Monday, June 29, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

‘সবাই যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখনই আমার দিন শুরু হয়’ — ৪০ বছর বয়সে পাওয়ারলিফটিংয়ে স্বপ্ন ছুঁতে চলেছেন অদিতি নন্দী

কলকাতার এইচ আর কর্পোরেট লীডার ও পাওয়ারলিফটার অদিতি নন্দী ইউডব্লিউএসএফএফ (UWSFF) ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলার একমাত্র প্রতিনিধিত্ব করতে পাটায়ায় সোনার লক্ষ্যে মাঠে নামছেন।

নভেম্বরের শেষদিকে, যখন অধিকাংশ পর্যটক রোদ আর সমুদ্রের টানে থাইল্যান্ডের পাটায়ায় পৌঁছবেন, তখন অদিতি নন্দীর সফরের উদ্দেশ্য হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইউডব্লিউএসএফএফ (UWSFF) ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ প্রো পাওয়ারলিফটিংয়ে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করা। পশ্চিমবঙ্গের একমাত্র প্রতিযোগী হিসেবে ‘Aaditi ND’ নামে মাস্টার ১, ৫২ কেজির নিচের ওজন বিভাগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন অদিতি।

“আমার বয়স তো সবে ৪০ হল,” হাসতে হাসতেই বললেন তিনি। যেন নিজের ক্রীড়াজীবনের শুরুটা এত দেরিতে হওয়ায় নিজেই অবাক। “যে সময়ে বেশিরভাগ মানুষ খেলাধুলা ছেড়ে দেন বা খুব নিয়মমাফিক জীবন বেছে নেন, সেই সময়েই আমি পাওয়ারলিফটিং শুরু করেছি। এটাই আমি করতে চেয়েছি। এটাই বেছে নিয়েছি।”

অদিতির মধ্যে ছোটবেলা থেকেই ছিল নতুন কিছু করার তাগিদ। “খেলাধুলা বা অ্যাডভেঞ্চার— সবসময়ই এমন কিছু আমাকে টানত, যা খুব সাধারণ নয়,” বললেন তিনি।

ট্রেকিং, সামান্য পর্বতারোহণ— প্রকৃতির মধ্যে নিজেকে চ্যালেঞ্জ জানানোই ছিল তাঁর নেশা।

তবে শক্তি বাড়ানোর প্রশিক্ষণ বা স্ট্রেংথ ট্রেনিং শুরু হয় অনেক পরে, কোভিড মহামারির সময়।

“আমার ওজন অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল,” জানালেন তিনি। সেই অতিরিক্ত ওজন ঝরাতেই ওয়েট ট্রেনিং শুরু করেছিলেন। এক প্রশিক্ষক তাঁকে ডেডলিফট ও স্কোয়াট শেখান।

“পাওয়ারলিফটিং কী, সে সম্পর্কে আমার কোনও ধারণাই ছিল না। শুধু শরীরচর্চা করছিলাম। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার কথা মাথাতেও আসেনি।”

এরপর একদিন সংবাদপত্রে জেলা স্তরের পাওয়ারলিফটিং ট্রায়ালের বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে। সেই একটি বিজ্ঞাপনই বদলে দিল জীবন।

কৌতূহলবশত এক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এই খেলায় কী করতে হয়।

“সে বলল, পাওয়ারলিফটিং মূলত তিনটি ইভেন্ট— স্কোয়াট, বেঞ্চ প্রেস আর ডেডলিফট। সবাই বলছিল আমার ডেডলিফট খুব ভালো। তখন ভাবলাম, চেষ্টা করে দেখি না কেন?”

সরকারি ট্রায়ালের দিন মিস হয়ে গেলেও, আয়োজকরা তাঁকে জাতীয় জুরির কাছে একটি ভিডিও পাঠানোর সুযোগ দেন। সেই ভিডিও অনুমোদিত হয়।

“আমি কোথায় যাচ্ছি বা পাওয়ারলিফটিং কী— আমার পরিবারের কেউই তখন জানত না,” বললেন তিনি।

সুরাটে অনুষ্ঠিত জাতীয় প্রতিযোগিতা ছিল সম্পূর্ণ নতুন এক অভিজ্ঞতা।

পশ্চিমবঙ্গ থেকে গিয়েছিলেন দু’জন পুরুষ ও একজন মহিলা প্রতিযোগী— অর্থাৎ অদিতি।

“প্রতিযোগিতার ব্যাপ্তি দেখে ওই দু’জন পুরুষ প্রতিযোগী ভয় পেয়ে ফিরে যান। পালিয়েই গেলেন,” হেসে বললেন তিনি। “শেষ পর্যন্ত আমি একাই ছিলাম।”

মাত্র ৪৫ কেজি ওজন নিয়ে, কোনও কোচ ছাড়াই প্রায় ৭০ কেজি তুলেছিলেন তিনি এবং জিতে নিয়েছিলেন রুপোর পদক।

“সেই লিফটটাই আমার ভিতরে অনেক কিছু বদলে দিয়েছিল,” বললেন অদিতি।

খেলায় আরও এগোতে হলে প্রয়োজন ছিল সঠিক দিশা।

“বন্ধু ও পরিবার বলেছিল, যদি সত্যিই সিরিয়াস হই, তাহলে একজন ভালো কোচের কাছে যেতে হবে।”

সাধারণ জিম ট্রেনারের কাছে তিনি যেতে চাননি।

“সব ট্রেনার কোচ নন,” দৃঢ়ভাবে বললেন তিনি।

প্রথমে একজন অনলাইন কোচের কথা ভেবেছিলেন। পরে বুঝলেন, সামনে থেকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো কাউকেই দরকার।

সেই সময় পরিচয় হয় কলকাতার পাওয়ারলিফটিং চ্যাম্পিয়ন জেসন মার্টিন-এর সঙ্গে।

“উনি শুধু আমার ন্যাশনাল প্রতিযোগিতার ভিডিও আর আমার লক্ষ্য জানতে চেয়েছিলেন।”

ভিডিও দেখে প্রথমে এমন পারিশ্রমিক চেয়েছিলেন, যা অদিতির সাধ্যের বাইরে ছিল। কিন্তু পরে সিদ্ধান্ত বদলান।

“উনি বলেছিলেন, ‘তোমার মধ্যে আমি ক্ষুধা দেখেছি। এই বয়সে যখন বেশিরভাগ মেয়েরা পার্টি করতে ব্যস্ত থাকে, তখন তুমি এমন একটি বিশেষ ধরনের খেলাকে বেছে নিয়েছ।’”

জেসন শুধুমাত্র ন্যাচারাল অ্যাথলিটদের প্রশিক্ষণ দেন।

“ওঁর ট্রেনিং ক্যাম্পে আমরা মাত্র দু’জন ন্যাচারাল লিফটার ছিলাম,” জানালেন অদিতি।

আজও জেসন তাঁর শক্তি, দুর্বলতা, কাজের সময় এবং মানসিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে আলাদা ট্রেনিং পরিকল্পনা তৈরি করেন।

“আমি মানসিকভাবে ক্লান্ত থাকলেও উনি সেটা বুঝতে পারেন। আমাকে ‘চ্যাম্প’ বলে ডাকেন।”

পাওয়ারলিফটিংয়ের পাশাপাশি অদিতি এসপিএমএল ইনফ্রা লিমিটেড-এ (SPML Infra Limited) একটি গুরুত্বপূর্ণ এইচআর পদে কর্মরত।

“সকাল ৯টায় বাড়ি থেকে বেরোই, ১০টায় অফিসে পৌঁছই। তারপর শুরু হয় দীর্ঘ কর্মদিবস— মিটিং, ওয়ান-টু-ওয়ান আলোচনা, নিয়োগ, কর্মী উন্নয়ন কর্মসূচি— সব মিলিয়ে ভীষণ মানসিক চাপ থাকে।”

এরপরই শুরু হয় তাঁর দ্বিতীয় জীবন।

“যখন সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখনই আমার দিন শুরু হয়।”

অফিস থেকে সরাসরি জিমে যান তিনি। বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় ৯টা ৪৫।

সংস্থাও সবসময় তাঁর পাশে থেকেছে।

“এশিয়া চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়ার খরচও সংস্থা বহন করেছিল। ওরা সবসময় বলেছে, আমার যদি কোনও সাহায্যের দরকার হয়, তারা পাশে থাকবে।”

প্রথমদিকে পরিবারও এই খেলাকে ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি।

“ভারতে সবাই ক্রিকেট, ফুটবল বা ব্যাডমিন্টন চেনে। পাওয়ারলিফটিং সম্পর্কে প্রায় কেউই জানে না।”

সবকিছু বদলে যায়, যখন দ্য টেলিগ্রাফ-এ তাঁর প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

“মাকে সবাই বলছিল, আপনার মেয়ের খবর কাগজে বেরিয়েছে। মা খুব খুশি হয়েছিলেন— কারণ সেটা সঠিক কারণেই হয়েছিল।”

এরপর ধীরে ধীরে পরিবারের সবাই তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠেন।

“আমার পরিবার, আমার সঙ্গী, শ্বশুরবাড়ির সবাই— সবাই আমার সবচেয়ে বড় ভরসা।”

খুব অল্প বয়সেই বাবাকে হারিয়েছিলেন অদিতি।

“আমার মনে হয়েছিল, আমি জীবনের সবচেয়ে নিচের স্তরটা ইতিমধ্যেই দেখে ফেলেছি। সেখান থেকে যদি উঠে দাঁড়াতে পারি, তাহলে আর কোনও চ্যালেঞ্জই অসম্ভব নয়।”

একটি জাতীয় প্রতিযোগিতার আগে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিলেন তিনি।

সেরে উঠতে গিয়েই অনুশীলনের সময় কমে যায়।

“খুব খারাপ দিনও এসেছে। মন ভেঙেছে, হোঁচট খেয়েছি। কিন্তু পরিবার আর বন্ধুরা আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।”

এশিয়া চ্যাম্পিয়নশিপের অভিজ্ঞতা ছিল আরও কঠিন।

পারিবারিক অনুষ্ঠান, বিমানের বিলম্ব এবং শরীরে ডিহাইড্রেশন— সব মিলিয়ে তিনি ভেবেছিলেন, প্রতিযোগিতায় অংশই নিতে পারবেন না।

তারপরও জিতে নেন রুপোর পদক।

“তবুও মন খারাপ ছিল। কারণ আমি নিজের ১১০ শতাংশ দিয়েছিলাম।”

সেই সময় আবারও কোচ জেসন তাঁকে ফল ভুলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

ভারতে পাওয়ারলিফটিং এখনও মূলত নিজের অর্থে চালিয়ে যেতে হয়।

“যাতায়াত, বিমানের টিকিট, হোটেল, সরঞ্জাম— সব কিছুর খরচ আমাকেই বহন করতে হয়।”

স্পনসরশিপ খুবই বিরল।

এর পাশাপাশি ডোপিংও এই খেলার বড় সমস্যা।

“আমাদের মতো ন্যাচারাল অ্যাথলিটরা স্বাভাবিকভাবেই কম ওজন তুলতে পারি। তাই কঠোর ডোপিং পরীক্ষা হওয়া উচিত।”

জাতীয় স্তরে পশ্চিমবঙ্গের হয়ে একাধিক পদক জিতলেও এখনও পর্যন্ত সরকারের কাছ থেকে কোনও স্বীকৃতি বা সহায়তা পাননি তিনি।

বর্তমানে তাঁর ব্যক্তিগত সেরা রেকর্ড—
* স্কোয়াট: ৮৫ কেজি
* বেঞ্চ প্রেস: ৪৭.৫ কেজি
* ডেডলিফট: ১১০–১১২ কেজি

এবার লক্ষ্য সোনা,

পাটায়ার বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপের দিকে তাকিয়ে অদিতির কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস স্পষ্ট।

“আমি জিততে চাই। আমি চাই, বিশ্বের মঞ্চে ভারতের তেরঙ্গা গর্বের সঙ্গে উড়ুক।”

পঞ্চাশ পেরিয়েও খেলতে চান তিনি।

“আমি পাওয়ারলিফটিংকে ভালোবাসি। যতদিন শরীর সঙ্গ দেবে, ততদিন এই খেলার সঙ্গেই থাকতে চাই।”