ফ্রি-সাইক্লিং গ্রুপ থেকে আপসাইক্লিং ব্র্যান্ড—এই সব উদ্যোগ, কলকাতার অলিগলি থেকে বাতিল পোশাক আর পুরনো কাপড়কে দিচ্ছে অর্থবহ দ্বিতীয় জীবন।
ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল ধীরে ধীরে সাসটেনেবিলিটির দিকে মোড় নেওয়ায়, কলকাতার একাধিক কমিউনিটি ও ব্র্যান্ড এমন পথ তৈরি করছে, যার মাধ্যমে বাড়তি বা অপ্রয়োজনীয় পোশাক ও পুরোনো উপকরণ আর ডাস্টবিনে না গিয়ে নতুনভাবে ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠছে। আপনার ‘বাতিল’ জিনিসকে নতুন জীবন দিতে সহায়তা করছে কলকাতার এমন কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগকে তুলে ধরা হল।
ফ্রি-সাইকেল কলকাতা
ফ্রি-সাইক্লিং—অর্থাৎ নিজের অপ্রয়োজনীয় জিনিস সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এমন কারও হাতে তুলে দেওয়া, যার কাছে তা প্রয়োজনীয়—এই সহজ ধারণার উপর ভিত্তি করে তৈরি ফেসবুক গ্রুপ ‘ফ্রিসাইকেল কলকাতা ’।
অংশ নিতে চাইলে গ্রুপে পোস্ট করুন আপনি কোন জিনিসটি দিতে চান তার বিস্তারিত তথ্য। পুরনো শাড়ি, চার্জার, কিংবা গৃহস্থালির সামগ্রী—যাই হোক না কেন, সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিন এবং জিনিসটির বর্তমান অবস্থা উল্লেখ করুন। সুবিধাজনক সংগ্রহস্থলের কথাও জানাতে পারেন—ধরা যাক, পার্ক স্ট্রিট।
আগ্রহী সদস্যরা সাধারণত একই থ্রেডে মন্তব্য করে জানিয়ে দেন, কোথা থেকে তারা জিনিসটি সংগ্রহ করতে পারবেন। সময় ও স্থান চূড়ান্ত হলে প্রয়োজনে ফোন নম্বর বিনিময় করা যায়। এরপর সরাসরি সাক্ষাতে সংক্ষিপ্ত হস্তান্তর—আর আপনার বাতিল জিনিসটি শুরু করে নতুন যাত্রা।
ত্রি ক্রাফ্টস
২/১এ হিন্দুস্তান পার্কে অবস্থিত ‘ত্রি ক্রাফ্টস’ পুরোনো শাড়ি, কুর্তা এমনকি গামছাকেও রূপান্তরিত করে সমকালীন পোশাকে—টপ, দুপাট্টা, কুর্তা, কাফতান, পটলি ব্যাগ ও স্ক্রাঞ্চি ইত্যাদিতে। ব্র্যান্ডটি কাপড়ের ছোট টুকরোগুলিকেও বিচক্ষণতার সঙ্গে ব্যবহার করে, তৈরি করে জিরো-ওয়েস্ট পিস, এমনকি কাস্টম-মেড পোশাকের সুবিধাও দেয়। ‘ত্রি ক্রাফ্টস’-এর প্রতিটি নকশাই দেখায়, দৈনন্দিন বস্ত্রকেও কীভাবে নতুন পরিকল্পনায় টেকসই ও স্বাতন্ত্র্যময় পরিধেয়তে পরিণত করা যায়।
সুতা শাড়ি আপসাইক্লিং উদ্যোগ
‘সুতা ’-র সহ-প্রতিষ্ঠাতা সুজাতা বিশ্বাস জানিয়েছেন, ‘সুতা আর্থ’ নামে একটি উদ্যোগের মাধ্যমে ব্র্যান্ডটি পুরনো শাড়িকে আপসাইক্লিং করে প্যাকেজিং ব্যাগ ও অন্যান্য পণ্য তৈরি করে।
পদ্ধতিটিও সহজ। আপনার ব্যবহার না করা শাড়িগুলি সংগ্রহ করুন এবং নিশ্চিত করুন প্রতিটি শাড়ির দৈর্ঘ্য অন্তত ৫.৫ মিটার। সেগুলি প্যাক করে ‘সুতা’-র ঠিকানায় পাঠিয়ে দিন। শাড়ি পৌঁছনোর পর টিম কাপড়ের মান যাচাই করে উপাদানের ভিত্তিতে আপনাকে ইমেলে একটি ডিসকাউন্ট কুপন পাঠায়। কুপন প্রক্রিয়াকরণের আগে আপনার পার্সেল প্রাপ্তির বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয়।
এরপর সেই শাড়িগুলিকে রূপান্তরিত করা হয় প্যাকেজিং ব্যাগ ও অন্যান্য সামগ্রীতে, যেগুলির মাধ্যমে ‘সুতা’-র পণ্য বিশ্বজুড়ে গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে যায়। কুপন ব্যবহার করতে হলে অর্ডারের মোট মূল্য হতে হবে ডিসকাউন্টের অন্তত দ্বিগুণ। উদাহরণস্বরূপ, ১৫০ টাকার কুপন ব্যবহার করা যাবে ন্যূনতম ৩০০ টাকার কেনাকাটায়। পাঠানো মোট শাড়ির সংখ্যার ভিত্তিতে একটি একক ডিসকাউন্ট কোড ইস্যু করা হয়, যা দিয়ে একাধিক পণ্য কেনা সম্ভব।
বিপাশা-র মেমরি কুইল্ট
কনটেন্ট ক্রিয়েটর বিপাশা ব্যবহৃত পোশাককে দেন নতুন অর্থ। যেমন, শিশুর ছোট হয়ে যাওয়া জামাকাপড়কে রূপান্তর করেন ‘মেমরি কুইল্ট’-এ। যা জেলিভারি হয় গোটা দেশ এমনকি গোটা দুনিয়ায়। তিনি পরিবারগুলিকে তাঁদের প্রিয় মুহূর্তগুলি সংরক্ষণে সহায়তা করেন হাতে তৈরি স্মারক হিসেবে। অর্ডার করতে চাইলে হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ৭৭১৭৫৯৯৮৩৩-এ যোগাযোগ করে পোশাক পাঠানোর নির্দেশাবলি অনুসরণ করতে হয়।
জ্রুরি হ্যায় (Zruri Hai)
এই অ্যাপটি কলকাতাবাসীকে সহজেই পুরোনো পোশাক বিক্রির সুযোগ দেয়। পিক-আপ নির্ধারণ করলেই ‘Zruri Hai’-এর প্রতিনিধিরা সরাসরি আপনার বাড়ি থেকে সংগ্রহ করে নেন পোশাক। এথনিক ও ওয়েস্টার্ন পোশাক থেকে শিশুদের জামাকাপড়, শীতবস্ত্র—সবই বিক্রি করা যায়। এমনকি বিছানার চাদর ও পর্দাও গ্রহণ করা হয়। সবচেয়ে বড় সুবিধা—আগাম বাছাইয়ের প্রয়োজন নেই। সংগ্রহকারী অংশীদারেরাই আলাদা করার কাজটি সম্পন্ন করেন।
ভাল মানের পোশাক রিফারবিশ বা আপসাইকেল করা হয়, ব্যবহারযোগ্য হলেও বিক্রিযোগ্য নয় এমন পোশাক এনজিও-র মাধ্যমে দান করা হয়, আর সম্পূর্ণ অযোগ্য বস্ত্র দায়িত্বশীলভাবে রিসাইকেল করা হয়। ফলে কোনও কিছুই অপচয় হয় না।
পৃথিবীর বুকে বাণিজ্যিক আবর্জনার উৎপাদনকারী দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ ব্যাবসায়িক শিল্প হল বস্ত্রশিল্প। তাই পৃথিবীকে আবর্জনামুক্ত ও পরিবেশবান্ধব করে তুলতে সচেতনভাবে কাপড়ের পুনঃ পুনঃ ব্যবহারের অভ্যাস ও উদ্যোগ যত বৃদ্ধি পায় ততই ভাল।


