লন্ডন-নিবাসী ব্রিটিশ-এশিয়ান ক্ল্যারিনেটবাদক, সুরকার ও শিক্ষাবিদ অরুণ ঘোষ-এর কাছে এই মাসের শুরুতে(৮ ফেব্রুয়ারি) কলকাতায় তাঁর প্রথম পারফরম্যান্স ছিল এক গভীর আবেগের প্রত্যাবর্তন। নেতাজি সুভাষ ইনডোর স্টেডিয়াম-এ সেতারশিল্পী অনুষ্কা শংকর-এর সঙ্গে একই মঞ্চে পরিবেশনাকে তিনি আখ্যা দিলেন ‘হোমকামিং’ হিসেবে।
মিডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ঘোষ বলেন, “কলকাতা আমার কাছে আবেগ, বৌদ্ধিক এমনকি আধ্যাত্মিক দিক থেকেও গভীর অর্থ বহন করে। অনুষ্কার পাশে থেকে এখানে পারফর্ম করা এই অভিজ্ঞতাকে আরও বিশেষ করে তুলেছে।”
৪৯ বছর বয়সি ঘোষ জানান, “কলকাতার মানুষ অনুষ্কা ও তাঁর বাবা, পন্ডিত রবি শঙ্করের প্রতি যে ভালোবাসা অনুভব করেন, তা স্পষ্ট এবং অসাধারণ। চারদিক থেকে সেই ভালোবাসা অনুভব করা এবং এই সঙ্গীত ঐতিহ্যের অংশ হতে পারা ছিল দারুণ অভিজ্ঞতা।”
কনসার্টের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে আমি অনুভব করেছি, আমার সুর ও পরিবেশনের ধরন কলকাতার শ্রোতারা মন দিয়ে শুনেছেন, অনুভব করেছেন এবং বুঝেছেন। অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছি। মনে হয়েছে, খুব ছোট পরিসরেই হোক, আমি এবং আমার সঙ্গীত যেন এই শহরেরই অংশ। মঞ্চে নিজের সঠিক মূল্যায়ন হয়েছে বলে মনে হয়েছে—এটা আমার কাছে ভীষণ অর্থবহ।”
ঘোষের ইনস্টাগ্রাম বায়োতে লেখা রয়েছে—“Conceived in Calcutta, bred in Bolton, matured in Manchester & now living in London”। অর্থাৎ জন্মসূত্রে কলকাতার, বেড়ে ওঠা ইংল্যান্ডের উত্তরে—প্রথমে বোল্টন, তারপর ম্যানচেস্টার—আর এখন স্থায়ী ঠিকানা লন্ডন।
এই ভৌগোলিক পরিসর তাঁর সঙ্গীতে কীভাবে প্রভাব ফেলেছে?
ঘোষ জানান, তাঁর বাবা পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার বাসিন্দা ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই বাবার মাধ্যমে তিনি বাংলা গান—বিশেষ করে রবীন্দ্রসংগীত—এবং ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রতি গভীর অনুরাগ অর্জন করেন।
পাশাপাশি ঘোষ ইউরোপীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও জ্যাজ-এ প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তিনি বলেন, “রক, রেগে, পাঙ্ক, হিপ-হপ, ষাটের দশকের সঙ্গীত, ড্রাম ’এন’ বেস এবং ম্যানচেস্টারের রেভ সংস্কৃতির সঙ্গীত—এসবের মধ্যেই বড় হয়ে উঠেছি।”
তিনি স্মরণ করেন, রবি শঙ্কর এবং বিসমিল্লাহ খান ছিলেন তাঁর বড় প্রেরণা।
ঘোষ বলেন, “মঞ্চে তবলা বাদক ও ভরতনাট্যম নৃত্যশিল্পীদের সঙ্গে পরিবেশনার মাধ্যমে আমি তাল শেখা শুরু করি। একইসঙ্গে রবীন্দ্রসংগীত শেখা ও পরিবেশনাও শুরু করি। আমার প্রথম অ্যালবাম ‘নর্দান নমস্তে’-তে ‘ও আমার দেশের মাটি’ রেকর্ড করেছি। বাউল সঙ্গীতের প্রতিও গভীর ভালোবাসা জন্মায়। খুব দ্রুত বুঝতে পারি, এই সুরগুলিই আমার ঘর এবং পরিচয়ের সুর—আর সেগুলিকে ধীরে ধীরে আমার নিজস্ব সৃষ্টিতে অন্তর্ভুক্ত করতে শুরু করি।”
তিনি জানান, তাঁর নতুন একটি সৃষ্টির নাম ‘দ্য হুগলি উইভার’—যেখানে এই সমস্ত প্রভাব একসূত্রে গাঁথা হয়েছে। চলতি বছরের শেষের দিকে এটি প্রকাশিত হবে।
২০০৮ সালে ঘোষ নির্বাচিত হন Jerwood/PRS ফাউন্ডেশন -এর ‘টেক ফাইভ’ উদ্যোগে, যা যুক্তরাজ্য ও ইউরোপ জুড়ে তাঁর জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এক বছর পর তিনি জার্মানির ‘jazzahead!’ উৎসবে যুক্তরাজ্যের শোকেসের অংশ হন, যেখানে ইউরোপীয় প্রোমোটারদের নজর কাড়েন।
২০১০ সালে তিনি লন্ডনের দ্য অ্যালবানি থিয়েটার -এর অ্যাসোসিয়েট আর্টিস্ট হন এবং ২০১১ সালে সাউথব্যাংক সেন্টার-এর ‘অ্যালকেমি ফেস্টিভ্যাল’ -এ আর্টিস্ট-ইন-রেসিডেন্স হিসেবে মনোনীত হন। একই বছরে ‘Jazzwise’ তাঁকে প্রচ্ছদ শিল্পী হিসেবে স্থান দেয়।
২০১২-র লন্ডন অলিম্পিক এবং প্যারালিম্পিকে তিনি ছিলেন BT Celebrity Storytellers-দের অন্যতম।
সাংস্কৃতিক অলিম্পিয়াড চলাকালীন ‘BT River of Music Festival’-এ তাঁর প্যান-এশিয়ান চেম্বার অর্কেস্ট্রা ‘Arkestra Makara’-র সঙ্গে পরিবেশনাও করেন। আন্তর্জাতিক সফরে তিনি ইউরোপ, ভারত, মধ্যপ্রাচ্য ও চিনে সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন।
পুরস্কারও এসেছে একের পর এক—২০১৪ ও ২০১৮ সালে Parliamentary Jazz Awards-এ ‘Jazz Instrumentalist of the Year’ সম্মানে ভূষিত হন তিনি।
ভারতে, বিশেষ করে কলকাতায় অনুষ্কার সঙ্গে পারফর্ম করা ঘোষের কাছে ছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতা। তিনি বলেন, “ঘরের কাছাকাছি থাকার এই অনুভূতিটা খুব গভীর। যুক্তরাজ্য যখন সামাজিক ও ভাবাদর্শগতভাবে ক্রমশ বিভক্ত হয়ে পড়ছে, তখন একজন মানুষ ও সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে ‘ঘরে’ ফেরার আকাঙ্ক্ষা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।”
শেষে অনুষ্কা সম্পর্কে ঘোষ বলেন, “অনুষ্কা অসাধারণ এক এনসেম্বল লিডার ও সুরকার। মঞ্চে তিনি কী উপস্থাপন করতে চান, তার ভাবনা ও ধারণা সবসময় অত্যন্ত স্পষ্ট। একইসঙ্গে তিনি আমাদের প্রত্যেককে সঙ্গীতের মাধ্যমে নিজস্ব প্রকাশের পরিসর দেন—এটাই তাঁর উদার শিল্পীসত্তার প্রমাণ।”


