ঔপনিবেশিক আমল থেকে আইনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত টেম্পল চেম্বার্স। এই ভবনই যেমন অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল একটি কালজয়ী বাংলা সাহিত্যকর্মকে, তেমনই এখান থেকেই শুরু হয়েছিল কলকাতার প্রথম লাইভ রেডিও সম্প্রচার।
কলকাতার ওল্ড পোস্ট অফিস স্ট্রিট-এ অবস্থিত টেম্পল চেম্বার্স আজ বাইরে থেকে কিছুটা জীর্ণ ও অবহেলিত মনে হলেও, তার বিবর্ণ দেওয়ালের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে শহরের অন্যতম গৌরবময় ঐতিহ্যের ইতিহাস। কলকাতা পুরসভার স্বীকৃত এই ঐতিহ্যবাহী ভবনটি এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সেই একই উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, যে উদ্দেশ্যে এটি নির্মিত হয়েছিল—দ্রুত বদলে যাওয়া কলকাতায় যা সত্যিই বিরল এক ধারাবাহিকতার নজির।

এই ভবনের নকশা তৈরি করেছিলেন স্থপতি ভিনসেন্ট জে. এস্ক, যিনি পরবর্তীকালে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল-এর নকশা নির্মাণেও যুক্ত ছিলেন। একসময় টেম্পল চেম্বার্স ছিল শহরের অন্যতম অভিজাত বাণিজ্যিক ঠিকানা। কিন্তু আজ তার সর্বত্রই অবহেলার ছাপ স্পষ্ট।
ইতিহাস অনুরাগী দীপাঞ্জন ঘোষ তাঁর ব্লগে লিখেছেন, “একসময় ভবনটি ছিল অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। কিন্তু এখন সর্বত্রই অবহেলার চিহ্ন স্পষ্ট। ভবনের বাইরের অংশের কিছু জায়গা দখল করে নিয়েছেন বস্তিবাসী ও ফুটপাথবাসীরা। বাইরের দেওয়ালে সিমেন্টের প্রলেপ দেওয়া হলেও কোথাও রং করা হয়নি। তবুও টেম্পল চেম্বার্স এখনও কলকাতার সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অনেকের কর্মক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।”

১৮৬২ সালে কলকাতা হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠার পর ওল্ড পোস্ট অফিস স্ট্রিট ধীরে ধীরে শহরের প্রধান আইনপাড়া হিসেবে গড়ে ওঠে। সেই সময় থেকেই টেম্পল চেম্বার্স হয়ে ওঠে আইনজীবীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা। এখানেই তাঁরা মক্কেলদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন, মামলা সংক্রান্ত আবেদনপত্র প্রস্তুত করতেন এবং শহরের বহু গুরুত্বপূর্ণ মামলার আইনি কৌশল নির্ধারণ করতেন।
বিজ্ঞানী ও লেখক ড. কৌশিক মজুমদার বলেন, “কলকাতার প্রাচীনতম রাস্তাগুলির একটিতে অবস্থিত এই ভবনটি শহরের প্রশাসনিক, বিচার বিভাগীয় ও বাণিজ্যিক ইতিহাসের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। স্থাপত্যের দিক থেকে এটি হয়তো খুব জাঁকজমকপূর্ণ নয়, কিন্তু অসংখ্য ঐতিহাসিক সাংবিধানিক, রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও দেওয়ানি মামলার প্রস্তুতির নেপথ্য মঞ্চ ছিল এই ভবন।”

আইনি গুরুত্বের পাশাপাশি টেম্পল চেম্বার্স কলকাতার নগর বিকাশের ইতিহাসেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী।
ইতিহাসবিদ প্রিয়াঙ্কা তালুকদার বলেন, “স্থাপত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ভবনটি ইউরোপীয় নকশাকে বাংলার আবহাওয়ার উপযোগী করে রূপান্তরিত করেছিল। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ঔপনিবেশিক স্থাপত্যকে এখানে সরাসরি অনুকরণ করা হয়নি; বরং স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া হয়েছিল।”
সাহিত্যের ইতিহাসেও টেম্পল চেম্বার্স এর ভূমিকা অনস্বীকার্য।
এই ভবনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলা সাহিত্যেরও এক অমূল্য অধ্যায়। ড. কৌশিক মজুমদার জানান, প্রখ্যাত সাহিত্যিক মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায় (শংকর) ব্রিটিশ ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডরিক বারওয়েল-এর অধীনে এই টেম্পল চেম্বার্সেই কাজ করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে তাঁকে অনুপ্রাণিত করে তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘কত অজানারে’ রচনায়।

কলকাতার প্রথম লাইভ রেডিও সম্প্রচারেরও সাক্ষী এই ভবন।
প্রত্নতত্ত্ব গবেষক তথাগত নিয়োগী তাঁর X (প্রাক্তন টুইটার) পোস্টে উল্লেখ করেছেন, ১৯১৮ সালে এই ভবন থেকেই কলকাতার প্রথম লাইভ রেডিও সম্প্রচার অনুষ্ঠিত হয়েছিল। একটি সঙ্গীতানুষ্ঠান প্রায় তিন মাইল ব্যাসার্ধের মধ্যে সম্প্রচার করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে ১৯২৬ সালে এটি স্থায়ী বেতার কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যা পরবর্তীতে অল ইন্ডিয়া রেডিও-র সূচনার ভিত্তি স্থাপন করে।
আজও জীবন্ত এক ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই বাড়িটি।
বহু বছরের ইতিহাস পেরিয়েও আজ টেম্পল চেম্বার্স শুধুমাত্র একটি জীর্ণ ঔপনিবেশিক যুগের অফিস ভবন নয়। ইতিহাসবিদ প্রিয়াঙ্কা তালুকদারের কথায়, “এটি এখনও কলকাতার আইনি ঐতিহ্য, স্থাপত্যের বিবর্তন এবং শহরের দীর্ঘস্থায়ী নগর ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে রয়েছে।”


