পূর্ব-কলকাতার বাগুইআটি অঞ্চলের বাসিন্দা ২৬ বছর বয়সি মেঘা সরায়নের ঝুলিতে আজ ৬.৫ লক্ষেরও বেশি গ্রাহক—কলকাতা ও হায়দরাবাদ জুড়ে।
প্রতিদিন ৩৫০-র বেশি অর্ডার, পাঁচ পাঁচটি ক্যাফে, আর তার ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনে মুখ হিসেবে বলিউড তারকা রণবীর সিং।
যে সাফল্যের চূড়ায় আজ তিনি, তার শুরুটা কিন্তু হয়েছিল বাগুইআটির একটি ২০০ বর্গফুটের ঘর থেকে—তখন তিনি শহরের স্কটিশ চার্চ কলেজ-এ অর্থনীতির দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী।
মাত্র ২০০ বর্গফুটের একটি ঘর থেকে শুরু হওয়া এই পথচলার প্রথম স্ফুলিঙ্গ জ্বলে ওঠে এক আকস্মিক বেকারি কর্মশালায়। সেখানেই যেন মেঘা খুঁজে পান নিজের জীবনের উদ্দেশ্য। এরপর বাড়িতে বানানো একটি সাধারণ চকলেট ট্রাফল কেক—অপ্রত্যাশিতভাবে সুস্বাদু হয়ে ওঠা সেই কেকই বদলে দেয় তার জীবনের গতিপথ।
“আমি বাড়িতে কেকটা বানিয়েছিলাম, আর সবাই দারুণ পছন্দ করেছিল,” স্মৃতিচারণ করেন সরায়ন।
“বন্ধু-আত্মীয়রা বলতে থাকল, অন্তত পার্ট-টাইম হলেও পেশাদারভাবে এটা করার চেষ্টা করা উচিত। তখন কলকাতায় জোমাটো ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা পাচ্ছিল, তাই আমি সিদ্ধান্ত নিই অ্যাপে নিজের নাম লিস্টিং করব,” জানান তিনি।
তার ব্র্যান্ডের নামেও লুকিয়ে আছে এই যাত্রার গল্প। “আমি পড়তাম স্কটিশ চার্চ কলেজে, আর স্কটল্যান্ডকে প্রায়ই ‘ল্যান্ড অব কেকস’ বলা হয়। সেখান থেকেই নামটা মাথায় আসে,” বলেন সরায়ন।
প্রতিদিন কলেজ থেকে ফিরে তিন থেকে চার ঘণ্টা জোমাটো অ্যাপ চালু রাখতেন তিনি। “যখনই লগ-ইন করতাম, এক-দু’টি অর্ডার আসতই। তখনই বুঝতে পারি, এখানে সম্ভাবনা আছে।” এক মাসের মধ্যেই তিনি বাগুইআটির যে বিল্ডিং-এ তিনি থাকতেন, সেখানেই ২০০ বর্গফুটের একটি জায়গা ভাড়া নিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে প্রথম বড় পদক্ষেপটা করেন।
একটি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে নিয়োগ করেন প্রথম সহকারীকে। শুরুর দিকে প্রতিদিন পাঁচটি অর্ডার ডেলিভারি হতো। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তার টিম বেড়ে দাঁড়ায় নয় জনে, আর দৈনিক অর্ডার পৌঁছে যায় কুড়িতে। সে সময় তিনি এমবিএ প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
কিন্তু যখন তিনি ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট ক্যালকাটা-এ সুযোগ পেলেন না, তখনই জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। এমবিএ করার স্বপ্ন থেকে সরে এসে পূর্ণ সময়ের জন্য উদ্যোক্তার জীবনে ঝাঁপিয়ে পড়েন ।
এরপর আসে ২০২০ সালের মহামারি। কোভিড-১৯-এর ধাক্কায় যখন ছোট ব্যবসাগুলি একেবারে স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল, তখন সরায়নের দলও কার্যত শূন্যে নেমে আসে। কিন্তু তিনি ‘ল্যান্ড অব কেকস’-কে হারিয়ে যেতে দেননি। ব্র্যান্ডের মুখ তো ছিলেনই, এবার হয়ে ওঠেন তার সবকিছু—নিজে কেক বানানো, প্যাকিং, অর্ডার ম্যানেজমেন্ট ও ডেলিভারি—সামলেছেন একা হাতে। যখন শহরের একের পর এক বেকারি বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, তখন তিনি লড়াই চালিয়ে গেছেন নিরলসভাবে।
“আমি জানতাম, তখন যদি ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়, আর ফিরে আসার সুযোগ থাকবে না,” বলেন তিনি। “প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০টি কেক বানাতাম, আর প্রতিটিই জোমাটো-এ বিক্রি হয়ে যেত,” জানান সরায়ন। ২০২১ সালের মধ্যে ‘ল্যান্ড অব কেকস’ কলকাতাজুড়ে পাঁচটি আউটলেট খুলে ফেলে। সরায়ন হয়ে ওঠেন প্ল্যাটফর্মের অন্যতম সেরা বিক্রেতা বেকার, যা নজর কাড়ে খোদ জোমাটো-র।
২০২৩ ক্রিকেট বিশ্বকাপের আগে তার প্রচেষ্টাকে নতুন মাত্রা দেয় তারকাখ্যাতি। জোমাটো তার সঙ্গে যোগাযোগ করে একটি বিজ্ঞাপনের জন্য—যেখানে ছিলেন রণবীর সিং ও ক্রিস গেইল। ভিডিওতে দেখা যায়, সিং ঘোষণা করছেন যে তিনি ‘ল্যান্ড অব কেকস’-এর ব্রাউনি খেতে চাইছেন। আজ ২৬ বছর বয়সি এই বেকার প্রতি মাসে ১০,০০০-এরও বেশি অর্ডার প্রক্রিয়াকরণ করেন, ৩৫ জন কর্মীর একটি দল নিয়ে।
তার ব্র্যান্ড ইতিমধ্যেই ৬.৫ লক্ষেরও বেশি গ্রাহককে পরিসেবা দিয়েছে এবং কলকাতাবাসীর মধ্যে তৈরি করেছে এক বিশ্বস্ত অনুরাগী গোষ্ঠী—যার মধ্যে রয়েছেন ইনফ্লুয়েন্সার ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরাও। এছাড়া, এখন হায়দরাবাদেও রয়েছে তার ব্র্যান্ডের একটি আউটলেট।
হয়তো ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট ক্যালকাটা-এ পড়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি সেই বি-স্কুলের ক্যাম্পাসে পৌঁছেছেন—ছাত্রী হিসেবে নয়, বরং এমন এক উদ্যোক্তা হিসেবে, যার সাফল্যের গল্প থেকে আজকের ছাত্রছাত্রীরা শিখতে পারে।


