Friday, August 14, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

রান ক্লাব থেকে জুম্বা, পিলাটিস: সময়ের মানচিত্রে বদলে যাচ্ছে কলকাতার ফিটনেস সংস্কৃতি

একসময় বাঙালীর শরীরচর্চা মানে ছিল গঙ্গার ঘাটে মুগুর ভাজা আর কুস্তি লড়া। পরবর্তিতে আসে কঠিন যোগাসন, তবে সবই ছিল কতিপয় ব্যক্তির গন্ডিতে আবধ্য। সময়ের সাথে সাথে বেড়েছে সচেতনতা, নাগালে এসেছে তথ্য ভিত্তিক জ্ঞান তাই ব্যক্তিগত সুস্থতা ও আনন্দময় শরীরচর্চার দিকে ঝুঁকছে কলকাতা, কঠোর ব্যায়ামের বদলে বাড়ছে নতুন ধরনের ফিটনেস চর্চার জনপ্রিয়তা

বহু বছর ধরে কলকাতায় ফিটনেস মানেই ছিল মূলত দুটি জগৎ— জিম এবং যোগব্যায়াম। কিন্তু এখন শহরের সুস্থতা-সংস্কৃতিতে দ্রুত পরিবর্তন আসছে। একঘেয়ে ট্রেডমিল রুটিন ছেড়ে আজকের কলকাতাবাসী এমন সব মুভমেন্ট-ভিত্তিক ওয়ার্কআউট বেছে নিচ্ছেন, যা কঠোর ও বিরক্তিকর ব্যায়ামের পরিবর্তে অনেক বেশি বিনোদনমূলক ও শৌখিন কর্মকাণ্ডের মতো অনুভূত হয়।

কলকাতার ফিটনেস ট্রেনার রোহন গুহ বলেন,
“জিমে না গিয়েও বা যোগব্যায়ামের ক্লাসে অংশ না নিয়েও নারী-পুরুষ উভয়ের পক্ষেই অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রাকে স্বাস্থ্যকর জীবনে রূপান্তর করা সম্পূর্ণ সম্ভব। এর মূল চাবিকাঠি হলো বুঝতে হবে যে, অলস জীবনযাপন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অনিয়মিত ঘুম এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ— এই চারটি বিষয়ই অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার প্রধান ভিত্তি। এগুলো বদলাতে দামী যন্ত্রপাতি বা জিমের সদস্যপদের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন শুধু প্রতিদিনের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা।”

তিনি আরও বলেন,
“এখন মানুষ আর ফিটনেসকে শাস্তির মতো অনুভব করতে চায় না। তারা এমন ফিটনেস রুটিন চায়, যা আকর্ষণীয়, নমনীয় এবং মানসিকভাবে সতেজ করে।”

ডান্স ফিটনেস ক্লাস, রান ক্লাব, পিকলবল কোর্ট, সাঁতার, সাইক্লিং গ্রুপ এবং ক্যালিসথেনিক্স সেন্টারের মতো নানা বিকল্পের মাধ্যমে কলকাতায় ফিটনেস আর শুধু ওজন তোলা বা নিখুঁত যোগাসন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন আরও সামাজিক, পরীক্ষামূলক এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— আরও আনন্দদায়ক হয়ে উঠছে।
প্রচলিত জিমের সদস্যপদ যেখানে কয়েক মাসের মধ্যেই অনেকের কাছে আকর্ষণ হারায়, সেখানে ডান্স ফিটনেস ক্লাস মানুষকে এমনভাবে আকৃষ্ট করছে, যাতে ব্যায়াম আর ভীতিকর মনে না হয়ে বরং অনেক বেশি প্রাণবন্ত ও অংশগ্রহণমূলক হয়ে ওঠে। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে এখন জুম্বা সেশন, সালসা ওয়ার্কশপ এবং উচ্চ-শক্তির ডান্স কার্ডিও ক্লাসের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে।

ডান্স ফর ফিটনেস স্টুডিও, সাংভি, সালসাওয়ালা স্টুডিও এবং টী সী ফিটনেস সেন্টার -এর মতো স্টুডিওতে তরুণ পেশাজীবী, কলেজপড়ুয়া এবং প্রবীণরাও ভিড় করছেন। কারণ এখানে শরীরচর্চার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতাও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে এবং একঘেয়েমিও কাটছে।

রান ক্লাব:

শহরের বিভিন্ন কমিউনিটি, যেমন আওয়ারা কমিউনিটি, সপ্তাহান্তে তরুণ ফিটনেসপ্রেমীদের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। কারণ এখানে দৌড়ানোর পাশাপাশি জমে ওঠে আড্ডাও।

আজকের সময়ে যখন আন্তরিক যোগাযোগ এবং সত্যিকারের মানবিক সম্পর্ক ক্রমশ দুর্লভ হয়ে উঠছে, তখন এই ধরনের আয়োজন বিশেষ করে তাঁদের জন্য অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক, যারা সম্প্রতি কলকাতায় এসেছেন এবং এখনও নিজের সামাজিক পরিমণ্ডল গড়ে তুলছেন।
প্রতি শনিবার প্রায় ১০ থেকে ১২ জন অংশগ্রহণকারী সল্টলেকের বেইলি ব্রিজ থেকে ক্যালকাটা 64 ক্যাফে পর্যন্ত একসঙ্গে জগিং করেন। ফিটনেসের পাশাপাশি চলে গল্প-আড্ডাও। দল ইচ্ছাকৃতভাবেই ছোট রাখা হয়, যাতে সবাই সহজে একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।

পেশায় মনোবিজ্ঞানী এবং কমিউনিটির সদস্য সুমন সেন বলেন,
“উদ্দেশ্য ম্যারাথন দৌড়ানো নয়। মানুষকে বাড়ি ও কর্মস্থলের বাইরে এনে নতুন বন্ধু তৈরি করার সুযোগ করে দেওয়াই মূল লক্ষ্য। অনেকেই কাজের সূত্রে কলকাতায় আসেন এবং এখানে খুব বেশি মানুষকে চেনেন না। এই ধরনের অনুষ্ঠান তাঁদের সামাজিকভাবে মিশতে সাহায্য করে।”

সাইক্লিং ক্লাব:

শহর পুরোপুরি জেগে ওঠার আগেই কলকাতার রাস্তায় সাইকেল চালাতে দেখা যায় অসংখ্য মানুষকে। ময়দান, রেড রোড, প্রিন্সেপ ঘাট থেকে নিউ টাউন— শহরের নানা প্রান্তে টু হুইলস কলকাতা এবং সাইকেল নেটওয়ার্ক গ্রো -এর মতো সাইক্লিং কমিউনিটি দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। এর ফলে সাইকেলের প্রতি কলকাতার বহু পুরনো ভালোবাসাও নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে।

সাঁতার ক্লাব:

কলকাতায় ক্রমবর্ধমান গরমের মধ্যে ফিট থাকার অন্যতম সেরা উপায় হতে পারে সাঁতার— অবশ্যই যদি আপনি সাঁতার জানেন। এটি এমন একটি পূর্ণাঙ্গ শরীরচর্চা, যেখানে গরমে ঘেমে-নেয়ে একাকার হতে হয় না।

শহরের বিভিন্ন সুইমিং ক্লাব এখন ফিটনেসপ্রেমীদের আকৃষ্ট করছে। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল স্বপ্ননীল সুইমিং ক্লাব, প্রশান্ত মেমোরিয়াল সুইমিং ট্রেনিং সেন্টার এবং ক্যালকাটা ক্লাব।

বিনোদনমূলক খেলাধুলা:

কলকাতার বদলে যাওয়া ফিটনেস সংস্কৃতিতে বড় ভূমিকা রাখছে বিনোদনমূলক খেলাধুলাও। টেনিস, ব্যাডমিন্টন এবং টেবিল টেনিসের মিশ্রণে তৈরি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠা প্যাডেল স্পোর্ট পিকলবল এখন শহরের নগর ফিটনেসপ্রেমীদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। আওয়ারা কমিউনিটি -এর মতো সংগঠনগুলি সপ্তাহান্তে নিয়মিত পিকলবল সেশনের আয়োজন করছে, যা একদিকে যেমন শরীরচর্চা, অন্যদিকে তেমনি সামাজিক যোগাযোগেরও মাধ্যম।
আওয়ারা কমিউনিটি-এর প্রতিষ্ঠাতা আদি রায় বলেন,
“আমরা ক্রিকেট দিয়ে শুরু করেছিলাম। এখন প্রতি সপ্তাহে শুক্রবার থেকে রবিবার পর্যন্ত নিয়মিত পিকলবল এবং ব্যাডমিন্টন সেশনের আয়োজন করি। সম্প্রতি মেয়েদের ক্রিকেটও শুরু করেছি। অনেক দিক থেকেই এগুলো ঘরে বসে কাজ করার অলস জীবনযাত্রার কার্যকর প্রতিষেধক। আমরা বুঝেছি, সেরা ফিটনেস রুটিন একা ব্যায়াম করা নয়, বরং এমন একটি খেলা যেখানে অচেনা মানুষও সতীর্থ হয়ে ওঠে।”

২৮ বছর বয়সি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এবং সদস্য ময়ূখ দাস বলেন,
“পিকলবল আমার ফিটনেস অনেকটাই উন্নত করেছে। দ্রুতগতির পার্শ্বচলন এবং দীর্ঘ সময় ধরে কার্ডিওভাসকুলার পরিশ্রমের সমন্বয়ে এটি ক্যালরি ঝরায়, পাশাপাশি আমার ক্ষিপ্রতা, প্রতিক্রিয়া ক্ষমতা এবং সহনশক্তিও অনেক বাড়িয়েছে।”

এছাড়াও স্কেটিং ক্লাব, মার্শাল আর্টস স্টুডিও, ব্যাডমিন্টন গ্রুপ, অপেশাদার ক্রিকেট ক্লাব এবং বাস্কেটবল কমিউনিটিগুলিও এমন মানুষদের আকৃষ্ট করছে, যারা একঘেয়ে ব্যায়ামের বদলে আনন্দময় ও সামাজিক শরীরচর্চার বিকল্প খুঁজছেন।

পিলাটিস:

যাঁদের উচ্চ-তীব্রতার ওয়ার্কআউট পছন্দ নয়, তাঁদের জন্য পিলাটিস হতে পারে আদর্শ বিকল্প। এটি কম-প্রভাবযুক্ত একটি মন-শরীরভিত্তিক ব্যায়াম, যেখানে মূল গুরুত্ব দেওয়া হয় কোর শক্তি, নমনীয়তা, শরীরের ভঙ্গি এবং নিয়ন্ত্রিত সচেতন চলাফেরার ওপর।

রোহন গুহ বলেন,
“স্থায়ী পরিবর্তন আনতে কয়েকটি মূল নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তীব্রতার চেয়ে ধারাবাহিকতাই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”

কলকাতার ফিটনেস ট্রেনার স্মৃতি মণ্ডল বলেন,
“বিশেষ করে নারীদের জন্য পিলাটিস, স্ট্রেচিং এবং সার্কিট ট্রেনিং শরীরের নমনীয়তা, কোর শক্তি, মানসিক শান্তি, হরমোনের ভারসাম্য এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকর।”

শহরের জনপ্রিয় পিলাটিস স্টুডিওগুলির মধ্যে রয়েছে দ্যা পিলাটিস স্টুডিও কলকাতা বাই নম্রতা পুরোহিত এবং পিলাটিস ট্রাইব।

ক্যালিসথেনিক্স:

কলকাতার ফিটনেসপ্রেমীদের মধ্যে আরেকটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ধারা হলো ক্যালিসথেনিক্স— যেখানে জিমের যন্ত্রপাতির বদলে নিজের শরীরের ওজন ব্যবহার করেই শক্তি বৃদ্ধি করা হয়।

শহরের বিভিন্ন পার্ক এবং উন্মুক্ত ব্যায়ামস্থল এখন পুল-আপ, মাসল-আপ এবং ফ্রিস্টাইল ওয়ার্কআউটের কেন্দ্র হয়ে উঠছে। সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবেও তরুণদের মধ্যে ক্যালিসথেনিক্সের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে এবং স্ট্রিট ওয়ার্কআউটভিত্তিক কমিউনিটিগুলিও ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। এ কে ইন্ডিয়ান ক্যালিসথেনিক্স এই ধরনের অন্যতম জনপ্রিয় ফিটনেস কেন্দ্র।

সবশেষে স্মৃতি মণ্ডল বলেন,
“শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা মানে দামী জিমের সদস্যপদ নয়; বরং প্রতিদিনের নিয়মানুবর্তিতা এবং নিজের প্রতি যত্নশীল হওয়াই আসল বিষয়।”