছেন নিয়মিত।

তিনি আরও বলেন, সোনালি সুতো ব্যবহার করা ছিল এক সচেতন সিদ্ধান্ত, যা ভারতীয় উপমহাদেশ অতিক্রম করা সিল্ক রুট-এর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য। কলকাতায় এই প্রথম এমন এক শিল্পকর্ম উন্মোচিত হলো, যা পরবর্তীতে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত ও ইউরোপেও প্রদর্শিত হবে। আনরিও প্রথমে উনিশ শতকের ওই প্রাসাদের একটি চিত্র আঁকেন, পরে সেটিকে বস্ত্রকলা রূপে সোনালি সুতোয় পুনর্নির্মাণ করা হয়। কলকাতার ঐতিহ্য ও স্থাপত্যই তার অনুপ্রেরণা।

ফ্রান্সের Ecole des Beaux Arts de Besançon থেকে শিক্ষালাভ করা আনরিও বর্তমানে রিও ডি জেনেইরো, হাভানা ও প্যারিসে বসবাস ও কাজ করেন। তিনি বিশ্বব্যাপী শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করেছেন। বিশেষত, তিনি পরিচিত জাপানি চালের কাগজের ৪৫ সেন্টিমিটার চওড়া ও ২৫ মিটার লম্বা স্ক্রলে কালি দিয়ে আঁকা চিত্রকলার জন্য।

“কলকাতার আসল জৌলুস দেখাতে চাই”, তাপস দত্ত বলেন, “লোকজন বারাণসীর ঘাট নিয়ে কথা বলেন, সেগুলো এত বিখ্যাত। অথচ আমাদের ঘাটও সমান সুন্দর ও ঐতিহাসিক। আমি চাই মানুষ এগুলোকে তাদের প্রকৃত জৌলুসে দেখুক। এ বছরের আমার শিল্পচর্চায় তাই সেই প্রয়াস।”
তিনি আরও জানান, কলকাতার ঘাটকে সামনে রেখে তিনি এক ধারাবাহিক চিত্রশিল্প প্রকল্প হাতে নিয়েছেন, যা কলকাতা গভর্নমেন্ট কলেজ অফ আর্ট অ্যান্ড ক্রাফটসের চার জন শিল্পীর সঙ্গে কোলাবরেশনে তৈরি হবে ।
হাতিবাগান সর্বজনীনের আয়োজকরা বলেন, থিম বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ গঙ্গার প্রাচীনতম ঘাটগুলির সঙ্গে এলাকার সান্নিধ্য।

“আমাদের ঐতিহ্য ও ইতিহাস ঘাটের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত”, বলেন এক আয়োজক।

তবে এ যৌথ উদ্যোগ কলকাতার দুর্গাপূজা মঞ্চে একেবারে প্রথম নয়। গত বছর দক্ষিণ কলকাতার বেহালা নূতন দল দুর্গাপূজায় আইরিশ শিল্পী লিসা সুইনি ও রিচার্ড ব্যাবিংটন বাঙালি শিল্পী সঞ্জীব সাহার সঙ্গে মিলে দেবী দুর্গা ও আইরিশ দেবী ডানুর এক অনন্য সংমিশ্রণ সৃষ্টি করেছিলেন। তা আয়োজিত হয়েছিল ভারত-আয়ারল্যান্ড কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে।